আত্মহত্যারোধে প্রয়োজন সবার সমন্বিত পদক্ষেপে
জাহিদুল ইসলাম । বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫৭
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর (২০২১) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে। করোনা মহামারিকালে ওই বছর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১০১টি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হার ৬১.৩৯ শতাংশ বা ৬২ জন। অন্যদিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার ২২.৭৭ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩ জন। শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক মানসিক ও সামাজিক চাপ বেশি থাকে এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কারণে তাদের মাঝে হতাশার ছাপ বেশি দেখা যায়। এ কারণে তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। সম্পর্কগত কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে ২৪.৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে এ পথে ধাবিত হয়েছে ১৯.৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী। অন্যদিকে মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে ১৫.৮৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বেছে নিয়েছে আত্মহননের পথ। পড়াশোনাসংক্রান্ত কারণে আত্মহত্যা করেছে ১০.৮৯ শতাংশ এবং আর্থিক সমস্যায় আত্মহত্যা করছে ৪.৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত তার ‘সুইসাইড’ গ্রন্থে আত্মহত্যার জৈবিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক কারণগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার মতে, আত্মহত্যা একটি সামাজিক ঘটনা। তিনি মূলত সামাজিক সংহতি এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে আত্মহত্যাকে সম্পর্কিত করে দেখার চেষ্টা করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে ডুর্খেইম বলেন, যারা সমাজের সঙ্গে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত, তারা আত্মহত্যা করে। আবার যারা সমাজ থেকে অতিমাত্রায় বিচ্ছিন্ন, তারাও আত্মহত্যা করে।
আত্মহত্যা মহাপাপ। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। পৃথিবীর সব ধর্মে এবং নৈতিকতায় আত্মহত্যার পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে। যদি আমরা আত্মহত্যার পেছনের গল্পটি দেখি, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যে চিত্রটি মনে আসে, তা হলো যৌতুক, বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ, প্ররোচনা, চাপ, হতাশা, প্রেমে ব্যর্থতা, চাহিদা এবং আকাক্সক্ষার মধ্যে পার্থক্য, নেতিবাচক চিন্তাভাবনা, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যহীনতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি প্রভৃতি।
আত্মহত্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর থেকে পরিত্রাণের জন্য সাইকোথেরাপি, ইতিবাচক মনোভাব, সহানুভূতি, বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করা, কথা বলার ও আবেগ ভাগাভাগি করার পরিবেশ তৈরি করা এবং আত্মসমালোচনা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, এখনই পদক্ষেপ নিতে না পারলে পরবর্তী সময়ে আমাদের অনুশোচনা করতে হবে।
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমরা যদি তাদের শেখাতে পারি, ভালো-মন্দ যাই ঘটুক না কেন, সেটা জীবনেরই অংশ এবং আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে তাদের ধৈর্যশীল হতে হবে, তাহলে এ শিক্ষার্থীরা যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বাস্তবমুখী কিছু জ্ঞান যেমন: আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, ক্যারিয়ারকেন্দ্রিক দক্ষতা উন্নয়ন ইত্যাদি আত্মহত্যা হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রচারণা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এবং আত্মকর্মসংস্থান তৈরি, কমিউনিটি ও পরিবারের সহায়তায় হতাশামুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করতে এখনই সবার এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সবার সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা কমানো সম্ভব।
আত্মহত্যা রোধ করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব এবং এর প্রতিরোধে আমি-আপনি সবাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারি। কারও জীবনের কঠিনতম সময়ে আমাদের কর্মের মাধ্যমে সমাজের সদস্য হিসাবে, বাবা-মা হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে, বন্ধু হিসাবে, সহকর্মী বা প্রতিবেশী হিসাবে অবদান রাখতে পারি। যারা আত্মঘাতী হওয়ার মতো সংকটে ভুগছেন, তাদের সহায়তায় আমরা সবাই ভূমিকা রাখতে পারি। তাদের পাশে দাঁড়াতে পারি-সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজ জীবনের জন্য যা অপরিহার্য।
লেখক: শিক্ষক

