অটিজম: ভালোবাসা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে দূর হোক সকল প্রতিবন্ধকতা

অটিজম: ভালোবাসা ও সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে দূর হোক সকল প্রতিবন্ধকতা

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ০২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:৩০

প্রত্যেক বছর ২ এপ্রিলে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০০৭ সালে এই দিনটিকে অটিজম আক্রান্ত শিশু ও বয়স্কদের স্বাভাবিক জীবন প্রদানের লক্ষ্যে এই দিবস ঘোষণা করেন। আমাদের দেশে বেশ কিছু অটিজম স্কুল থাকলেও সেগুলো সমাজ থেকে তেমন সহযোগিতা পায় না। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রয়োজন সহায়ক শিক্ষা, সহানুভুতি ও সামাজিক হৃদ্যতা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন মো. সাইফুল ইসলাম

সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও আজ পালিত হবে ১৫তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। অটিজম বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দিবসটিতে এবারের প্রতিপাদ্য- ‘এমন বিশ্ব গড়ি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির প্রতিভা বিকশিত করি’। অটিজম কোনো মানসিক রোগ নয়। অটিজম হচ্ছে একটি নিউরোলজিক্যাল ও ডেভেপমেন্টাল ডিসঅর্ডার বা স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যা যা শিশুদের তিন বছরের মধ্যে ধরা পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিজঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) কর্তৃক দেশব্যাপী পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি ১০ হাজারে ১৭ জন অটিস্টিক। অটিজম মস্তিষ্কের স্নায়বিক সমস্যার কারণে হয়ে থাকে।

তাদের প্রয়োজন সহায়ক শিক্ষা: অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষাদানে গতানুগতিক ধারার শিক্ষা কার্যক্রম উপযুক্ত নয়। তাদের জন্য প্রয়োজন তাদের উপযুক্ত সহায়ক শিক্ষা ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের জন্য সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম দ্রুত চালু করা। তাতে তারা স্বাভাবিক মানুষের মত তাদের প্রতিভা বিকাশ করতে পারবে।
এদিকে, শ্রেণিকক্ষে অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষাদানে জনপ্রিয় গেইম পোকিমন গো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার একজন গবেষক। অটিজম গবেষক ও শিক্ষক ক্রেইগ স্মিথ জানান, ক্লাসের ভেতরে এবং বাইরে শিক্ষার্থীদের অগমেন্টেড রিয়ালিটি গেইম ব্যবহার করতে দেওয়া হলে তাদের সামাজিক আচরণে লক্ষণীয় মাত্রায় উন্নতি ঘটতে পারে বলে তার গবেষণায় দেখা গেছে। বিশেষ করে অটিস্টিক শিশুদের ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি খুবই কার্যকর হতে পারে বলে জানান তিনি।

সমাজের অংশ, বোঝা নয়: অটিস্টিকরা সমাজের বোঝা নয়, সম্পদ। এরাও সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই অবহেলা করা যাবে না। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, সেবা, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সহায়ক উপকরণ পেলে তারাও সামাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম। তাদের বিশেষ চাহিদাপূরণে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজের সব পেশার মানুষকে আন্তরিক হতে হবে তাদের প্রতি। তবেই তাদের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করা সম্ভব হবে।

নিশ্চিত করতে হবে সামাজিক মর্যাদা: অটিজমে আক্রান্তদের সামাজিক অধিকার ও মর্যাদা, রাষ্টীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ ও সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো তারাও স্নেহ-ভালোবাসার পাত্র, তারাও প্রিয়জনদের ভালোবাসতে ও তাদের কাছ থেকে ভালোবাসা পেতে চায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা সুস্থ ও স্বাভাবিক শিশুদের মতো অন্যান্য সকল সুবিধার পাশাপাশি উপযুক্ত শিক্ষার সুযোগ পায় না বলে ক্রমান্বয়ে তারা স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরে যায়। সমাজের বিভিন্ন কার্যক্রমে তাদের অংশ গ্রহণ তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

অমানবিক আচরণ নয়: অটিজমে আক্রান্ত একটি শিশুকে তার মেধার সঙ্গে পরিচয় করাতে হলে তার সঙ্গে আচরণ সহজ ও বন্ধুত্বপূর্ণ করতে হবে। তাকে সময় দিতে হবে। তার পছন্দ, অপছন্দ, ভয় পাওয়া, উত্তেজিত হওয়া এসব বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। এ ধরনের শিশু কিছু কিছু বিষয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠে আবার কোনো জিনিস সে খুব পছন্দ করে। এসবের সঙ্গে পরিচিত হলে তার সাথে মিশতে পারার কাজটি সহজ হয়ে ওঠে। একসময় আমাদের দেশে শারীরিক প্রতিবন্ধী, অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের প্রতি সমাজের সর্বত্রই ছিল অবহেলা। খুব বেশি হলে তাদের জন্য ছিল করুণা। এই ধরনের কার্যক্রম থেকে সরে আসতে হবে। অমানবিক আচরণ পরিহার করতে হবে। তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা উচিত। বাড়িতে এবং বিদ্যালয়ে অটিজমে আক্রান্ত শিশুকে উপযুক্ত পরিবেশ দিলে তার মেধা বিকশিত হবে এবং সমাজে সেও অবদান রাখতে পারবে।

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ

কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে: অটিজম আক্রান্তদের শুধু শিক্ষা বা সামাজিক মর্যাদা দিলেই হবে না। তাদের মূলধারার পেশায়ও অংশ গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। পরিপুর্ণ শিক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি তাদের দক্ষতা অনুযায়ী বিভিন্ন পেশায় নিয়োগ দিলে তারাও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে পারবে, হতে পারবে দেশের সম্পদ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর বাণী: বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, দিকনির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা প্রদানের মাধ্যমে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা সম্ভব। এক্ষেত্রে তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মক্ষেত্র ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমর্থন ও সহায়তা প্রদান অত্যন্ত জরুরি।প্রধানমন্ত্রীতার বাণীতে বলেছেন,অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিশু-কিশোরদের সম্ভাবনাগুলোকে চিহ্নিত করে সঠিক পরিচর্যা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলা হলে তারাও পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে গড়ে উঠবে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে সকল নাগরিকের সম-অধিকার নিশ্চিত করেছিলেন। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশের সবার অধিকার সুরক্ষায় বদ্ধপরিকর।প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু, ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, পরিচর্যাকারী, অটিজম বিষয়ক গবেষক, চিকিৎসক, থেরাপিস্ট, সহায়ক উপকরণ উদ্ভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংগঠনসমূহকে শুভেচ্ছা জানান।

অটিজম আন্দোলনে সায়মা ওয়াজেদ: এক সময় অটিজম ছিল একটি অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ইস্যু। এ সম্পর্কে সমাজে নেতিবাচক ধারণা ছিল। অটিস্টিক শিশুকে নিয়ে যখন পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের সমাজে বাবা-মা অত্যন্ত বিব্রতকর অবস্থায় পড়তেন, অটিস্টিক শিশুর জীবন যেখানে ছিল নরকসম তখন তাদের পক্ষে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র কন্যা ও স্কুল সাইকোলজিস্ট সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে বুঝাতে সক্ষম হন, অটিজম স্রেফ একটা রোগ; সঠিক চিকিৎসায় যার প্রতিকার হয়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা বরং বিশেষভাবে সক্ষম। তার নিরলস প্রচেষ্টায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অটিজম বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ২০০৭ সালে এ বিষয়ে দেশে কাজ শুরু করেন। সায়মা ওয়াজেদ এ অবহেলিত জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে তার বিরাট অবদানের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাংলাদেশে অটিজম-বিষয়ক বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছাদূত হিসেবেও কাজ করছেন সায়মা ওয়াজেদ। ২০১৬ সালে তিনি প্রতিবন্ধীদের ডিজিটাল ক্ষমতায়নের জন্য ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডেও সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। অটিজম নিয়ে আরও ব্যাপক আকারে কাজ করতে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ নামের একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান।

সায়মা ওয়াজেদ পুতুল

বোঝাপড়া বাড়াতে হবে অভিবাবকের: অভিবাবকদের তিনটি বিষয় খেয়াল রেখে বাচ্চার জন্য ইন্টারভেনশন প্ল্যান করতে হবে। বাচ্চার সঙ্গে বোঝাপড়া বাড়াতে হবে। প্রতিনিয়ত বাচ্চার সঙ্গে কথা বলে তাকে যোগাযোগে আগ্রহী করে তুলতে হবে। সে যাতে আপনাকে অনুকরণ করে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। স্পিচ থেরাপিস্টের কাছে নিয়ে যেতে হবে। কিছু গবেষণামূলক তথ্য থেকে দেখা গেছে যে নিয়মিত ব্যায়াম ও শারীরিক কার্যক্রমে অটিজম বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শিশুরা সামাজিক বিকাশ লাভ করে। শিশুরা অন্যদের সঙ্গে মিশতে পারে। তবে বেশির ভাগ অটিস্টিক শিশুর মাংসপেশির সমন্বয় ও কার্যক্ষমতা দুর্বল থাকে। হাতের আঙুলের মাংসপেশির দুর্বলতার কারণে অনেকেই পেনসিল ধরতে পারে না বা খুব সূক্ষ্ম কাজগুলো করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে শিশুর আঙুলের সমন্বয় ও কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে তাকে কাদামাটি বা ময়দার খামি দিয়ে খেলতে দিন। মা–বাবা বা বাড়ির সবাইকে শিশুদের সব কাজের প্রশংসা করতে হবে। আদর, উৎসাহ আর উদ্দীপনা দিয়ে কাছে টেনে নিতে হবে। ভালোবাসা দেখাতে হবে। হাসিখুশিভাবে তার সামনে থাকতে হবে। টয়লেট ক্লিনিং শেখাতে হবে। নিজের জামাকাপড় নিজেই পরা শেখাতে হবে। কখনোই তার এই শিশুকে অন্য স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে।

দৈনিক উত্তরদক্ষিণ । ২ এপ্রিল ২০২২ । ১ম পৃষ্ঠা

অটিস্টিকদের উন্নয়নে রয়েছে বিভিন্ন থেরাপি। যা তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনে অনেকটাই সাহায্য করে। তাদের সাথে স্বাভাবিক শিশুর মত আচরণ করলে এই বিশেষ শিশুরাও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারে। অটিজম-এ আক্রান্ত শিশু মানেই মানসিক প্রতিবন্ধী নয়, নয় বুদ্ধি প্রতিবন্ধীও। আপনার আমার বুদ্ধাঙ্ক যেমন কম বেশি হয়ে থাকে, অটিস্টিক বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও তেমনই হয়। বরং অটিস্টিক বাচ্চাদের কেউ কেউ ছবি আঁকা বা গণিতে স্বাভাবিক বাচ্চাদের তুলনায় অনেক ভালো হয়ে থাকে। অথচ আমাদের দেশে অটিস্টিক বাচ্চাদের ঘরের বাহিরে আনা হয় না। কেউ কেউ বা সন্তান হিসেবে পরিচয় ও দিতে চায় না। বোঝা ভেবে ফেলে রাখে অযত্নে অনাদরে। প্রতিটি শিশুই বিধাতার এক মূল্যবান উপহার। সে স্বাভাবিক হোক আর অটিস্টিক। এই শিশুদের আলাদা করে না দেখে আপন করে নিন। অটিস্টিক শিশুদের চাই শুধু একটু বাড়তি যত্ন, একটু বাড়তি ভালোবাসা আর একটু বাড়তি উৎসাহ।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading