আলফ্রেড নোবেল: যার নামে জ্ঞানীগুণীদের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২৭ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৬:৩২
| নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান এবং সম্মানজনক পুরস্কার। ইতিহাস খ্যাত এমন অমরকীর্তি রচনা করে নোবেল শুধু বৈজ্ঞানিক হিসেবেই নাম পেলেন না একজন মহান মানবপ্রেমিক, শান্তকামী দূত হিসেবেও অমর হয়ে রইলেন। |
নোবেল পুরস্কার একটি সার্বজনীন স্বপ্নের নাম। ‘নোবেল পুরস্কার’ শোনা মাত্রই চোখে ভেসে ওঠে সেরা পদার্থবিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, রসায়নবিদ, চিকিৎসাবিদদের কথা। নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট হিসেবেই প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার পান জ্ঞানীগুণী। এই পুরস্কারটিকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে সম্মানজনক ও দামী পুরস্কার। যে ব্যক্তির নামে পুরস্কারটি দেয়া হয়, তার নাম আলফ্রেড নোবেল। ডিনামাইটের জনক আলফ্রেড নোবেলের জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম
আলফ্রেড নোবেল কে ছিলেন?: আলফ্রেড বার্নার্ড নোবেল ছিলেন একজন সুইডিশ রসায়নবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং অস্ত্র নির্মাতা। তিনি ডায়নামাইট আবিষ্কার করেন। তিনি ব্যবসায়েও বিশেষ প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। বিখ্যাত ইস্পাত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোফোর্স এর মালিক ছিলেন অনেকদিন, প্রতিষ্ঠানটিকে এক সময় অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। আলফ্রেড নোবেলের নামে ৩৫০টি ভিন্ন ভিন্ন পেটেন্ট ছিল যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে ডায়নামাইট।
জন্ম ও পরিবার: চিরকুমার আলফ্রেড নোবেল ১৮৩৩ সালের ২১ শে অক্টোবর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম এমানুয়েল নোবেল। মায়ের নাম আন্দ্রিয়েতি নোবেল।
শৈশব ও শিক্ষা: আলফ্রেড প্রায়ই একটি শিশু হিসাবে অসুস্থ ছিল। কিন্তু তিনি সবসময় প্রাণবন্ত এবং তার চারপাশের বিশ্বের সম্পর্কে উদাসীন ছিল। যদিও তিনি একজন দক্ষ প্রকৌশলী এবং প্রস্তুত উদ্ভাবক ছিলেন, তবে আলফ্রেডের বাবা সুইডেনে একটি লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। আলফ্রেডের ৪ বছর বয়সে তার পিতা একটি বিস্ফোরক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে চলে যান। পরে ১৮৪২ সালে পরিবারকেও সাথে নিয়ে যান। আলফ্রেডের নতুন সমৃদ্ধ বাবা-মা তাকে রাশিয়ায় বেসরকারী শিক্ষাবোর্ডে পাঠিয়েছিলেন এবং তিনি দ্রুত রসায়নের বিকাশ করেছিলেন এবং ইংরেজী, ফরাসি, জার্মান ও রাশিয়ান ভাষা ও সুইডিশ ভাষা শিখে ফেলেন।
কর্মজীবন: আলফ্রেড নোবেল ১৮ বছর বয়সে রাশিয়া ত্যাগ করেন। প্যারিসে রসায়ন অধ্যয়নরত এক বছর অতিবাহিত করার পর, তিনি আমেরিকায় চলে যান। পাঁচ বছর পর, তিনি রাশিয়ার কাছে ফিরে আসেন এবং ক্রিমিয়ার যুদ্ধের জন্য তার পিতার কারখানায় সামরিক সরঞ্জাম নির্মাণে কাজ শুরু করেন। ১৮৫২ সালে যুদ্ধের শেষদিকে কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে যায়। পরে পরিবারসহ সুইডেনে ফিরে আসেন নোবেল। ১৮৬৪ সালে অ্যালফ্রেডের ২৯ বছর বয়সে আলফ্রেডের ছোট ভাই এমিলের সাথে পরিবারের একটি সুইডিশ কারখানায় বিস্ফোরণে পাঁচ জন নিহত হন। ভাইয়ের মৃত্যুর পর একটি নিরাপদ বিস্ফোরক আবিষ্কারের কাজে লেগে যান তিনি।
