দেশের পুষ্টি বৈষম্য দূর করতে হবে

দেশের পুষ্টি বৈষম্য দূর করতে হবে

ডা. তাসনুভা আহমেদ খান । মঙ্গলবার, ২২ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৪:৪০

খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকারসমূহের অন্যতম। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে, দেশের সকল নাগরিকের খাদ্যের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা। এছাড়াও সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নসাধনকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সরকার দেশের সকল নাগরিকের কর্মক্ষম সুস্থ জীবনযাপনের প্রয়োজনে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহের সাথে মিল রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবসান (এসডিজি-১), ক্ষুধার অবসান, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টিমান (এসডিজি-২) অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলাদেশ স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতাবিধি, শিক্ষা এবং শিশু সুরক্ষা সম্পর্কিত ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করছে। এগুলো বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এসডিজির মূলনীতি হলো, কেউ পিছিয়ে থাকবে না। তার আলোকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় যারা পিছিয়ে আছে তাদের চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার দেশের পুষ্টি বৈষম্য দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসকল পদক্ষেপের ফলে পরিবারের গড় আকার কমে ৪.৩ এ দাঁড়িয়েছে, গড় প্রজনন হার ২.৩, স্তন্যপান করা শিশুর সংখ্যা ৯৮.৫, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় শতভাগ শিশুর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্মনিবন্ধনের হার বেড়েছে। মাঝারি ধরনের ও মারাত্মক পর্যায়ের খর্বকায় শিশুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে এসেছে। বছরে দুই বার ৬-৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে, এতে রাতকানা রোগ প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জিত হয়েছে। প্রায় সব পরিবারের ক্ষেত্রেই খাবার পানির সংগ্রহের উৎসের উন্নতি হয়েছে। গ্রামীণ ও শহরের পরিবারগুলোর মধ্যে এক্ষেত্রে পার্থক্য খুব সামান্য। এর মধ্যে ৪৩ শতাংশেরও বেশি জনগোষ্ঠী এমন এলাকায় বসবাস করে, যেখানে তাদের আবাসস্থলেই পানির উৎস রয়েছে। তবে অনেক জায়গায় কাক্সিক্ষত মাত্রায় উন্নতি হয়নি। সে সব জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সরকার সচেতন ভাবে সেগুলো নিয়ে কাজ করছে। শিশুদের সাথে সহিংস আচরণের হার আশঙ্কাজনকভাবে রয়ে গেছে। ১-৪ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৮৮ শতাংশই তাদের লালন-পালনকারীদের কাছ থেকেই সহিংস আচরণের শিকার হয়। বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজে এখনো ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।

সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও সমাজে পুষ্টি বৈষম্য রয়েছে। ঢাকা বিভাগের দারিদ্র্যের হার কম, অপরদিকে রংপুর বিভাগের দারিদ্র্যের হার বেশি। খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগে পল্লী অঞ্চলের চেয়ে শহর অঞ্চলের দারিদ্র্যের হার বেশি। হাওর-নদী ভাঙা, পাহাড়ি ও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মধ্যে দারিদ্র্যের হার বেশি। এসব অঞ্চলের মানুষের আয় অপেক্ষাকৃত কম হওয়ায় উন্নত পুষ্টিমান অর্জনের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্য গ্রহণ সম্ভব হয় না। ফলে পুষ্টি বৈষম্য দেখা যায়। জনসংখ্যার অর্ধেক অর্থাৎ শতকরা ৫০ ভাগের সুষম খাবারের ঘাটতি রয়েছে, যেখানে ভিটামিন-এ, ক্যালসিয়াম, জিংক এবং আয়রনের অভাব উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও অপুষ্টি এড়াতে না পারলে স্থূলতা ও অসংক্রামক রোগের প্রবণতা বাড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এসব কারণ সঠিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় বাংলাদেশের অগ্রগতি হুমকির মধ্যে পড়বে।

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসময়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের তুলনায় বেশি। জাতীয় মাথাপিছু ক্যালরি প্রাপ্তির নিরিখে আমরা খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে সক্ষম হয়েছি। আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাসের কারণে খাদ্যপ্রাপ্তির সুযোগ ও আমাদের বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান আয় এবং নগরায়ণের ফলে খাদ্য তালিকায় কিছু বৈচিত্র্য ঘটেছে। করোনাকালে অব্যাহতভাবে সারাবিশ্বে খাদ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। তা সত্ত্বেও আমাদের দেশে খাদ্য সংকট বা বিতরণ ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। ২০৩০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কিছু নেতিবাচক প্রবণতা মোকাবিলা করতে হবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতাই আমাদের আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে। আমাদের দেশের মানুষ কখনো পরাজিত হয়নি। তাই সকলের সন্মলিত প্রচেষ্টায় ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের পুষ্টি বৈষম্য দূর করে এসডিজি’র লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading