বায়ু দূষণের শীর্ষে বাংলাদেশ: মারাত্মক ঝুঁকির মুখে জীবন ও পরিবেশ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৩ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৩০
প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে বায়ু দূষণের কারণে। বাংলাদেশে এর প্রভাব বৈশ্বিক মাত্রার চেয়েও অনেক বেশি। বায়ু দূষণ রোধে দেশে সচেতনতা বৃদ্ধি কতটা জরুরী সেটাই আঙ্গুল তোলে দেখিয়ে দেয় এসব পরিসংখ্যান। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জীবন ও পরিবেশ রক্ষার জন্য কার্যকরী ভূমিকা জরুরী। বিস্তারিত লিখেছেন সাদিত কবির
অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা, রাজধানী ঢাকার মতো এতো বড় শহরের চারপাশে ইটভাটা, শহরের মধ্যে নানা কারখানা স্থাপন, শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণকাজ বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। এছাড়াও ট্রাফিক জ্যামের কারণে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করে গাড়িগুলো বায়ুদূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাত্রাতিরিক্ত গরম থেকে বাঁচতে মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে, তাতেও বায়ুদূষণ বাড়ছে। যার ফলে বাংলাদেশে বায়ু দূষণের মাত্রা কিছুতেই কমছে না। দীর্ঘদিন দূষিত বাতাসের মধ্যে থাকলে যেসব রোগ হতে পারে, তার মধ্যে আছে – হৃদরোগ কাশি, নিউমোনিয়াসহ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, ফুসফুসের সংক্রমণ, ফুসফুসের ক্যানসার, ডায়াবেটিস, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টজনিত নানা রোগ, স্ট্রোক, চোখে ছানি পড়া, শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সমস্যা
টানা চতুর্থবারের মতো বায়ু দূষণের শীর্ষে বাংলাদেশ: বায়ুদূষণে টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের তকমা পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালে বিশ্বের ১১৭টি দেশ, অঞ্চল ও ভূখø এবং ৬ হাজার ৪৭৫টি শহরের বায়ুর মান নিয়ে বিশ্লেষণ করে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক দূষণ প্রযুক্তি সংস্থা আইকিউএয়ারের প্রকাশিত তালিকায় শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। বিশ্বের দূষিত রাজধানীর তালিকাও প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। আইকিউএয়ারের এই তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত রাজধানী চিহ্নিত হয়েছে নয়াদিল্লি। শীর্ষ দূষিত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি বিশ্বের শীর্ষ দূষিত রাজধানীর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছে রাজধানী ঢাকা।বিশ্বের ৬ হাজার ৪৭৫টি শহরের বায়ুমানের তথ্য বিশ্লেষণ করে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২১ সালে একটি দেশও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রত্যাশিত বায়ুমান বজায় রাখতে পারেনি; আর দূষণের মাত্রার বিচারে সবার উপরে রয়েছে বাংলাদেশের নাম। কোথায় প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ভাসমান ২.৫ মাইক্রোমিটার ব্যাসের বস্তুকণার (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম) পরিমাণ কত মাইক্রোগ্রাম (পিএম২.৫), তার ভিত্তিতে এই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সুইস সংস্থা আইকিউ এয়ার, যারা বায়ুদূষণ এবং বায়ু পরিশোধন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা বলছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদের বায়ুমান নির্দেশিকা সংশোধন করে ঘোষণা দেয়, বাতাসে পিএম ২.৫ এর পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রামের বেশি হলেই ওই বাতাসকে আর স্বাস্থ্যকর বলা যাবে না, কারণ এ বস্তুকণার অল্প ঘনত্বও স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে।

প্রত্যাশিত ফল বিশ্বের মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ শহরে: আইকিউ এয়ারের প্রতিবেদন বলছে, সমীক্ষার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার শহরের মধ্যে মাত্র ৩ দশমিক ৪ শতাংশ শহরের বাতাসে ২০২১ সালে ডব্লিউএইচও প্রত্যাশিত বায়ুমান পাওয়া গেছে। আর ৯৩টি শহরে পিএম২.৫ এর মাত্রা ছিল ওই গ্রহণযোগ্য মাত্রার ১০ গুণ বেশি। বাংলাদেশের বাতাসে পিএম২.৫ এর গড় পরিমাণ ছিল ৭৬ দশমিক ৯ মাইক্রোগ্রাম, যা সমীক্ষার ১১৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এই হিসেবে গতবছর বিশ্বে বাংলাদেশের বাতাসই ছিল সবচেয়ে দূষিত।
সাতটি দেশে এই পরিমাণ ছিল ৫০ মাইক্রোগ্রামের বেশি, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ পাকিস্তান তালিকার তৃতীয় (৬৬ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম) এবং ইন্ডিয়া তালিকার পঞ্চম (৫৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম) অবস্থানে রয়েছে। আইকিউ এয়ার ২০১৮ সাল থেকে এই প্রতিবেদন প্রকাশ আসছে এবং প্রতিবারই বাংলাদেশ দূষিত দেশের তালিকায় প্রথম দিকে থাকছে।

রাজধানী শহরগুলোর দূষণে দিল্লির পরই ঢাকা: এবারের প্রতিবেদনে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় বাংলাদেশের ঢাকার অবস্থান ২৮তম, পিএম২.৫ এর গড় পরিমাণ ৭৮ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম। ঢাকায় দূষণ তুলনামূলক কম হওয়ার বড় কারণ ছিল গতবছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে মহামারীর লকডাউন। অবশ্য রাজধানী শহরগুলোর ভেতরে ঢাকা আছে দিল্লির পর দ্বিতীয় অবস্থানে। এবারের প্রতিবেদন বলছে, সবচেয়ে দূষিত ৫০টি শহরের মধ্যে ৪৬টিই মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার। আইকিউ এয়ারের এয়ার কোয়ালিটি সায়েন্স ম্যানেজার ক্রিস্টি শ্রোডার বলেন, অনেক দেশ বায়ুদূষণ কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। চীনের অবস্থা আগে অনেক খারাপ থাকলেও এখন উন্নতি হচ্ছে। তবে বিশ্বে অনেক জায়গার বায়ুদূষণ পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’। বায়ুদূষণ কমানোর লক্ষ্যে ২০১৪ সাল থেকে লড়াই করছে চীন। ২০২১ সালে আইকিউএয়ারের তালিকায় তার আগের বছরের ১৪তম স্থান থেকে ২২তম স্থানে নেমে এসেছে। ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে চীনে পিএম২.৫ মাত্রা ৩২ দশমিক ৬ মাইক্রোগ্রামে নেমে এসেছে।
বিশ্বজুড়ে বছরে প্রাণহানি ৭০ লাখেরও বেশি: আইকিউএয়ার বলছে, বায়ুদূষণ এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত স্বাস্থ্য হুমকি। প্রত্যেক বছর বিশ্বজুড়ে ৭০ লাখের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে বায়ু দূষণের কারণে। মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন প্রাণঘাতী ক্যান্সার এবং হƒদযন্ত্রের সমস্যা তৈরি করে পিএম-২.৫। আইকিউএয়ার বায়ূতে পিএম-২.৫’র যে উপস্থিতি পেয়েছে তা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে সতর্ক করে দিয়েছে।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কবলে নগরজীবন বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। বাড়িয়ে তুলছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসতন্ত্রের রোগীরা। দূষণের মাত্রা যেভাবে বেড়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গাড়ির কালো ধোঁয়া কমানো ও অপরিকল্পিত নির্মাণকাজের লাগাম টেনে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকে।পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার বায়ু দূষণের তিনটি প্রধান উৎস হলো- ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণ সাইটের ধুলো। জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন দূষিত বাতাসে শ্বাস নেন। প্রসঙ্গত, আমেরিকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা হেলথ ইফেক্টস ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশে বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর প্রাণ হারাচ্ছে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বায়ুদূষণজনিত বার্ষিক মৃতের গড় সংখ্যা ৪৬ হাজার। জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্য বলছে, বিশ্বে ৩০ কোটি শিশু দূষিত বায়ু পরিবেষ্টিত এলাকায় বাস করে। এর মধ্যে ২২ কোটিই দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দা।

দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে পরিস্থিতি নাজুক: জলবায়ু পরিবর্তনে যখন সারা বিশ্ব সতর্ক অবস্থান নিয়ে কাজ করছে তখনই বিশ্বে বায়ুদূষণে শীর্ষস্থানে উঠে এসেছে ঢাকা। বিশেষজ্ঞরা জানান, ছয় ধরনের পদার্থ এবং গ্যাসের কারণে ঢাকায় দূষণের মাত্রা সম্প্রতি অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণা অর্থাৎ পিএম ২.৫ এর কারণেই ঢাকায় দূষণ অতিমাত্রায় বেড়ে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ রোগীদেরসহ সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত বলে মনে করেন। গবেষণায় জানা যায়, প্রতি মাসের গড় প্রতি ঘনমিটার অতিসূক্ষ্ম কণা (পিএম ২.৫) পরিমাপ করে দেখা যায়, তেজগাঁও, আগারগাঁও, মিরপুর-১০, গুলশান-২, শাহবাগ, ধানমন্ডি-৩২ এবং আবদুল্লাহপুর এলাকায় গড় মাসিক পিএম ২.৫ এর ঘনত্ব বেশি। লক্ষ করা যায়, যেসব এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানার উপস্থিতি রয়েছে, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলমান, মেট্রোরেলের কাজ চলমান এবং কয়েকটি রাস্তার সংযোগ যেখানে ঘটেছে; সেখানে পিএম ২.৫ এর ঘনত্ব বেশি ছিল। সবচেয়ে বেশি দূষণ দেখা যায়, তেজগাঁও এলাকায়। শুধু ঢাকা শহরই নয়, বায়ুদূষণের এই সমস্যা এখন সমগ্র বাংলাদেশে। যেসব এলাকায় বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানার উপস্থিতি রয়েছে, রাস্তা নির্মাণ ও মেরামতের কাজ চলমান, মেট্রোরেলের কাজ চলমান, ফ্লাইওভারের কাজ চলছে এবং কয়েকটি রাস্তার সংযোগ যেখানে ঘটেছে সেসব জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত হারে বায়ুদূষণ হচ্ছে। এমনকি লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, বাস টার্মিনালেও প্রচুর বায়ুদূষণ লক্ষ করা যায়। বায়ুদূষণ রোধ করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বাড়বে এক বছর তিন মাসের বেশি। বায়ুদূষণ রোধ করা গেলে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রকোপ রোধে ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়তা’ হবে।বায়ুদূষণের ফলে মানুষের শরীরে যেসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। প্রতিবন্ধী শিশু জš§ নেওয়ার সংখ্যা কমে যাবে, তেমনি শিশু ও মানুষের গড় আয়ু বাড়বে। আর্থিক সাশ্রয় যেমন হবে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপিও।
প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই সমাধান: বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ কমাতে প্রত্যেকের সচেতন হতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে করণীয় সম্পর্কে জানতে হবে। জলবায়ু পরির্বতন ও বায়ুদূষণ রোধে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর এই বায়ু দূষণ রোধে নিতে হবে কার্যকরী পদক্ষেপ। পরিকল্পিতভাবে কারখানাগুলোর ধোঁয়া কমিয়ে আনতে হবে। ট্রাফিক জ্যামের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। প্রচুর বনায়ন করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। আবাসিক এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে যেখানে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। রাস্তায় ধুলা সংগ্রহের জন্য সাকশন ট্রাক ব্যবহার করতে হবে।
ইউডি/সুপ্ত

