লোডশেডিং যুগ থেকে আলোকিত বাংলাদেশ: বিদ্যুতায়নে বিপ্লব
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২২ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:২০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াদা করেছিলেন দেশকে আলোকিত করবেন, সেই ওয়াদা তিনি রেখেছেন। পায়রায় দেশের সবচেয়ে বড় এবং অত্যাধুনিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে খুবই অল্প সময়ে একটি দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে এসেছেন শেখ হাসিনা। আর তাতেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা পেছনে ফেলেছে দুই প্রতিবেশী দেশ ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানকে। বিস্তারিত লিখেছেন অনিক ইসলাম
পায়রায় দেশের সবচেয়ে বড় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন: একটা সময় বিদ্যুৎ যেন ছিলে সোনার হরিন। লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ছিল দেশের মানুষ। শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা, শিল্প-কারখানার উৎপাদন, অফিস-আদালতের কর্মকান্ড ব্যহত হত প্রতিনিয়ত। সেখান থেকে আজ আলোকিত বাংলাদেশ। পায়রায় দেশের সবচেয়ে বড় এবং অত্যাধুনিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সাফল্য তুলে ধরে তিনি বলেছেন, মুজিববর্ষে দেশের প্রত্যেকটি ঘর আলোকিত করেছে সরকার, এটাই সব থেকে বড় সাফল্য। পরিবেশবান্ধব আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির সাহায্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করার মাধ্যমে, বাংলাদেশ ‘মুজিববর্ষে’ দেশকে শতভাগ বিদ্যুৎ কভারেজের আওতায় আনার সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করে আরেকটি মাইলফলক অর্জন করেছে। সোমবার (২১ মার্চ) ১৩শ’ ২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামফলক উন্মোচনের মাধ্যমে পরিবেশ বান্ধব আল্ট্রা-সুপারক্রিটিকাল প্রযুক্তিসহ কয়লাভিত্তিক এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্ব থমকে যাওয়ার পর এটিই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগতভাবে প্রথম কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে সশরীরে সফর। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্য দিয়ে দেশে শতভাগ দূষণমুক্ত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণে আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয় এবং সারা বিশ্বে ১১তম দেশ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি: পায়রা ১৩শ’ ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দক্ষিণ পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার অন্তর্গত রামনাবাদ নদীর পাশে ২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে ১০০০ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে এবং এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে আল্ট্রা সুপারক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিশ্বের ১৩তম দেশে পরিণত হয়েছে। পাওয়ার প্ল্যান্টের প্রথম ৬৬০ মেগাওয়াট ইউনিটটি ২০২০ সালের মে মাসে বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়, ৪০০ কেভি পায়রা-গোপালগঞ্জ পাওয়ার ট্রান্সমিশন ব্যবহার করে এবং দ্বিতীয়টি গত বছরের ডিসেম্বরে উৎপাদন শুরু করে। ১৩শ’ ২০ মেগাওয়াট তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়াও, আরেকটি পাওয়ার প্ল্যান্টের নির্মাণ কাজ চলছে এবং সরকারের আরও একটি ১৩২০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট এবং এখানে পায়রায় একটি সোলার সিস্টেম পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্ল্যান্টটি তৈরি করছে বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (বিসিপিসিএল), চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) এর মধ্যে একটি ৫০:৫০ যৌথ উদ্যোগ।
গণতন্ত্র আছে বলেই বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং মুজিববর্ষে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে আমরা আলো জÍালতে পারলাম এটাই হচ্ছে সব থেকে বড় কথা। আমরা আলোকিত করেছি এদেশের প্রত্যেকটি মানুষের ঘরকে। শেখ হাসিনা বলেন, এই ১৩ বছর একটানা গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অব্যাহত রয়েছে, এরমধ্যে ঝড় ঝঞ্ঝা অনেক এসেছে, বাধা অনেক এসেছে কিন্তু সেগুলো আমরা অতিক্রম করেছি। এগুলো অতিক্রম করেও আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে পেরেছি বলেই আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে। ’৯৬ সালে সরকার গঠনের সময় দেশের অধিকাংশ অঞ্চল অন্ধকারে ডুবে থাকার এবং মাত্র ১৫শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকার প্রধান বলেন, তাঁর সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় সেই অবস্থা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে ৪ হাজার ৩শ’ মেগাওয়াট করে গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ৫ বছরে বিএনপি জামাত সরকার ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনতো বাড়াতেই পারেনি বরং কমিয়ে ফেলে। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ৩ হাজার ২শ’ মেগাওয়াট থেকে তাঁর সরকার আজকে দেশকে শতভাগ বিদ্যুতের আলোয় উদ্ভাসিত করতে সক্ষম হয়েছে।

