করোনাকালীন অনলাইন-অফলাইন শিক্ষাকার্যক্রম: পিছিয়ে পড়ছে কোমলমতি শিশু-কিশোররা
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১১:৫০
বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রকোপের ফলে দেশে দুই ধাপে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজ। ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের প্রাত্যহিক শিক্ষাকার্যক্রমে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে স্কুল বন্ধের সময়টাতে শিশু শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। বর্তমানে শিশুরা আবার স্কুলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরেছে। এই সময়টাতে তাদের শিক্ষায় ঘাটতি পূরণে জোর দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ। বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
মহামারি করোনায় দেশে দুই ধাপে বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজ। প্রথম ধাপ ২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তী ধাপে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি। বিশ্বে টানা স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষেই আছে বাংলাদেশের নাম। এই দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় দেশের প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ শিশুর শুধু শিক্ষাই ব্যাহত হয়নি, এ কারণে তাদের পড়তে ও গুনতে পারার প্রাথমিক দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। যদিও এই ঘাটতি মহামারীর আগেও ছিল। বুধবার (৩০ মার্চ) ‘শিশুরা কি সত্যিই শিখছে?’ শীর্ষক ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে শিশুদের ওপর কোভিড-১৯ মহামারি এবং এ কারণে স্কুল বন্ধ থাকার প্রভাব সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পর্যায়ের উপাত্ত এবং একইসঙ্গে মহামারির আগের সময়ে শিশুদের শিক্ষার অবস্থা কেমন ছিল, তা নিয়ে হালনাগাদ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বৈশ্বিক অবস্থা উল্লেখ করা হয় যে, গত ২ বছরে বিশ্বে প্রায় ১৪ কোটি ৭০ লাখ শিশু সশরীরে স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রমের অর্ধেকের বেশি হারিয়েছে। এতে বৈশ্বিকভাবে সশরীরে স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রমের ২ ট্রিলিয়ন ঘণ্টা নষ্ট হয়েছে।

প্রাথমিক দক্ষতার ঘাটতি উদ্বেগজনক: মহামারির প্রকোপের ফলে সারা বিশ্বেই শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যহত হয়। স্কুল-কলেজ টানা বন্ধ থাকে। তবে বন্ধ থাকার দীর্ঘ সময়ের তালিকায় উপরের স্থানেই আছে বাংলাদেশের নাম। এরই আলোকে ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিশুদের মাত্র ৩৪ শতাংশের পড়তে পারার এবং মাত্র ১৮ শতাংশের গুনতে পারার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে। এক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অবস্থা আরও খারাপ। প্রতিবেদনে পড়তে পারার দক্ষতা বিচারে গত একবছরে স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। গত একবছরের মধ্যে স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুদের মাত্র ২৯ শতাংশের পড়তে পারার প্রাথমিক দক্ষতা রয়েছে, যেখানে স্কুলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া শিশুদের মধ্যে এই হার ৩৯ শতাংশ।

এখনই পদক্ষেপ না নিলে প্রজন্ম ঝুঁকিতে পড়বে: বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, মহামারির আগেও বাংলাদেশের শিশুরা পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিল। কোভিডে বাংলাদেশের শিশুদের পড়াশোনায় যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে তাদের জন্য প্রতিকারমূলক শিক্ষা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এখনই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে তা পরবর্তী প্রজন্মের শিশু ও তাদের পরিবারের সামগ্রিক কল্যাণকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

শিশুদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হলে ভোগান্তি সর্বত্রই: ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, শিশুরা যখন তাদের শিক্ষক ও সহপাঠীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তাদের শেখার ক্ষতি হয়। যখন তারা একেবারেই যোগাযোগ করতে পারে না, তখন তাদের শেখার ক্ষতি স্থায়ী হতে পারে। শেখার সুযোগ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের অর্থ হলো শিক্ষা সবচেয়ে বড় সমতা বিধায়ক হওয়ার পরিবর্তে সবচেয়ে বড় বিভাজকে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যখন বিশ্ব তার শিশুদের শিক্ষিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন আমরা সবাই এর পরিণতি ভোগ করি।
প্রয়োজন স্বাভাবিক পরিস্থিতি যেখানে প্রয়োজন নিবিড় সহায়তা : ক্যাথরিন রাসেল আরও বলেন, মহামারির আগেও সবচেয়ে প্রান্তিক শিশুদের পেছনে ফেলে রাখা হচ্ছিল। আর মহামারি যখন তৃতীয় বছরে পা রাখছে, তখন আমাদের ‘স্বাভাবিক’ পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া সুযোগ নেই। আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি, শিশুদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের শেখার অবস্থা কী, তা মূল্যায়ন করা। তারা যা হারিয়েছে তা পুনরুদ্ধার করার জন্য তাদের প্রয়োজনীয় নিবিড় সহায়তা প্রদান এবং শিক্ষকরা যাতে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা উপকরণ পায় তা নিশ্চিত করা। এগুলো করতে না পারলে অনেক বেশি ঝুঁকি তৈরি হবে।

