অনলাইন গেমস যেন ডিজিটাল ড্রাগ
জেসমিন আক্তার । বুধবার, ০৬ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
আসক্তি সবার কাছে একটি সুপরিচিত শব্দ। আসক্তি হলো কোন কিছুর প্রতি এমন তীব্র নেশা, টান বা মোহ যা থেকে সামান্য সময়ের জন্য বিচ্যুত হলে মানসিকভাবে কেউ চরম অসুস্থ অনুভব করে। যেমন মদ বা মাদক জাতীয় দ্রব্যাদির প্রতি কারোর নেশা থাকলে তাকে আমরা মাদকাসক্ত বলে থাকি। কেহ ধুমপানে নেশাগ্রস্থ হলে তাকে বলি ধুমপানাসক্ত। এ ধরণের আসক্তি সম্পর্কে আমরা সচরাচর শুনে থাকি, কিন্তু ডিজিটাল আসক্তি বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের জন্য এক মারাত্মক আসক্তি, যে ব্যাপারে আমরা অনেকেই জানিনা বা অহর্নিশ শুনতেও পাইনা।
ডিজিটাল আসক্তি বলতে ডিজিটাল ডিভাইসের প্রতি এমন মোহ বা টান যা ব্যবহারকারীদেরকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন করে তোলে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তথা ভিডিও গেম, অনলাইন বিনোদন, মোবাইল অপারেশন, ডিজিটাল গ্যাজেট এবং সোশ্যাল নেটওয়ার্ক প্ল্যাটফর্মগুলিতে নেশাগ্রস্থ করে রাখে।
আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা বিনোদনের জন্য অনলাইন গেমস, পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার বেছে নেয়। তারা বাড়ির কোনো এক স্থানে বসে মত্ত থাকে অনলাইন ভিডিও গেমস খেলায়। এভাবেই কাটিয়ে দেয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের জন্য সর্বাধিক জনপ্রিয় অনলাইন ভিডিও গেমগুলি হ’ল পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার, যা আজকাল অত্যধিক খেলতে দেখা যায়।
পাবজি গেমের বিশ্লেষণে দেখা যায় যে একটি পরিত্যক্ত দ্বীপে ১০০ জন লোক বাস করছেন, যেখানে কিছু খেলোয়াড় প্যারাসুট নিয়ে এসে বেঁচে থাকার লড়াই শুরু করে দেয়। এটি চার গ্রুপে খেলা যায়। এই চারজন খেলোয়াড় ১০০ জনকে হত্যার বড় লড়াইয়ে লিপ্ত হয়ে হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। এই গেমের মূল ভিত্তি হ’ল ‘হত্যা করো, বেঁচে থাকো’। এককথায় ‘টিকে থাকার জন্য, হত্যা করো’ এটি এ গেমটির মূল লক্ষ্য।
ফ্রি ফায়ারও এই গেমটির আদলে সৃষ্ট একটি মডেল গেম। বিশ্ব পরিসংখ্যানগুলিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীরা এ দুটি গেম সবচেয়ে বেশি খেলছে। একাধিক সমীক্ষা অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বের ৮৭ কোটি ছেলেমেয়ে প্রতিদিন পাবজি এবং ফ্রি ফায়ার খেলছে। গুগল প্লে স্টোর থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি ডাউনলোড করা হচ্ছে। অন্য একটি অনলাইন সমীক্ষা বলছে যে বাংলাদেশে প্রতিদিন এক কোটিরও বেশি এ গেম খেলা হচ্ছে। মজার বিষয় হ’ল, যারা এই গেমগুলি তৈরি করছে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এই গেমাসক্তি থেকে দূরে রেখেছেন।
তাদের একমাত্র লক্ষ্য হ’ল পরবর্তী প্রজন্মকে বুদ্ধিহীন অনুগত অনুসারী হিসেবে তৈরি করা। প্রতিটি জনপ্রিয় ডিজিটাল গেম হ’ল ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস-সহিংসতা যুদ্ধ এবং মৃত্যুর গল্প। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও অদৃশ্য কারণে এটি থামানো যায়নি। তরুণ প্রজন্মকে যদি আসক্তি থেকে মুক্তি দেওয়া না যায়, তবে তাদের একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
উন্নত প্রযুক্তি আধুনিক জীবন ধারায় এনেছে আমূল পরিবর্তন। সবার হাতে হাতে পৌঁছে গেছে স্মার্টফোন। মানুষের দৈনন্দিন অনেক কাজই এখন অনলাইন নির্ভর। এরই মাঝে ভয়ংকর হয়ে উঠছে অনলাইন গেমস আসক্তি। সবার হাতে ইন্টারনেট থাকার ফলে সহজেই বিভিন্ন অনলাইন গেমসে আসক্ত হয়ে উঠছে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। তাদের টার্গেট করে বিভিন্ন আকষর্ণীয় গেমস বানানো হচ্ছে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সমাজে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার ফলে প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় স্কুল কলেজ বন্ধ রয়েছে, আর এই অবসর সময়ে অনলাইন গেমসেই সময় কাটাচ্ছে কিশোর-তরুণরা।
যে সময়ে তাদের হাতা থাকার কথা বই সেখানে তাদের হাতে থাকছে স্মার্টফোন। ধর্মীয় বা নৈতিক শিক্ষার অগ্রহী করে তোলা উচিত। মাঠে খেলাধুলার ব্যবস্থা করা জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ সময় তারা অনলাইন গেম খেলে কাটাচ্ছে। ফলে তাদের মেধা বিকাশ সঠিকভাবে হচ্ছে না। তাই সচেতন অভিভাবকরা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব স্কুল কলেজে খুলে নতুন প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
লেখক: অনলাইন বিশ্লেষক
ইউডি/অনিক