আলোর পথে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি যুদ্ধ বিধ্বস্থ দেশ গড়ে তুলে জাতির পিতা একে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে গিয়েছিলেন আজকে সেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে। তিনি বলেন, ওয়াদা করেছিলাম প্রতিটি মানুষের ঘরকে আলোকিত করবো, প্রতিটি মানুষ আলোকিত হবে, সেই আলোর পথে আমরা যাত্রা শুরু করেছি। আজকের দিনটা সেই আলোর পথে যাত্রা শুরু যে সফল হয়েছে সেই দিন। এজন্য সবাইকে তিনি সহযেগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
প্রতিটি মানুষের জীবন আলোকিত হবে: শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকার ইতোমধ্যে রাঙ্গবালী, নিঝুম দ্বীপ, সন্দ্বীপ সহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর নিচ দিয়ে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। আর যেখানে বিদ্যুতের গ্রিড লাইন নেই সেখানে সোলার প্যানেল করে দিচ্ছে। হাওড়-বাওড়, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় এই সোলার প্যানেলের সাহায্যে বিদ্যুৎ পৌঁছ দিচ্ছে। অর্থাৎ কোন ঘর আর অন্ধকারে থাকবেনা, প্রতিটি মানুষের জীবন আলোকিত হবে। তাঁর সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প সহ এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কর্মরতদের অভিজ্ঞতার ভান্ডার স্ফীত হয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন, ভবিষ্যতে যেকোন উন্নয়ন প্রকল্প আমরা নিজেরাই বাস্তবায়ন করতে পারবো, সেই রকম অভিজ্ঞতা আমরা নিজেরাই অর্জন করছি।

ইন্ডিয়া-পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ প্রথম: বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন ইন্ডিয়া ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশগুলো তাদের জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশ এবং ৭৪ শতাংশকে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কের আওতায় এনেছে। বিদ্যুত উৎপাদন ক্ষমতা ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ২৫,৫১৪ মেগাওয়াট হয়েছে যা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ৪,৯৪২ মেগাওয়াট ছিল। এর মধ্যে ১১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে এবং ১৯,৬২৬ মেগাওয়াট স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হচ্ছে। ২০০৯ সালে, জনসংখ্যার মাত্র ৪৭ শতাংশের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ ছিল। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ২২০ কি:ও: থেকে ৫৬০ কি:ও:এ উন্নীত হয়েছে এবং বিদ্যুতের বিতরণ ক্ষতি ৫ দশমিক ৮৫ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।
পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল- সব জায়গাতে পৌঁছে গেছে বিদ্যুৎ: সভাপতির বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, সবার জন্য বিদ্যুৎ, এ ধারণা বঙ্গবন্ধুর। আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন ঘরে-ঘরে বিদ্যুৎ। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন ও দিক-নির্দেশনা ছাড়া এটি সম্ভব হতো না। নসরুল হামিদ আরও বলেন, ২০০৯ সালে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে তখনও দেশে মাত্র ৪৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পেতো। মাত্র একযুগের ব্যবধানে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তীর সময় আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন শতভাগ বিদ্যুতায়ন। ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’- এই মূলমন্ত্রে দুর্গম পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল- সব জায়গাতে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। দেশের দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন চরে সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ে গ্রিড লাইনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। যেখানে সম্ভব হয়নি সেখানেও সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে বিদ্যুতায়ন করেছি আমরা।

জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনে শেখ হাসিনা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়ায় ‘বাংলাদেশ এখন অন্ধকার থেকে আলোর পথে’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের সময় মানুষ যে অন্ধকার যুগে ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশে তা থেকে বেরিয়ে শতভাগ আলোর পথে। ঘোষণা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে শতভাগ বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন।বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, জনগণের প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা, জনগণের প্রতি যে দায়িত্ব, তা পালনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সোমবার পায়রায় ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শতভাগ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষও উন্নয়নের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে।
ইউডি/সুপ্ত

