দুই যুগ পরে হঠাৎ নতুন মোড়: বিচার নিশ্চিত হবে কী
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ০৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:১৫
প্রায় দুই যুগ আগে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার শিকার হন তৎকালীন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী। মামলাটির কার্যক্রমে হাই কোর্টের স্থগিতাদেশ ছিল। এবার এই ঘটনা নতুন মোড় নিলো। মামলার এক আসামি আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পরে অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসা শুরু হয়েছে। তবে এবার কী ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দোষীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আসবে। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
ঢাকাই চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক সোহেল চৌধুরী। অভিনেত্রী দিতির সঙ্গে জুঁটি বেধে ব্যবসাসফল সব হিট সিনেমা উপহার দিয়ে যাচ্ছিলেন। ভালোবেসে এই জুঁটি বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হন। তাদের ঘরে এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান। কিন্তু সব সুখ যেন নিমিষেই বিলীন হয়ে যায়। ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে নির্মম ভাবে সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। বাংলা চলচ্চিত্র হারায় শীর্ষ এক নায়ককে। সবর্ত্রই নেমে আসে শোকের মাতম। ওই দিনই তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাত দিয়ে যেতে যেতে মানুষ যেস ভুলেই গিয়েছিল সবকিছু। তবে, এবার ওই মামলা নতুন করে মোড় নিলো। ওই হত্যার ঘটনায় করা মামলার ৮ নম্বর আসামি ছিলেন ট্রাম্পস ক্লাবের স্বত্বাধিকারী আশিষ রায় চৌধুরী ওরফে বোতল চৌধুরী। এতদিন তিনি পলাতক ছিলেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) রাতে রাজধানীর গুলশানের একটি ভাড়া বাসা থেকে র্যাবের একটি টিম আশিষ রায়কে গ্রেপ্তার করে।
দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের বিচার ব্যবস্থায় দৃষ্টান্ত হোক: জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। তার খুনের ঘটনার পর গোটা শিল্পীসমাজ এবং তৎকালীন তরুন প্রজন্মের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছিলো। প্রায় দুই যুগ পরে হঠাৎ করে এই হত্যা মামলার আসামিকে গ্রেপ্তার করে নতুন মোড় নিয়েছে। এখন দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই সবার দাবি। এই মামলার যারা এখনও পলাতক রয়েছে তাদেরকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। সেটা যেমন সোহেল চৌধুরীর পরিবারের জন্য এক বড় পাওয়া হবে ঠিক তেমনি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

তিন কারণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা নায়ক সোহেল চৌধুরী খুন: র্যাব কর্মকর্তা খন্দকার আল মঈন বলেন, ট্রাম্পস্ ক্লাবে জনসম্মুখে আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে সোহলে চৌধুরীর অপমান করার প্রতিশোধ, মসজিদ কমিটিকে উস্কে দেওয়ার পেছনে সোহেল চৌধুরীর হাত আর এই ক্লাবের ব্যবসার হুমকির পেছনেও সোহেল চৌধুরী। এই তিন কারণে সোহেল চৌধুরীকে উঠিৎ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আজিজ মোহাম্মদ ভাই, বান্টি ইসলাম ও আশীষ রায় চৌধুরী একটি পরিকল্পনা করে। ট্রাম্পস্ ক্লাবে সেসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল জানিয়ে র্যাব বলছে, আশীষ চৌধুরীদের পরিকল্পনায় ইমন এই হত্যাকান্ড ঘটান। মামলার তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার আবুল কাশেম ব্যাপারী নয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। অভিযোগপত্রে আসামির তালিকায় আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে ছিলেন ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম ও আশীষ চৌধুরী, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, আদনান সিদ্দিকী, তারিক সাঈদ মামুন, সেলিম খান, হারুন অর রশীদ ওরফে লেদার লিটন ও ফারুক আব্বাসী। এই মামলায় আশীষ চৌধুরী শুরু থেকেই পলাতক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও ছিল। বিদেশে থাকা আজিজ মোহাম্মদ ভাই ছাড়াও বান্টি ইসলাম, সেলিম খান, ইমনের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এই মামলায় ২০০১ সালের ৩০ অক্টোবর ঢাকার দায়রা জজ আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। এরপর মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০০৩ সালে ঢাকার ২ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়। কিন্তু এক আসামির পক্ষে হাই কোর্টে মামলাটি বাতিল চেয়ে আবেদন করা হলে আদালত একটি রুল দেয়; সেই সঙ্গে বিচারিক আদালতে মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ আসে। এরপর দীর্ঘদিন মামলাটির নথিপত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সবার নজরে আসে। তারপর বিচারিক আদালতে পুনরায় বিচার শুরু হয়। এখন ঢাকার আদালতে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।

