দক্ষিণ আফ্রিকা-বাংলাদেশ ওয়ানডে সিরিজ : অবিস্মরণীয় জয়ে নতুন ইতিহাস টাইগারদের
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৩:০০
বাংলাদেশ দলের এবার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকে নিয়ে ছিলো অনেক প্রত্যাশা। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনাও সাজিয়েছিলেন টিম ম্যানেজমেন্ট। আর প্রত্যাশা পূরণে শতভাগ সাফল্য দেখালো টিম টাইগার্স। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথমবারের মতো কোনো ফরম্যাটে সিরিজ জিতল টাইগাররা। বুধবার ওয়ানডে সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ম্যাচে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়েছে তামিম ইকবালের দল। বিস্তারিত লিখেছেন মো. আসাদুজ্জামান
দক্ষিণ আফ্রিকার সেঞ্চুরিয়নে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচে টাইগারদের বোলিং তোপে মাত্র ১৫৪ রানেই গুটিয়ে যায় স্বাগতিকরা। ম্যাচের ফল তখনই অনেকটা নির্ধারিত হয়ে যায়। বাকি কাজটুকু সারেন দুই ওপেনার তামিম ও লিটন। লিটনকে সঙ্গে নিয়ে দলের কাপ্তান তামিম গড়েন ১২৭ রানের দুর্দান্ত এক জুঁটি। ২১ ওভারের শেষ বলে ব্যক্তিগত ৪৮ রানে আউট হন লিটন। অন্যদিকে তামিম খেলেন ৮৭ রানের হার না মানা অধিনায়কোচিত এক ইনিংস। ৮২ বলের চমৎকার ইনিংসটি তামিম সাজান ১৪ বাউন্ডারিতে। অন্যদিকে উইনিং শটে সিরিজ জয় রাঙিয়ে নেওয়া সাকিব ২০ বলে ২ বাউন্ডারিতে অপরাজিত থাকেন ১৮ রানে। টাইগাররা ১৪১ বল হাতে রেখেই জয় পায় ৯ উইকেটে।
টস হেরে ফিল্ডিংয়ে নেমে শুরু থেকেই আগ্রাসী ছিলো প্রোটিয়ারা। ব্যাট হাতে শুরুটা ভালই করে দুই ওপেনার। তৃতীয় ওয়ানডেতে শুরুটা কিন্তু দারুণ হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার। ৭ ওভারে উইকেট না হারিয়ে তুলে ফেলে ৪৬ রান। কিন্তু কুইন্টন ডি কককে ফিরিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ রাশ টেনে ধরার পর জোড়া আঘাতে স্বাগতিকদের বিপদে ফেলেন পেসার তাসকিন আহমেদ। তুলে নেন কাইল ভেরিয়েনে ও আগ্রাসী ভঙ্গিতে খেলতে থাকা জানেমান মালানের উইকেট। পরে সাকিব আল হাসান উইকেট উৎসবে যোগ দিলে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। এখানেই শেষ নয়, খানিক পর শরিফুল ইসলাম উইকেটের খাতা খুললে বিপদ বাড়ে প্রোটিয়াদের। তাতে ৮৩ রানে হারায় ৫ উইকেট।
শরিফুল প্রথম ওভারে প্রোটিয়াদের বিপদে ফেলার চেষ্টা করলেও রিভিউ নষ্ট করেছেন। দ্বিতীয় বলটি ব্যাটের খুব কাছ দিয়ে যাওয়ায় শরিফুল মনে করেন, ব্যাট ছুঁয়ে গেছে। তামিম ইকবালকে রিভিউ নিতে ‘বাধ্য’ করেন। কিন্তু রিভিউতে দেখা গেছে বল ব্যাটেই লাগেনি! তৃতীয় ওভারে এই শরিফুলেরই দারুণ লেংথ বল বাতাসে ভাসিয়ে খেলেছিলেন ডি কক। কিন্তু বল ফিল্ডারের কাছে যাওয়ার আগেই মাটিতে ড্রপ খায়। এরপর সময় গড়ানোর সঙ্গে হাত খোলা শুরু করেন মালান। মেরে খেলতে থাকেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে বোলিংয়ে আনা হয় অফ স্পিনার মিরাজকে। নিজের দ্বিতীয় ওভারে ব্রেক থ্রুও এনে দেন তিনি। আগের বলে চার মারা ডি কককে বানিয়েছেন মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ঝড় তোলা প্রোটিয়া ব্যাটার ফিরেছেন মাত্র ১২ রানে।
