বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিন্তকরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
আশরাফুল আলম । মঙ্গলবার, ০৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০
বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা মানবাধিকারের অংশ। দেশের মানুষ সে অধিকার কতটা ভোগ করছে? বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আর্সেনিক দূষণ আক্রান্ত মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। অগ্রগতি সত্ত্বেও এক কোটি ৯৪ লাখ মানুষ এখনো সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে থাকা আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এছাড়া পানিতে ম্যাঙ্গানিজ, ক্লোরাইড ও লৌহদূষণের কারণেও খাওয়ার পানির মান খারাপ থাকে। বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ পানির উৎসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি মাত্রায় ম্যাঙ্গানিজের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
পাহাড়ি এলাকা, শহরের বস্তি, দ্বীপাঞ্চল, উপকূলীয় ও জলাভূমিতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এসব জায়গায় বিশ্বাসযোগ্য পানির উৎস পাওয়া কঠিন। সারা দেশের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও হাইজিনের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সেগুলো থেকেও জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয় এবং তা নবজাতক ও মাতৃমৃত্যু হার কমানোর অগ্রগতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশে ২০১৫ সালে যত নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, তার প্রায় ২০ শতাংশই হয়েছে জীবাণু সংক্রমণের কারণে।
প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটি অর্থাৎ বাংলাদেশের ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দূষিত উৎসের পানি পান করে। আবার ঘরের কল বা টিউবওয়েলের আশপাশ পরিষ্কার না থাকায় বিভিন্ন অণুজীবযুক্ত পানি পানকারীর সংখ্যা দাঁড়ায় ৯ কোটি ৯০ লাখ। এছাড়া ঘনঘন বন্যা, ভূমিধস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও পানির উৎস দূষিত হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানির সংকট কাটছে না, বরং দিন দিন ভয়াবহ হচ্ছে। বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় পানি সংকট অত্যন্ত প্রকট। ওয়াসার দাবি, তাদের সরবরাহ করা পানি শতভাগ বিশুদ্ধ। অথচ একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে পান করেন।
ঢাকা ওয়াসার পানি দূষিত হওয়ার অনেক কারণের মধ্যে ৪টি প্রধান কারণ বলা যেতে পারে- ১. ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া নদী থেকে সরবরাহ করা পানি সঠিক উপায়ে শোধন না করা ও পানির জলাধারগুলো রক্ষণাবেক্ষণ না করা; তদুপরি শোধনাগারে পানি শোধনের সময় সঠিক পরিমাণে শোধন কেমিক্যাল না দেওয়া ২. পর্যাপ্ত দূরত্ব রক্ষা না করে সমান্তরালে পানির লাইন ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন স্থাপন, নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং ওভারহেড ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিষ্কার না করা। বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ও যোগান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা সাজানো উচিত।
ঢাকা শহরের বহু পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন লাইন যুগ প্রাচীন। সেই কবে স্থাপন করা হয়েছে। এরপর জোড়াতালি ছাড়া কার্যত কিছু করা হয়নি। তদুপরি অনেক ক্ষেত্রে লাইনগুলো গায়ে গায়ে লাগানো। ফলে কোনো কারণে দুটি লাইনের কোনো একটি অংশ ফেটে বা ভেঙে গেলে খাবার পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা মিশে যায় ৩. অনেক সময় রাস্তার পাশের বাসিন্দা পানি বা স্যুয়ারেজ লাইন নেওয়ার জন্য লোক নিয়োগ করেন। অনেক ক্ষেত্রে তারা থাকে অদক্ষ। ফলে কোদাল চালাতে গিয়েও পাইপ ফেটে যায়।
নিজের স্বাস্থ্য রক্ষার খাতিরে দূষিত পানি পান না করে পানির বিশুদ্ধতা রক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করা দরকার সবার। এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার করণীয় সবচেয়ে বেশি। সার্বিকভাবে ঢাকা শহরের পানি সংকট নিয়ে শিগগিরই কোনো উদ্যোগ না নিলে তা আস্তে আস্তে ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। কথায় আছে, দেওয়ালে পিঠ না ঠেকলে আমরা সচেতন হই না। ঢাকার পানি সমস্যার সঙ্গে ওয়াসা তথা সরকারের উদাসীনতা দেখে কিন্তু তারই প্রমাণ মেলে। কিন্তু আমরা চাই জীবনরক্ষাকারী বিশুদ্ধ পানি সমস্যার সঠিক সমাধান। পানি সংকট না মিটলে কেবল নগরবাসীই অসুস্থ হয়ে পড়বে না, সমস্যায় পড়বে সরকারও। এখনই বিশুদ্ধ পানির ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক হতে হবে সরকারকে।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