‘হত্যার পেছনে আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও ট্রাম্পস ক্লাবের ২ মালিক’: আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম ও আশীষ রায় চৌধুরীর পরিকল্পনায় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করেন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। আশীষ রায় চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করে র্যাব বলেছে, জিজ্ঞাসাবাদে আশীষ জানান, বনানীর আবেদীন টাওয়ারের অষ্টম তলায় ট্রাম্পস ক্লাবের পাশেই ছিল বনানী জামে মসজিদ। সোহেল চৌধুরী মসজিদ কমিটিকে নিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবের অসামাজিক কাজ বন্ধে একাধিকবার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। এ কারণে ক্লাবের মালিক বান্টি এবং আশীষের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর শত্রুতা তৈরি হয়। স্বার্থে আঘাত লাগে আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও ইমনের। তাদের সবার চক্ষুশূলে পরিণত হন সোহেল চৌধুরী। ১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই ট্রাম্পস ক্লাবে উপস্থিত সবার সামনে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর হাতাহাতি হয়। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ আজিজ প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য বান্টি ও আশীষকে অনুরোধ জানান। পরে তারা তিন জনই সোহেল চৌধুরীকে হত্যার জন্য সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনকে প্রস্তাব দেন। ইমন তাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করে।

পলাতক আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আশিষ রায়ের: আশিষ রায় অসংখ্যবার বিদেশে গেছেন। তিনি কানাডায় চার/পাঁচ বছর ছিলেন। একই মামলায় কানাডায় পলাতক থাকা বান্টি ইসলাম, থাইল্যান্ডে পলাতক থাকা আজিজ মোহাম্মদ ভাই, মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে যাওয়া আদনান সিদ্দিকীর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। গত ২৮ মার্চ আশিষ রায় চৌধুরীর নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে ছিলেন তিনি। এজন্য ৭ এপ্রিল কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। এ কারণে নিজের বাসা ছেড়ে গুলশানে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। যেটি একটি পাঁচ তারকা হোটেলের এমডি ভাড়া করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে কানাডায় যেতে তিনি একটি এয়ারলাইন্সের টিকিটও কাটেন।

হত্যা মামলার আলামত উপস্থাপনের নির্দেশ: সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার জব্দ আলামত আগামী ১৭ এপ্রিলের মধ্যে আদালতে উপস্থান করতে পুলিশের মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সেই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে কেস ডায়েরি একইদিন উপস্থাপন করতে বলেছেন। বুধবার (৬ এপ্রিল) ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচার মো. জাকির হোসেন এ আদেশ দেন। শুনানি মুলতবি চেয়ে আইনজীবী আফরিন শিল্পী পৃথক দুটি আবেদন করেন। এদিন আদালতে তারিক সাঈদ মামুনকে কারাগার থেকে হাজির করা হয়। আদনান সিদ্দিকী ও ফারুক আব্বাসী উপস্থিত ছিলেন। তারা বর্তমানে জামিনে আছেন। ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও ট্রামস ক্লাবের স্বত্বাধিকার আফাকুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলামসহ ৬ জন বর্তমানে পলাতক। বাকিরা হলেন সানজিদুল ইসলাম ইমন, আশীষ রায় চৌধুরী, ব্যবসায়ী সেলিম খান ও হারুনুর রশিদ ওরফে লেদার লিটন।

সোহেল চৌধুরীর দুই সন্তান স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন: তৎকালীন সময়ের চলচ্চিত্রের তারকা তারকা জুটি সোহেল চৌধুরী ও পারভীন সুলতানা দিতি। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। গত শতকের ৮০ এর দশকে এফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকার চলচ্চিত্র খুঁজে পেয়েছিল দিতি ও সোহেল চৌধুরীকে। চলচ্চিত্রে জুটি বেঁধে অভিনয়ের পর জীবনেও জুটি বাঁধেন তারা। এরপর একের পর এক হিট সিনেমা দিয়ে দিতি ঢালিউডে তার আসন পাকাপোক্ত করলেও সোহেল হত্যাকাøের শিকার হয়ে অকালেই হারিয়ে যান। সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর অনেক দিন পর দিতি বিয়ে করেছিলেন আরেক চলচ্চিত্র তারকা ইলিয়াস কাঞ্চনকে। তবে সেই বিয়ে বেশি দিন টেকেনি।২০১৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দিতির মৃত্যু হয়। তাদের দুই সন্তান শাফায়েত চৌধুরী ও লামিয়া চৌধুরীকে সংবাদ মাধ্যমের সামনে খুব একটা দেখা যায় না; বাবা-মাকে হারানোর পর তাদের স্মৃতিচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। সোহেল-দিতির ছেলে শাফায়েত চৌধুরী কানাডার রিয়ারসন ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে নেদাল্যান্ডসের আমস্টারডামে আমেরিকাভিত্তিক একটি বিপণন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। মেয়ে লামিয়া কানাডার টরন্টো ফিল্ম স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় এসে নির্মাণে মনোযোগী হয়েছিলেন। দিতির মৃত্যুর পর ২০১৬ সালে তার ইচ্ছা অনুযায়ী ‘দুই পুতুল’ শিরোনামে একটি নাটক নির্মাণ করেছেন লামিয়া; পরে আর নিয়মিত দেখা যায়নি তাকে। লামিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, এত বছর পর আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে, দেখলাম। দেখতে চাই কী হয়। আই ক্যানট শেয়ারিং এনিথিং অ্যাট দ্য মোমেন্ট। সরি অ্যাবাউট দ্যাট। কিছুই বলার নাই, দেখছি কী হচ্ছে। অনেক বছর পর আসামি গ্রেপ্তার করছে তারা, দেখি কী হয়।’
ইউডি/সুপ্ত