প্রাথমিক দক্ষতা শিখতে ৭ বছর লাগতে পারে: প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, যদিও স্কুলের বাইরে থাকা শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন, তবে ৩২টি দেশ ও অঞ্চলে মহামারীর আগের সময়ের উপাত্ত অত্যন্ত নিম্ন স্তরের শিক্ষার চিত্র তুলে ধরছে এবং সম্ভবত মহামারীর কারণে পড়াশোনার যে মাত্রার ক্ষতি হয়েছে তাতে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। যেসব দেশের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেসব দেশে শেখার বর্তমান গতি এতটাই ধীর যে বেশিরভাগ স্কুলগামী শিশুর পড়তে পারার প্রাথমিক দক্ষতা শিখতে ৭ বছর লাগতে পারে, যে দক্ষতা সাধারণত ২ বছরেই অর্জন করা যায় এবং প্রাথমিক পর্যায়ের গাণিতিক দক্ষতা অর্জনে ১১ বছর লাগতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, স্কুলগামী শিশুরা যে প্রাথমিক পর্যায়ের জ্ঞান অর্জন করবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে ৩২টি দেশ ও অঞ্চলের উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেখানে প্রায় ১৪ বছর বয়সী বা অষ্টম গ্রেডের শিক্ষার্থীদের এক চতুর্থাংশের পড়তে পারার প্রাথমিক দক্ষতা ছিল না। অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থীর ছিল না গাণিতিক দক্ষতা যা সাধারণত ৭ বছর বয়সী বা দ্বিতীয় গ্রেডের শিক্ষার্থীদের থাকার কথা।

আচরণগত পরিবর্তন মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা বাড়ায়: শিক্ষাবিদগণের বিশ্লেষণ বলছে, টানা স্কুলের বাইরে থাকার কারণে সিংহভাগ শিশুর মধ্যেই আচরণগত পরিবর্তন আসতে পারে এবং মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। শুধু তাই নয়, তাদের মধ্যে নিয়মতান্ত্রিক জীবনে অনভ্যস্ত হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বছরখানেক ধরে বাচ্চারা যদি একটা রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তারপর যদি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চায়, তখন কিন্তু তাকে খাপ-খাওয়াতে বেশ বেগ পেতে হবে। তারা তখন একা থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। অনেকেই তখন স্কুলে যেতে চাইবে না, বন্ধুদের মেলামেশা এবং সামাজিকীকরণেও এক ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে। একাকিত্ব, বিষন্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব বাড়িয়ে দেয়। নেতিবাচক আবেগগুলো আরও বেশি মাত্রায় বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিকীকরণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ও শেখার পূর্ণতা আসে। এতে মানুষের মানসিক ও শারীরিক বৃদ্ধি সমানুপাতিক হারে ঘটে। শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলির পরিস্ফুটন ঘটে। তাদের কাঙ্ক্ষিত নাগরিকে পরিণত করে। সাহসী, নিষ্ঠাবান, সৎ, নৈতিকতা বোধসম্পন্ন, দেশপ্রেমিক মানুষে রূপান্তরিত করে। কিন্তু কোভিড-১৯-এর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। ইউনিসেফ বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে।
ঘাটতির বিষয়ে নজর দেয়ার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর :শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ঘাটতি পুষিয়ে আনার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা.দীপু মনি বলেছেন, দীর্ঘ দুই বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় ঘাটতি হয়েছে। করোনাকালীন সময়ে তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা ট্রমার মধ্য দিয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, এই সময়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ঘাটতি হয়েছে। এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হবে এবং পূর্বের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে হবে। চলতি মাসের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী এসব কথা জানান। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট দেখে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে, কোথায় কেমন ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির বিষয়ে আমরা আরো নজর দিব বেশি। এক শিক্ষাবর্ষে হয়তো সব ঘাটতি পূরণ করতে পারবো না। যেখানে যা ঘাটতি হয়েছে, তা পূরণের চেষ্টা করতে হবে। দীপু মনি আরো বলেন, এইচএসসি পাশ করার পর যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রথম দিকে যে যে বিষয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিতে পাঠ গ্রহণ করবে তাদের সেই ক্ষেত্রে প্রাথমিক একটা অ্যাসেসমেন্ট করে সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। করোনা পরিস্থিতির কিছু উন্নতি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের এখন নিয়মিত ক্লাস হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা সংকট কাটিয়ে উঠতে পারে। (ইউনিসেফের জরিপ অবলম্বনে)
ইউডি/সুপ্ত