প্রথম উইকেট পড়ার পর বাক্সবন্দি হয়ে পড়েন মালান। শুরুর আগ্রাসনটা কমিয়ে তার ইনিংস গড়ার পথে কাইল ভেরিয়েনে সঙ্গী হতে চাইলেও তাকে থিতু হতে দেননি তাসকিন। বল ব্যাটের কানায় লেগে আঘাত হানে ভেরিয়েনের স্টাম্পে। তার আগে এই ব্যাটার এক চারে করতে পারেন ৯ রান। প্রোটিয়াদের বিপদ আরও বাড়িয়ে দেন তাসকিন। শুরুতে আগ্রাসী ভঙ্গিতে খেলা মালানকে দারুণ এক ডেলিভারিতে গ্লাভসবন্দি করিয়েছেন তিনি। তাতে ৫৬ বলে ৭ চারে ৩৯ রানে শেষ হয় মালানের ইনিংস।
এরপর সাকিব ক্রিজে আসা তেম্বা বাভুমাকে এলবিডব্লিউতে ফেরালে ভীষণ চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। প্রোটিয়া অধিনায়ক রিভিউ নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। আউট হয়েছেন মাত্র ২ রান করে। কঠিন চাপে পড়া প্রোটিয়াদের আশা হয়ে বেঁচে ছিলেন তখন ফন ডের ডুসেন ও ডেভিড মিলার। সেঞ্চুরিয়নের প্রথম ওয়ানডেতেও বিপদের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন তারা। কিন্তু এবার আর হয়নি। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ধারাবাহিক পারফর্ম করতে থাকা ফন ডের ডুসেন পারেননি। তাকে বেশিদূর যেতে দেননি শরিফুল। এই বাঁহাতি পেসারের অপ্রত্যাশিত বাউন্সারে খেই হারিয়ে মিরাজকে সহজ ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৪ রানে বিদায় নেন প্রোটিয়া ব্যাটার।
জোড়া আঘাতে ৫ উইকেট তুলে নিয়েছেন তাসকিন। ২৯তম ওভারের তৃতীয় বলে ডেভিড মিলারকে আউট করে প্রোটিয়াদের আরও বিপদে ফেলেন ডানহাতি পেসার। দুই বল পর কাগিসো রাবাদাকে আউট করে ওয়ানডে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ৫ উইকেট পূরণ করেন ২৬ বছর বয়সী পেসার। সাকিব আল হাসানও আলো ছড়িয়েছেন, ৯ ওভারে মাত্র ২৪ রান খরচায় নিয়েছেন ২ উইকেট। আর একটি করে উইকেট শিকার শরিফুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের।

এমনিতেই স্বাগতিকদের ব্যাটিং লাইনআপের কোমর ভেঙে দিয়েছিলেন তাসকিন। তারপরও মিলার থাকায় কিছুটা হলেও আশা বেঁচে ছিল। পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে টিকে থাকার লড়াইয়ে ছিলেন বাঁহাতি ব্যাটার। তবে তার লড়াই বেশিক্ষণ টিকেনি। তাসকিনের লেগ স্টাম্পের বাইরের বাউন্স থাকা বল খেলতে গিয়ে উইকেটকিপার মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসবন্দি হন মিলার। হতাশ হয়ে ফেরার আগে ৩১ বলে ২ বাউন্ডারিতে করে যান ১৬ রান। দুর্দান্ত সময় কাটানো তাসকিনের উইকেট উদযাপনের শেষটা এখানেই নয়। ওই ওভারেই রাবাদাকে ফিরিয়ে পান ৫ উইকেট। নিচু ক্যাচ দারুণ দক্ষতায় গ্লাভসে নেন মুশফিক। রাবাদা ৩ বলে ১ বাউন্ডারিতে করেন ৪ রান। এরপর সাকিবের বলে লুঙ্গি এনগিদি শূন্য রানে ফেরেন। বাংলাদেশের বোলারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে প্রোটিয়াদের রান দেড়শ ছাড়াবে কিনা, সংশয় ছিল। শেষ পর্যন্ত তারা ১৫৪ রান করতে পেরেছে কেশব মহারাজের চমৎকার ব্যাটিংয়ে। শেষ ব্যাটার হিসেবে তিনি রান আউট হওয়ার আগে খেলেন দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮ রানের ইনিংস। ৩৯ বলের ইনিংসটি মহারাজ সাজান ৪ বাউন্ডারিতে।
রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন: দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সে দেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো ২-১ ব্যবধানে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ জয়ী হওয়ায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়, কোচ ও ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিনন্দন বার্তায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী প্রত্যাশা করেন, টেস্ট খেলাতেও ক্রিকেট দল জয়ের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। রাষ্ট্রপতির ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

যা পারেনি ইন্ডিয়া তাই করল টাইগাররা: প্রথমবারের মত দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে সিরিজ জয়, ভাবা যায়। সবশেষ সিরিজে যা পারেনি বিশ্বক্রিকেটের বড় শক্তি ইন্ডিয়াও। এই দক্ষিণ আফ্রিকায় এসে হেরে বিদায় নিতে হয় অষ্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড-পাকিস্তানের মতো দলকে। সেখানে এসেই দাপুটে পারফরম্যান্সে সিরিজ জয় করল তামিম ইকবালের দল। এই সিরিজ জয়ের আগে টাইগার কোচ রাসেল ডমিঙ্গো বলেছিলেন, আমরা এমন কিছু করতে চাই, যা আগে কোনো বাংলাদেশ দল এখানে করতে পারেনি। কোচের সেই কথা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখালেন তার শিষ্যরা। সেটিও একবার নয়, দুই-দুইবার! দক্ষিণ আফ্রিকায় দলটির বিপক্ষে প্রথম জয়ের অপূর্ণতা ঘোচানোর পর প্রথমবার সিরিজ জয়ের অনির্বচনীয় স্বাদও পেল বাংলাদেশ।
আইপিএল কেনো ডাকছে তাসকিনকে তারই যেনো এক প্রমাণ: দক্ষিণ আফ্রিকায় সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দলের এক ক্রিকেটারের আইপিএলে ডাক পাওয়া নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে হইচই পড়ে। এর নেপথ্যে ছিলো ওই ক্রিকেটারকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড এনওসি না দেয়া তথা ওই ক্রিকেটারও দেশের হয়ে খেলাকে প্রাধান্য দেয়া। হ্যাঁ, ওই ক্রিকেটারই দেশের জন্য বয়ে নিয়ে এলেন অনন্য এক উপহার। ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ। তিনিউ টাইগার পেসার তাসকিন আহমেদ। যার বোলিং তোপে প্রথমবারের মতো টাইগারদের কাছে নিজ দেশে সিরিজ হারল প্রোটিয়ারা। আর আইপিএল তাসকিনকে কেনো ডাকল সেটাই যেনো প্রমাণ দিলেন এই পেসার। তামিমের অসাধারণ ব্যাটিং কিংবা সাকিবের উইনিং শট- সেঞ্চুরিয়নের ম্যাচে সব ঢাকা পড়েছে তাসকিনের আলোতে। বাংলাদেশের সহজ জয়ের ভিত তো গড়ে দিয়েছিলেন এই পেসাররই। সেঞ্চুরিয়নের শেষ ওয়ানডেতে এককথায় বল হাতে আগুন ঝরিয়েছেন তাসকিন। করোনাভাইরাসের প্রকোপে সব ক্রিকেট যখন বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাসকিন ছিলেন নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে। চোট ও ফর্মহীনতায় হুমকির মুখে পড়ে যাওয়া ক্যারিয়ার এমনভাবে ছন্দে ফেরালেন যে, তার পেস আগুনে প্রতিনিয়ত দগ্ধ হচ্ছেন প্রতিপক্ষের ব্যাটাররা। এবারের দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে প্রোটিয়া ব্যাটারদের যেমন বেহাল অবস্থা। তার তোপে দাঁড়াতেই পারেননি কেউ! ৯ ওভারে মাত্র ৩৫ রান দিয়ে ৫ উইকেট পেয়েছেন এই পেসার। ম্যাচ ও সিরিজসেরার পুরস্কার উঠেছে তার হাতেই।

দক্ষিণ আফ্রিকায় যে কোনো সফরকারীদের এক দশকের খড়া কাটল: দক্ষিণ আফ্রিকা পেসারদের চারণভূমি হলেও সফরকারী দলের পেসারদের জন্য যেনো মোটেই সুখকর নয়। কেননা গত এক দশকে সেখানে কোনো প্রোটিয়াস প্রতিপক্ষ পেসার ৫ উইকেট পায়নি। সবশেষ ২০১২ সালের জানুয়ারিতে পার্লে লঙ্কান পেস গ্রেট লাসিথ মালিঙ্গা ৫ উইকেট নিয়েছিলেন ৫৪ রানে। এবার তাসকিন আহমেদের ৫ উইকেট দিয়ে যেমন কাটল লম্বা এক খরা। সেঞ্চুরিয়নে বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটিং গুঁড়িয়ে ৩৫ রানে ৫ উইকেট নেন তাসকিন। সফরকারী পেসারদের মধ্যে সবশেষ এমন সাফল্য পেয়েছিলেন লাসিথ মালিঙ্গা।
তাসকিন বললেন প্রসেসে স্থির থাকায় সাফল্য পেয়েছি:
ম্যাচ শেষে তাসকিন বলেন, পারফরম্যান্সে খুবই খুশি। চেষ্টা করেছি নিজের প্রসেসে স্থির থাকতে। পরিকল্পনা ঠিকঠাক প্রয়োগ করতে চেয়েছি। উইকেট থেকে বাড়তি বাউন্স পাচ্ছিলাম। সেজন্য লাইন-লেন্থ মেপে বল করে যাওয়ার দিকে জোর দিয়েছিলাম। উইকেটের সুবিধা পাওয়ায় সামান্য ভেরিয়েশন দেওয়ার চেষ্টা করেছি। গত দেড় বছর ধরে আমি প্রসেস ঠিক রেখে বোলিং করার চেষ্টা করছি, এটাই আমার সাফল্যের কারণ।
দেশের জন্য নিবেদিত প্রাণ সাকিব আল হাসান: নিজের পরিবারের ৫ সদস্য হাসপাতালে। এ কথা জানার পর কোনো ক্রিকেটারই ম্যাচ খেলার জন্য মানসিক ভাবে ফিট থাকবে না এটাই স্বাভাবিক। কেননা পরিবারের ওই সদস্যরা যে মা আর সন্তান। সাকিবের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল তাই। কি করবেন বুঝতে পারছিলেন না। অবশেষে দেশের জন্য শেষ ম্যাচটি খেলার সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন তিনি। আর ম্যাচ শেষে তৃপ্তির হাসিও হেসেছেন বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার। দেশের জন্য এমন নিবেদন কই জনই বা নেয়।
এই জয়ের ফলে সুপার লিগে নিজেদের নামের পাশে গুরুত্বপূর্ণ আরো ১০ পয়েন্ট যোগ করল বাংলাদেশ দল। ১৮ ম্যাচে ১২ ম্যাচে ১২০ পয়েন্ট লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইংল্যান্ড বাংলাদেশের চেয়ে ২৫ পয়েন্ট পিছিয়ে।
ইউডি/সুপ্ত