ডিনামাইট আবিষ্কার: সময়টা ১৮৬৭ সাল। একদিন তিনি তার গবেষণাগারে নাইট্রোগ্লিসারিন নামের একটা শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরি করছিলেন খুব সতর্কতার সাথে। কারণ সামান্য একটু ঝাকুনিতে ঐ বিস্ফোরকটি ফেটে গিয়ে ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। এক সময় ঐ তরল বিস্ফোরকের কিছুটা উপচিয়ে মাটির উপর রাখা একটা পাউডারের উপর গিয়ে পড়ে এবং সেটাকে দ্রবিভূত করে আঠালো বস্তুতে পরিণত করে। সেটাকে হাতে নিয়ে ছোট্ট একটা গোল ক্রিকেট বলের আকার দেন তিনি। পরে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে ফাঁকা জায়গায় ছুঁড়ে মারেন সেটা। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটায় বিকট শব্দে এবং নিক্ষিপ্ত জায়গায় একটা গর্তের সৃষ্টি করে। সেই বিস্ফোরককে “ডায়নামাইট” নামে অভিহিত করেন তিনি। এইভাবে আশ্চর্যজনকভাবে ডিনামাইট নামের বোমা তৈরি করতে সক্ষম হন আলফ্রেড নোবেল। তিনি ডিনামাইটের মতো ভয়াবহ বোমার আবিষ্কারক হলেও তিনি কিন্তু চাইতেন তার আবিষ্কৃত বোমা ধ্বংসাত্মক কাজে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন শান্তি প্রচেষ্টায় ব্যবহৃত হোক। যেমন পাহাড় পর্বতে সড়ক পথ নির্মাণ করতে, কয়লা ও বিভিন্ন খনিতে ডিনামাইট ব্যবহারই তার উদ্দেশ্য ছিল।
নোবেল পুরস্কার: আলফ্রেড নোবেল বিশ্ব বিখ্যাত হন ডিনামাইট আবিষ্কার করে। পরবর্তীকালে অমর হয়ে আছেন তার অর্জিত অর্থ থেকে নোবেল পুরস্কারের বিশেষ ব্যবস্থা করে যেতে পারায়। মৃত্যুর আগে ১৮৯০ সালে উইল করে তিনি তার সম্পদের চুরানব্বই শতাংশ নোবেল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্য উইল করে রেখে যান। যার আর্থিক মূল্য সেই সময় ছিল ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬৫ মিলিয়ন ডলারে। উইলে বলে যান, নোবেল ইনস্টিটিউটের কাজ হবে প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারের মধ্য দিয়ে অর্থ প্রদান করা। নোবেল ইনস্টিটিউটের অর্থ দিয়ে প্রতি বছর ৫টি বিশেষ ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরপ বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। বিশেষ ক্ষেত্র হলো (১) পদার্থবিদ্যা, (২) রসায়নশাস্ত্র, (৩) চিকিৎসাশাস্ত্র, (৪) সাহিত্য এবং (৫) বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রাখা। তার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর ১৯০১ সালে তারই নামে তার দেশের সরকার কমিটি গঠন করে নোবেল পুরস্কার চালু করেন। এমনকি তার মৃত্যু দিনেই প্রতি বছর নোবেল পুরস্কারে মনোনীত কৃতী ব্যক্তিদের পুরস্কার প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সাল থেকে অর্থনীতিতেও একটি নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়েছে।
শান্তকামী নোবেলের মৃত্যু: ১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির সান রেমোতে ৬৩ বছর বয়সে মারা যান বিখ্যাত এই আবিষ্কারক। জীবনের অন্তিম সময়ে নোবেল হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগেছেন। স্টকহোমের উত্তরাঞ্চলীয় সমাধিক্ষেত্রে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

