বিপন্ন পাহাড়ি ফুল ‘সাংগ্রাই পাঁই’ রক্ষা করুন

বিপন্ন পাহাড়ি ফুল ‘সাংগ্রাই পাঁই’ রক্ষা করুন

অংসুই মারমা । বুধবার, ২৩ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০১

বসন্তকাল এলেই পাহাড়ে উৎসবের দোলা লাগে। প্রবাহিত হয় উত্তরীয় বায়ু। প্রকৃতি তার খোলস বদলায়। গাছে গাছে পাতা ঝরে পড়ে, নতুন পাতা এসে সবুজ প্রাণের সঞ্চার ঘটায়। নানা গাছে নানা ফুল ফোটে। এ সময়ে বনজঙ্গলেও এক প্রাচীন বনফুল ফুটে। এ ফুল প্রস্ম্ফুটিত হওয়া মানে সাংগ্রাই অত্যাসন্ন। উৎসবের ফুলটির নাম জাতিভেদে ভাতজোড়া ফুল (চাকমা), সাংগ্রাই পাঁই (মারমা), কুমুইবোবা (ত্রিপুরা)। অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর নামও ভিন্ন ভিন্ন। এটি মৌসুমি ফুল, সারাবছর পাওয়া যায় না। এ ফুল যে উৎসবের প্রতীক, আজকের প্রজন্ম তা জানেই না। কেননা এটি দুষ্প্রাপ্য বহুদিন।

ফুলটি নিরীহ গোছের, কিন্তু তার প্রধান গুণ নজরকাড়া অবয়ব। ধবধবে সাদা দেখতে। ঘন ঝোপের মধ্যে সবুজ পাতার ফাঁকে থোকা থোকা ফুটে ওঠে। মৃদু সুগন্ধ ছড়ায়। যে কেউ বনের ভেতরে মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে ঝোপের মাঝে একবার দেখেছে, সে ফুলের দিকে না তাকিয়ে পারে না। এখানে গোলাপ কিংবা রজনীগন্ধার চেয়ে তার উঁচু মহিমা। এটি দেখতে অনেকটা রঙ্গমের মতো; কিন্তু রঙ্গম নয়, এটি বনফুল। ঊর্ধ্বমুখী মঞ্জুরিগুলো কিছুটা সাদা ও গোলাপি। ফুলের আকার নলের মতো, তবে গুচ্ছ গুচ্ছ। প্রতিটি ফুলের চারটি করে পাপড়ি। ফুটন্ত ফুলের আয়ু বেশ দীর্ঘ। এ ফুলের রং শুভ্রতার মাঝে সামান্য গোলাপি প্রলেপ। মাটির গুণাগুণভেদে প্রায় চার ফুট অবধি উচ্চতাসম্পন্ন হয়। এটি কেবল বছরে এ সময়েই ফোটে, অন্য সময় নয়। তাই পাহাড়িরা বার্ষিক উৎসবে এ ফুলকে বেছে নিয়েছে আদিকাল থেকে।

এটি শুধু উৎসব নয়, সামাজিক মূল্যবোধেরও প্রতীক। তার কদর ঈর্ষণীয়। এ ফুল দিয়ে ঘর-দুয়ার সাজায়, বেদিতে পূজা দেয়, নদীতে ভাসিয়ে দেয়, খোঁপায় দেয়, গবাদি পশুর গলায় ঝুলিয়ে দেয়। আরও কত ব্যবহার! যুবকরা কোথায় কোথায় ফুটেছে, তা আগে থেকে জেনে রাখে। ফুল বিজু বা পাঁই ছোয়াই (মারমা) দিনে খুব ভোরে দলবেঁধে ফুল তুলে আনে। পাহাড়ি যুগলরা এ সাংগ্রাই পাঁইয়ের (প্রমিত বাংলার নামহীন ফুল) মালা বিনিময় করে।

পাহাড়ে সামাজিক কৃত্যে সাংগ্রাই পাঁই ব্যবহূত হয়ে আসছে যুগে যুগে। জুমজীবীরা ফুলের চাষবাস বলতে কেবল মোরগ ফুলের চারা লাগাত টংঘর ঘিরে। এটা নিয়ে একটা সংস্কার আছে এবং তা ভূত-প্রেতের আছড় থেকে রক্ষা পেতে। কিন্তু উৎসবের এ ফুল বিপন্ন হয়ে উঠেছে এবং আরও বনজ ফুলফল কন্দ শিকড়-বাকড় আর পাওয়া যায় না। বনদস্যুরা বছরের পর বছর বন ধ্বংস করে চলেছে। পাহাড় ন্যাড়া করে দিয়েছে। বন পোড়ানোর সংস্কৃতি চার দশক ধরে চলমান। হাজার হাজার একর পাহাড় পুড়ে, বৃক্ষহীন হওয়াসহ নানা কারণে এ বনফুলের অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে প্রায়। ফলে যে বনফুলকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি-আদিবাসীদের উৎসবের সূচনা, তার আদলও বদলে গেছে। তাদের বংশানুক্রমিক আচারাদিও লুপ্ত হয়ে গেছে এক প্রকার। অন্য দেশীয় ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকতা চালিয়ে নিতে হয় বাধ্য হয়ে। ফলে উৎসবের মাহাত্ম্য অনেকটা কমে গেছে।

সাধারণত পাহাড়িরা রক্ষণশীল মানসিকতাসম্পন্ন। জীবনপ্রবাহের পথে শত বাধা মোকাবিলা করেও নিজস্ব অভ্যাস ও আচরণ টিকিয়ে রাখে। এদের সংস্কৃতির অনেক উপাদান ইতিহাসের বুকে চাপা পড়েছে। বার্ষিক উৎসবের প্রতীক ‘সাংগ্রাই পাঁই’ যে হারিয়ে গেছে, সে দুর্গতির কথা কারও মুখে শোনা যায় না এখন। আবার অধুনা পাহাড়ে এ সময়টাতে প্রান্তিক জনপদের মাঝে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। সেখানে কেউ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় না। অভাবের খবর প্রচার পায় না। এভাবে যেতে যেতে অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি হবো হয়তো। তাই পাহাড়ে বৃক্ষনিধন, বন ধ্বংস, বন পোড়া, ভূমিদস্যুদের পাহাড় বেদখল নেওয়া, বন্য পশুপাখি শিকার ইত্যাদি পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম বন্ধ করতে আন্দোলন করা উচিত। অব্যাহত প্রতিবাদ করা উচিত। বন-পাহাড় রক্ষিত হলে প্রকৃতি পুনঃপ্রাণ ফিরে পাবে। প্রকৃতি সবুজ হয়ে উঠলে বিলুপ্তপ্রায় ‘সাংগ্রাই পাঁই’ নামক বনফুলটি আবার জীবন ফিরে পাবে। তখন হয়তো আদিবাসীদের আদি-উৎসবের ধারার নবসূচনা ঘটতে পারে। তাই পাহাড়ি সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নিজস্ব ঐতিহ্য ও কৃষ্টি রক্ষার্থে তার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading