কালীপ্রসন্ন সিংহ: বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ০৬ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৫৫
উনবিংশ শতকের বাংলা-সাহিত্য আন্দোলনে অন্যতম একজন পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। মাত্র উনত্রিশ বছরের জীবনে তিনি সাহিত্য ও সমাজের উন্নয়নের জন্য অসংখ্য কাজ করেছেন। তিনি বিধবা বিবাহের একজন সমর্থক ছিলেন। বহু বিধবা দুখিনীর জীবন পরিবর্তনের জন্য তিনি অকাতরে দান করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এর প্রিয় পাত্র ছিলেন তিনি। বাংলা নবজাগণের অন্যতম পথিকৃৎ কালীপ্রসন্ন সিংহের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
কালীপ্রসন্ন সিংহ কে ছিলেন?
কালীপ্রসন্ন সিংহ ছিলেন একজন ইন্ডিয়ান বাঙালি লেখক ও সমাজসেবক। বাংলা সাহিত্যে কালীপ্রসন্ন সিংহের দুই অমর অবদানসমূহের জন্য চিরস্মরনীয় হয়ে আছেন। সেগুলো হল, বৃহত্তম মহাকাব্য মহাভারতের বাংলা অনুবাদ এবং তার বই হুতোম প্যাঁচার নকশা।
কালীপ্রসন্ন সিংহের জন্ম
উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ কালীপ্রসন্ন ১৮৪০ সালের কলকাতার জোড়াসাঁকো অঞ্চলের বিখ্যাত জমিদার বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম নন্দলাল সিংহ। বাল্যবয়স থেকেই কালীপ্রসন্ন অসাধারণ মেধাবী ছিলেন। বালকের মাথায় বৃদ্ধের মস্তিষ্ক বললে যা বোঝায় তিনি ছিলেন তাই। অতি অল্প বয়সেই বিভিন্ন ভাষা ও বিষয়ে বুৎপত্তি লাভ করেন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের শিক্ষাজীবন
হিন্দু কলেজে ভর্তি হয়েও প্রথাবদ্ধ পড়া সম্পূর্ণ করতে পারেননি তিনি। তবে কলেজের অসম্পূর্ণ পড়া সম্পূর্ণ করেছিলেন একজন ইংরেজ গৃহশিক্ষকের সাহায্যে। বিদগ্ধ বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিদ্যোৎসাহিনী সভা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই সভা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ ছিল স্বদেশের সর্ববিধ উন্নতি বিধান। তাই সভ্যদের আলোচনার মুখ্য বিষয়ই ছিল ভাষা সাহিত্য ও সমাজের নানাবিধ সমস্যা।
উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ একজন লেখক ও নাট্যকার যিনি সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিলেন। খুবই স্বল্প পরিসর জীবনে কালীপ্রসন্ন যেসব কাজ করেছিলেন তা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। সমসাময়িক কালে তিনি ভাষা সাহিত্য ও সমাজ জীবনে প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের থিয়েটার ও পত্রিকা
সনাতনপন্থী সমাজের গোঁড়ামি ও কুসংস্কার তাকে পীড়িত করত। ১৮৫৫ সালে দেশবাসীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার ও প্রগতিমূলক চিন্তার প্রসার ঘটাবার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেন সভার মুখপত্র বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা। পরের বছর গড়ে তোলেন বিদোৎসাহিনী থিয়েটার। বস্তুতঃ এসব উদ্যোগের মাধ্যমেই বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে কালীপ্রসঙ্গের আবির্ভাবসূচিত হয়। শিক্ষার প্রসার ও উন্নতির উদ্দেশ্যে পরে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সর্বতত্ত্ব প্রবেশিকা, বিবিধার্থ, সংগ্রহ ও পরিদর্শক প্রভৃতি পত্রিকা। প্রাণিতত্ত্ব, ভূ–তত্ত্ব, শিল্প সাহিত্য ও সমাজ ছিল এইসকল পত্রিকার প্রধান বিষয়।
১৮৬০ সালে দেশে নীল সাহেবদের অত্যাচার এবং অসহায় চাষীদের দুরবস্থা অবলম্বনে রায়বাহাদুর দীনবন্ধু মিত্র রচনা করেছিলেন নীলদর্পণ নাটক। এই নাটক বহুভাবে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। মাইকেল মধুসূদন নাটকটি ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন। বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন পাদ্রী লঙ সাহেব। এর জন্য ইংরেজ সরকারের আদালতে তাকে অর্থদন্ডে দন্ডিত হতে হয়েছিল। জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ কালীপ্রসন্ন লঙ সাহেবের জরিমানার হাজার টাকা আদালতে জমা দিয়েছিলেন।
সমাজ হিতৈষী কালীপ্রসন্ন এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকার সম্পাদক হরিশ মুখোপাধ্যায় ও তার পরিবারবর্গকে; মুখার্জীস ম্যাগাজিন এর শম্ভুচন্দ্র মুখার্জী, শিক্ষক রিচার্ডসন ও লঙ সাহেব প্রমুখদের বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের আন্দোলন
বিদ্যাসাগর প্রবর্তিত বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ বন্ধ করার জন্য বিদ্যাসাগর দেশব্যাপী যে আন্দোলন আরম্ভ করেছিলেন তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন কালীপ্রসন্ন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের নাটক
কালীপ্রসন্ন সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছিলেন প্রধানতঃ নাটক রচনার মাধ্যমে। তার রচিত বাবু নাটক প্রকাশিত হয় ১৮৫৪ সালে। পরবর্তী তিন বছরে প্রকাশিত হয় বিক্রমোর্বশী, সাবিত্রী সত্যবান ও মালতী মাধব। তৎকালীন বাবু সম্প্রদায়ের রুচি বিকৃতি ও সাধারণ সমাজব্যবস্থার ত্রুটিপূর্ণ দিকগুলির প্রতি কটাক্ষ করে বিদ্রুপাত্মক রচনা হুতোম প্যাচার নন্স প্রকাশ করে ১৮৬২ সালে। হুতোম প্যাচা ছিল তারই ছদ্মনাম।
নানাদিক থেকেই এই গ্রন্থ স্মরণীয়। বিশেষ করে সংস্কৃত শব্দ কন্টকিত ভাষার পরিবর্তে সাহিত্যে কথ্য ভাষার প্রচলন করার লক্ষ্যে এই গ্রন্থটিই ছিল প্রথম পদক্ষেপ এবং এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে তিনি স্মরণীয়।
তার রচনাবলী
বাবুনাটক (১৮৫৪), বিক্রমোর্ব্বশী নাটক (১৮৫৭), সাবিত্রী সত্যবান নাটক (১৮৫৮), মালতীমাধব নাটক (১৮৫৯), হুতোম প্যাঁচার নকশা (১৮৬১-৬২), পুরাণসংগ্রহ (১৮৬০-৬৬), বঙ্গেশবিজয় (১৮৬৮ অসমাপ্ত), শ্রীমদ্ভগবদগীতার বঙ্গানুবাদ (১৯০২)।
অবদান
লোক জীবনের প্রাত্যহিক বিবরণে চলিত ভাষা যে সার্থক মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে এই গ্রন্থের দ্বারাই তা প্রমাণিত। আবার, হাস্য পরিহাস বা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ প্রয়োগেও চলিত গদ্যের উপযোগীতা প্রমাণিত হয়। কালীপ্রসন্ন প্রথম শেণীর ভাষাস্রষ্ঠা হয়েও তার অনুতাপ ছিল, তার বক্তব্য বঙ্কিমচন্দ্রের ভালো লাগে নি। এই সাহিত্য সম্রাটের উপেক্ষা থাকা সত্ত্বেও প্রবন্ধটি স্বমহিমায় বাংলা গদ্য সাহিত্যে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়ে রয়েছে। কালীপ্রসন্ন সিংহ তার এই সংক্ষিপ্ত জীবনে কেবল চতিহ্যচর্চা এবং প্রগতিশীল আন্দোলনের অন্যতম পুরোধারূপেই বন্দিত নন, বাংলা গদ্য সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ব্যক্তিত্বরূপেও তিনি নন্দিত।
কালীপ্রসন্ন সিংহের শ্রেষ্ঠ কীর্তি
মুল সংস্কৃত মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করে নিজ খরচে তা প্রকাশ করা কালীপ্রসন্ন সিংহের জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি। এই মহৎ কাজে তাকে উৎসাহিত করেছিলেন বিদ্যাসাগর স্বয়ং। তারই তত্ত্বাবধানে এবং হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য, ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, নবীনকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ পন্ডিতের সাহায্যে কালীপ্রসন্ন এই শ্রমসাধ্য দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন।
কালীপ্রসন্ন সিংহের মৃত্যু
কালীপ্রসন্ন সিংহ সরকার কর্তৃক অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট ও জাস্টিস অব দ্য পীস নিযুক্ত হয়েছিলেন। মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে ১৮৭০ সালের ২৪ শে জুলাই কালীপ্রসন্ন সিংহ অমৃতলোকে যাত্রা করেন।
ইউডি/অনিক

