পঁচিশে মার্চ এই গণহত্যাই বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা
মেহেরাবুল ইসলাম সৌদিপ । শুক্রবার, ২৫ মার্চ ২০২২ । আপডেট ০৮:৫০
২৫ মার্চ! বিশ্বের মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি ঘৃণ্য ও কলঙ্কিত হত্যাযজ্ঞের দিন৷ ১৯৭১ সালের এই ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাংলাদেশের তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালায় পকিস্তানি হানাদার বাহিনী। মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্ব পরিকল্পিত অপারেশন সার্চ লাইটের নীলনকশা অনুযায়ী বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ভয়াবহ ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্মরণ করে বাঙালি জাতি। পঁচিশে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট’র নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা মেতে উঠে। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে চালানো এই গণহত্যাই বিশ্বের ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা। ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ ছিল বাঙালির একটি প্রজš§কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এক নারকীয় পরিকল্পনা। পোড়া মাটি নীতি নিয়ে নেমেছিলো পাকিস্তানি ঘাতকরা। একটি জনগোষ্ঠীর স্বাধিকারের দাবিকে চিরতরে মুছে দিতে ঢাকায় চালানো ওই হত্যাযজ্ঞের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’। বাঙালি জাতির জীবনে আজ এক বিভীষিকাময় বেদনাবিধুর রাত। ১৯৭১ সালের আজকের রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র, নিরপরাধ ও ঘুমন্ত সাধারণ বাঙালির ওপর যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তা পৃথিবীর ইতিহাসে এক ঘৃণ্যতম গণহত্যার নজির হয়ে আছে।
১৯৪৭ সালের পশ্চাতপদ দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে পাকিন্তান নামের যে রাষ্ট্রের জš§ সেই রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যে পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শুরুতেই পাকিস্তানি শাসক শ্রেণী বাঙালি জাতির ওপর অত্যাচার নির্যাতন, শোষণ চালাতে থাকে। এই শোষণ অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুরুতেই প্রতিবাদ করতে থাকে বাঙালি জাতি। ধরাবাহিক আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে চলে আসে। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণায় ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো। আপামর জনতা বিদ্রোহ-ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসমাবেশে পতাকা উত্তোলন। ৩ মার্চ ঘোষণা হলো পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার, জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। বহুপ্রতীক্ষিত ৭ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। অসহযোগ আন্দোলন, যুদ্ধের প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশে। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা। এদিন সকালে পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ৪৫ মিনিট ধরে বৈঠক করেন। রংপুর, সৈয়দপুরও চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর গুলিতে ১১ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে পাট ব্যবসা ও টেলিযোগাযোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। তিনি দেশের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে সরকারের অতিরিক্ত কালক্ষেপণে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দুপুরের পর থেকেই ঢাকাসহ সারাদেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করতে থাকে। সকাল থেকেই সেনা কর্মকর্তাদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত।
পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে অপারেশন সার্চলাইটে নিহত ও বর্বরোচিত হামলা ও সেই নৃশংস ঘটনায় আক্রান্তদের স্মরণে ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে “গণহত্যা দিবস” হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর এই দিনটিকে গণহত্যা দিবস উপলক্ষে বাঙালি জাতি স্মরণ করে আসছে। ২৫ মার্চ কালরাতের সেই ভয়াবহ নৃশংসতা এবং ৯ মাসের হত্যাযজ্ঞের বিবরণ জনসমক্ষে নিয়ে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করে একটি দিবস পালন করা। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে দিনটি নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে গণহত্যার স্বীকৃতি আদায়। একই সঙ্গে আজ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ১৯৭১ সালের ১৯৫ জন পাকিস্তানি সৈন্যের বিচারের লক্ষ্যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জনমত গঠন। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা, সম্পদ ধ্বংস, লুণ্ঠনসহ নারী নির্যাতনের জন্য যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ। পাকিস্তানের কাছে পাওনা সব অর্থসম্পদের হিস্যা আদায় করাও আজকে একটি কর্তব্য।
২৫ মার্চের কালরাতের পরই নির্ধারিত হয়ে যায় স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এই গণহত্যার ইতিহাস বর্তমান প্রজš§ সহ ভবিষ্যৎ প্রজš§কেও মনে রাখতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। ইতোমধ্যে এই অপরাধযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জেনোসাইড ওয়াচ এবং লেমকিন ইন্সটিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন। এছাড়া সংস্থা দুটি জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যাকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য আহ্বান জানিয়েছে। ২৫শে মার্চ আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি লাভ করুক- এমনটাই প্রত্যাশা।
লেখক: শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইউডি/সুস্মিত

