শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা
মর্তুজা হাসান সৈকত । সোমবার, ০৪ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২০
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে সদ্য স্বাধীন হিসেবে জন্ম নেয়া বাংলাদেশ ছিল অপ্রতুল সম্পদ, দুর্যোগপ্রবণ আর দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ। তদুপরি, ঘাড়ে চেপে বসেছিল বিপুলসংখ্যক অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। সেখান থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন এখন অসামান্য। বিশ্বব্যাংক ও তার অনুসারীদের উন্নয়নের মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে এখন গর্ব করা যায়।মাত্রই কয় মাস আগে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে ২০১৭-এর মাঝামাঝি এসে প্রয়োজনীয় লক্ষ্যসমূহ (সূচক) অর্জন করে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছে যায়। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত সুখবর। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষে দেশের মানুষের মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়াবে দুই হাজার সাতশো পঁচাশি ডলার। আগামী অর্থবছরে সেটা তিন হাজার ডলারের ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করবে।
১৯৭১-এ কোথায় ছিলাম আর আজ আমরা কোথায় আছি, এ প্রশ্নে উন্নয়নের হিসাব নিতে গেলে কিছুটা বিস্মিতই হতে হয়। জন্মের শুরুতেই যে রাষ্ট্রের টেকসই না হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছিলেন বিশেষজ্ঞরা, সেই রাষ্ট্রটিই সব সংশয়কে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে গত পাঁচ দশকে। এই অর্জন কিন্তু সহজ ছিল না মোটেই। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, সেই সঙ্গে বিকৃত ইতিহাস আর ঔপনিবেশিক চেতনায় ঘেরা পরিবেশে কেটেছে এক লম্বা সময়। তবে জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার শাসনামলে গত একযুগের ইতিহাস ছিল ভিন্ন। মূলত এই সময়েই অর্থনীতি বিকশিত হয়েছে, আকারে বড় হয়েছে, গঠন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। চার গুণেরও বেশি বড় হয়েছে জিডিপি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নতুন রেকর্ড অর্জন করেছে। ছাড়িয়েছে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক। নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় অবকাঠামো। আর্থসামাজিক এবং অবকাঠামো খাতে হয়েছে বিস্ময়কর উন্নয়ন। এর ফলে দ্য ইকোনমিস্টের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নবম স্থান দখল করেছে। বিস্ময়কর উত্থানের কারণে বাংলাদেশকে এখন ‘এশিয়ান টাইগার’ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে।
এইচএসবিসির সর্বশেষ গ্লোবাল রিসার্চে বলা হয়েছে, বর্তমানে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির নিরিখে বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরের মতো দেশ যেখানে বাংলাদেশের পেছনে থাকবে। অপরদিকে, সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউবিএস জানিয়েছে, উন্নয়নের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ ২০৫০ সালে ১২তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হবে। বাংলাদেশের এই যে রূপান্তর এটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। গত এক যুগের দৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর সঠিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক পদক্ষেপে ধাপে ধাপে এসেছে এ অর্জন। তবে এখানে বেশ কিছু কারণে এই সময়ের ভেতরে উন্নত দেশের কাতারে প্রবেশ চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। এলডিসি থেকে উত্তরণের সুফল হিসেবে বেশকিছু সুবিধা যেমন পাওয়া যাবে তেমনই হারাতেও হবে বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা। যে সুযোগ-সুবিধাগুলো হারাতে হবে তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ কিছু উন্নত দেশ ও জোটের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করে ফেলতে হবে দ্রুত। এর পাশাপাশি সামনের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে দক্ষ জনশক্তি অর্জনেও জোর দিতে হবে। এর কারণ হচ্ছে, ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের বিভিন্ন খাত যেমন, তৈরি পোশাক, আইসিটি, নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পর্যটন, হালকা প্রকৌশল, স্বাস্থ্য সেবা, জাহাজ নির্মাণ আর ওষুধ তৈরি খাতে প্রায় ৭ কোটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনশক্তি এবং ব্যবস্থাপকের প্রয়োজন হবে।
দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাই দেশের অভ্যন্তরে মানবসম্পদ তৈরির পাশাপাশি অন্য কোনো কৌশলে মানবসম্পদ আহরণ করা সম্ভব কিনা সে ভাবনাও জরুরি। এর একটি সমাধান হতে পারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অভিবাসী বা প্রবাসী হয়ে বসবাস করা বাংলাদেশিরা। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এক কোটি বিশ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদের অনেকেই দক্ষ, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত। এই প্রবাসীদের মধ্যে রয়েছে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিবিদ, কৃষিবিদ, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক, ব্যবস্থাপনা এবং আইটি বিশেষজ্ঞ। এদের বড় একটি অংশই বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়ে আর দেশে ফেরেনি। যা বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিরাট ধাক্কা। আগামীর লক্ষ্য অর্জনে ও আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উৎস থেকে মেধা আহরণে গুরুত্ব দিয়ে ভাবার সময় এসেছে
শেখ হাসিনার গত এক যুগের শাসনামলে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে দুর্বার গতিতে। বেশকিছু সামাজিক সূচকের পাশাপাশি অর্থনীতির সূচকেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। এমডিজি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, উন্নত দেশের কাতারে প্রবেশের সোপান হিসেবে বিবেচিত এসডিজিও বাস্তবায়নের পথে। সাফল্যের এই ধারায় উজ্জীবিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নের জন্য ‘ভিশন’-৪১ অনুযায়ী যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে- আমাদের প্রতিজ্ঞা হোক সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী দুই দশকের ভেতরে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার উদ্দেশ্যে সচেষ্ট হওয়া। যে পথ নকশার পথ ধরেই অর্জিত হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা।
ইউডি/সুস্মিত

