অন্নদাশংকর রায়: সাহিত্যের চার স্তরে যার পদচিহ্ন

অন্নদাশংকর রায়: সাহিত্যের চার স্তরে যার পদচিহ্ন

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:১০

অন্নদাশংকর রায় এ যুগের এক বিরল সাহিত্য প্রতিভা । তিনি ছিলেন চতুর্মাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে বরেণ্য কবি, স্মরণযোগ্য কথা সাহিত্যিক, সুবিখ্যাত ভ্রমণকাহিনিকার এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক। সাহিত্যের এই চারটি শাখায় তার উজ্জ্বল পদচিহ্ন আঁকা। বিবেকবান অগ্রপথিক হিসাবে তিনি বাংলা সাহিত্যে বিরাজ করেছেন। চতুর্মাতিক প্রতিভার অধিকারী সাহিত্যিক অন্নদাশংকর রায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন অনিক সরকার

সংক্ষেপে অন্নদাশংকর
অন্নদাশংকর রায় একজন স্বনামধন্য বাঙালি কবি ও লেখক। ইন্ডিয়ার উড়িষ্যা জেলার এক কায়স্থ রায় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি একজন বিখ্যাত ছড়াকারও। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি সমাজ সেবামূলক নানা কাজের সঙ্গে অন্নদাশংকর নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন। তার বাড়িতে সকল ধর্মের জন্য ছিল একই ব্যবস্থা। বুদ্ধিজীবী মননশীল বাঙালি হিসাবে তিনি আমাদের পথ প্রদর্শক হিসাবে বিরাজ করেছেন। তবে নিজেকে বুদ্ধিজীবী বলতে ভালোবাসতেন না। তিনি বলতেন, আমরা সাধারণ মানুষের মধ্যে মিলেমিশে পথ চলতে ভালোবাসি।

জন্ম ও শৈশব
১৯০৪ সালে ১৫ মার্চ, ওড়িশার ঢেঙ্কানলের করদরাজ্যে তার জন্ম হয়। তিনি জন্মেছিলেন প্রবাসী বাঙালি পরিবারে। তার পিতার নাম নিমাইচরণ শংকর রায় ও তার মায়ের নাম হেমনলিণী রায়। তার শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল ওই অঞ্চলে। ওই অঞ্চলটির একটি বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে হয়তো তা মেলে না। অন্নদাশংকর বারবার তার শৈশবের প্রাকৃতিক পরিবেশের কাছে ফিরে গেছেন। তার লেখনীতে ফিরে এসেছে ওড়িশার এই অঞ্চলটি। তবে তাদের আদি বাড়ি ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার কোতরাং গ্রামে।

অন্নদাশংকর রায়ের শিক্ষাজীবন
তার পিতা কাজ করতেন ঢেঙ্কানলের রাজার কর্মচারী হিসেবে। ১৯২৫ সালে ইংরেজি সাহিত্যে সম্মানিক বি.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন অন্নদাশংকর। ছোটোবেলা থেকেই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে অসম্ভব আগ্রহী ছিলেন তিনি। ১৯২৬ সালে আই.সি.এস. পরীক্ষাতে রেকর্ড নম্বর পেয়ে প্রথম হলেন। প্রশিক্ষণের জন্য গেলেন ইংল্যান্ডে। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কলেজে অধ্যয়ন করেছিলেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিভিন্ন ইতিবাচক দিকগুলি আত্মস্থ করার চেষ্টা করেন।

অন্নদাশংকর রায়ের কর্মজীবন
ইংল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে হলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ১৯৪০ সালে বিচারক হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিচার বিভাগে সচিব পদে যোগ দিয়েছিলেন। কিশোর বয়স থেকেই তার সাহিত্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে যায়। অন্নদাশংকর ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। অযথা আবেগ দ্বারা তাড়িত হতেন না। কোনো বিষয়ে বৈরীতা প্রদর্শন করতেন না। নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করার এক ঈশ্বর দত্ত ক্ষমতা ছিল অন্নদাশংকরের। বুদ্ধিদৃপ্ত শব্দ সম্ভারে সাজিয়ে তুলতেন তার প্রবন্ধাবলি।

শান্তিনিকেতনে আসা
সর্বক্ষণ লেখক হবার মানসে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন অন্নদাশংকর। বিশ্ববরেণ্য সাহিত্য ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে বেশ কিছুদিন কেটে যায় তার। তারপর কলকাতায় এসে একটি সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে তোলেন। চাকরি সূত্রে তাকে বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করতে হয়েছে। সেখানকার সাধারণ মানুষদের সাথে মিশতে হয়েছে। তিনি তাদের দৈনন্দিন জীবনের কথা তুলে ধরেছেন গল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে।

অন্নদাশংকর রায়ের প্রবন্ধ রচনা
অন্নদাশংকর প্রবন্ধের উপজীব্য বিষয় হিসাবে তিনি বিভিন্ন সামাজিক সমস্যাকে বেছে নিয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজনীতি ও দর্শনকেও করেছেন প্রবন্ধ লেখার অন্যতম বিষয়। তার লেখা মৌলিক প্রবন্ধগুলির মধ্যে যে বৌদ্ধিক পরিস্ফুরণ আছে তা আমাদের অবাক করে দেয়। মৌলবাদী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কঠোর হাতে কলম ধরেছেন। তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা প্রায় দুশোর মতো। তার মধ্যে ৫০ টি বই হল প্রবন্ধ সাহিত্যের।

অনেকে বলে থাকেন, তার মতো বুদ্ধিজীবী, চিন্তক, মানবতাবাদী, প্রগতিশীল প্রাবন্ধিক বাংলা সাহিত্যের আর কেউ ছিলেন না। যে সব বিষয় নিয়ে তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন, সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রাসঙ্গিকতাকে আজও আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারব না। মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ, হিন্দু–মুসলমানের কথা জনসংখ্যার সমস্যা, সব কিছু নিয়েই অসাধারণ প্রতিবেদন রচনা করেছেন। প্রবন্ধের মাধ্যমে বিখ্যাত বাঙালি ব্যক্তিত্বদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন। প্রবন্ধের পাশাপাশি উপন্যাস, ছোটো গল্প, কবিতা ও ছড়ার ক্ষেত্রে স্ব–সৃষ্ট ধারার জন্ম দিয়েছিলেন।

অন্নদাশংকর রায়ের পুরস্কার
অন্নদাশংকর রায়কে ১৯৮৯ সালে ইন্ডিয়ার সাহিত্য অ্যাকাডেমির ফেলোশিপ প্রদান করেছিল। রবীন্দ্রভারতী এবং বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সাম্মানিক ডি.লিট ডিগ্রি পান। দু’বার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন, পেয়েছেন বিদ্যাসাগর পুরস্কার। সারা জীবনের সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি হিসাবে ইন্ডিয়া সরকারের কাছ থেকে পেয়েছেন পদ্মভূষণ খেতাব।

অন্নদাশংকর রায়ের কবিতা ও উপন্যাস
রাজনীতিকদের ব্যঙ্গ করে লেখা তার বিখ্যাত কবিতা “তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো” আজও এক বলিষ্ঠ প্রতিবাদী কবিতা হিসেবে অভিনন্দিত হয়।

দীর্ঘ এগারো বছরের চেষ্টায় লেখা ছয় খণ্ডে সমাপ্ত তার ‘সত্যাসত্য’ উপন্যাসটি বাংলায় দীর্ঘতম উপন্যাস। তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘পথে প্রবাসে’ বাংলা সাহিত্য এক অনুপম। ভ্রমণকাহিনী হিসেবে মর্যাদার আসনের অধিকারী । অন্যান্য বিশিষ্ট গ্রন্থ রত্ন ও শ্রীমতী, উড়কি ধানের মুড়কি, কন্যা, আগুন নিয়ে খেলা, রাঙা ধানের খই, বিনুর বই, জীবন–শিল্পী প্রভৃতি।

অন্নদাশংকর রায়ের মৃত্যু
২৮ শে অক্টোবর ২০০২ সালে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, কবি, ছড়াকার মানবতাবাদী অন্নদাশংকর রায় পরলোক গমন করেন। তার সম্পর্কে বলা যেতে পারে, তিনি ছিলেন বাঙালি প্রতিভার এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তাই আজও আমরা অন্নদাশংকর রায়কে মনে রেখেছি এক হৃদয়হীন প্রগতিবাদী চিন্তক হিসাবে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading