সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বিশ শতকের প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: বিশ শতকের প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:২০

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন একজন বিশ শতকের শেষভাগে সক্রিয় একজন প্রথিতযশা বাঙালি সাহিত্যিক। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর পূর্ববর্তী চার দশক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসাবে সর্ববৈশ্বিক বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। কৃত্তিবাস যুগের প্রাণপুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কে ছিলেন?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, সম্পাদক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসাবে অজস্র স্মরণীয় রচনা উপহার দিয়েছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা কবিতার জীবনানন্দ-পরবর্তী পর্যায়ের অন্যতম প্রধান কবি। তার জন্ম বাংলাদেশের মাদারীপুরে। ১৯৫৩ সাল থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস নামে একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন।

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ একা এবং কয়েকজন এবং ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ প্রকাশিত হয়। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হল আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি, যুগলবন্দী (শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে), হঠাৎ নীরার জন্য, রাত্রির রঁদেভূ, শ্যামবাজারের মোড়ের আড্ডা, অর্ধেক জীবন, অরণ্যের দিনরাত্রি, অর্জুন, প্রথম আলো, সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, ভানু ও রাণু, মনের মানুষ ইত্যাদি।

ছাত্র বয়স থেকেই হুটহাট বেরিয়ে পড়তেন। জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই বাউন্ডুলেপনা তার কোনও দিন থামেনি। সাঁওতাল পরগণা থেকে প্যারিস, নিউ ইয়র্ক থেকে শান্তিনিকেতন, সুনীলের উৎসাহ সমান। তিনি নিজেই বলতেন, লেখক হওয়ার কোনও দুরাকাঙ্খা তার ছিল না। কলেজ জীবনে সুনীলের স্বপ্ন বলতে একটাই, জাহাজের খালাসি হয়ে সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলায় মাইজপাড়া গ্রামে ছিল তার পৈতৃক বাড়ি। তার পিতা কালীপদ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতার টাউন স্কুলের শিক্ষক। সেই সূত্রে ১৯৩৮ সাল থেকেই উত্তর কলকাতায় বসবাস শুরু। চার ভাইবোনের মধ্যে সুনীলই বড়। সংসারে অনটন ছিল। সেটা আরও বাড়ল দেশ ভাগের পর। বিশাল পরিবারে তখন কালীপদের রোজগারই ভরসা। উপার্জনের চেষ্টাতেই ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ফলে পিতার সঙ্গে সুনীলের তেমন যোগাযোগ গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। সুনীলকে বই পড়ার নেশাটি ধরিয়েছিলেন মা মীরা দেবী।

শৈশব ও শিক্ষাজীবনে কবিতা লেখা শুরু
কবিতা লেখার ক্ষেত্রে কিন্তু অনুঘটকের ভূমিকাটা পিতারই ছিল। সুনীল তখন টাউন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। ছুটির ক‘মাসে ছেলে যাতে বিপথে না যায়, পিতা আদেশ করলেন সময়টা ইংরেজি চর্চার কাজে লাগাতে হবে। টেনিসনের কবিতা অনুবাদ করে দেখাতে হবে। কিছু দিন চলল সুনীল লক্ষ্য করলেন, ইদানীং তার পিতা আর অনুবাদ আক্ষরিক কি না, মিলিয়ে দেখছেন না। সুতরাং নিজের ঈশ্বরীকে উদ্দেশ করে নিজেই লিখতে শুরু করলেন কিছু লাইন আর সেগুলোই দেখতে দিলেন পিতাকে। এই ভাবেই কবিতায় হাত অভ্যাস করা শুরু।

সুনীলের কর্ম জীবন
সিটি কলেজে অর্থনীতির ছাত্র সুনীল। তখন সিগনেট প্রেস তথা দিলীপকুমার গুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ। দিলীপ কুমারের পরামর্শ এবং সহায়তা নিয়েই ‘কৃত্তিবাসে’র পথ চলা শুরু। কলকাতার রাজনৈতিক আবহ তখন উত্তাল। প্রথম সম্পাদকীয়তে সুনীল লিখলেন, “বিভিন্ন তরুণদের বিক্ষিপ্ত কাব্য প্রচেষ্টাকে সংহত করলে–বাংলা কবিতায় প্রাণছন্দের উত্তাপ নতুন আবেগে এবং বলিষ্ঠতায় লাগতে পারে এবং সকলের মধ্যে প্রত্যেকের কন্ঠস্বরকেই আলাদা করে চেনা যেতে পারে।”

সম্পাদকের স্বপ্ন সত্য হয়েছিল। এক মলাটে সুনীলদের সঙ্গে লিখতে লাগলেন সমর সেন, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরা। সপ্তম ও অষ্টম সংখ্যা উপহার দিল আরও কয়েকটি নাম– শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, তারাপদ রায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। দ্বাদশ সংখ্যায় সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। এই তরুণ ব্রিগেড শুধু মধ্যরাতের কলকাতাই শাসন করেননি, বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরে গিয়েছে এদেরই লেখনীতে। সুনীল ও শক্তির এক একটা পংক্তি বাঙালির কাছে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।

আনন্দবাজার পত্রিকায় যুক্ত হওয়া
বেশ কয়েক বারই ছোটখাটো চাকরি করেছেন, ছেড়েছেনও। ১৯৭০ সাল থেকে পাকাপাকি ভাবে আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা বিভাগের সঙ্গে যুক্ত হলেন। তার পরে দেশ বা আনন্দবাজার মিলিয়ে একাধিক বিভাগের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকার হয়ে চাসনালা খনি দুর্ঘটনা, ইন্দিরা গান্ধী হত্যা, বার্লিন প্রাচীরের পতনের মতো ঘটনা কভারও করেছেন। দু’বার আনন্দ পুরস্কার পেয়েছেন।

তার কবিতা ও উপন্যাস
সুনীলের প্রথম কবিতা দেশ এ প্রকাশিত হয়। তার প্রথম উপন্যাসও দেশেতেই প্রকাশিত হয়। ‘আত্মপ্রকাশ’ বেরোয় ১৯৬৬ তারপর একে একে অরণ্যের দিনরাত্রি, প্রতিদ্বন্দ্বী, অর্জুন, জীবন যে রকম। ১৯৭১ সালে সন্তু–কাকাবাবু সিরিজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। আশির দশকে হাত দিলেন বৃহৎ উপন্যাসে। জন্ম নিল ‘সেই সময়’। ক্রমান্বয়ে রচিত হলো পূর্ব–পশ্চিম, প্রথম আলো।

বই, গ্রন্থ ও গল্প সমুহ
উনিশ থেকে আটাত্তর, এর মধ্যে সুনীলের শুধু বইয়ের সংখ্যাই আড়াইশোর বেশি। সম্পাদিত গ্রন্থ পঞ্চাশের অধিক। কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণসাহিত্য, নাটক, চিত্রনাট্য, শিশুসাহিত্য– এতগুলি শাখায় সাবলীল বিচরণের রবীন্দ্রিক উত্তরাধিকারটি সুনীলের জন্যই তোলা ছিল৷

চলচ্চিত্রে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
তার অব্যর্থ জনপ্রিয়তা, সুনীলের অভিজ্ঞান চিনে নেওয়া যায় সহজেই। দেশি–বিদেশি অজস্র ভাষায় অনুবাদ হয়েছে তার লেখা। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, গৌতম ঘোষের মতো পরিচালকরা সুনীলের কাহিনি অবলম্বনে চলচ্চিত্র করেছেন। তার গল্প থেকে একাধিক টেলিধারাবাহিক হয়েছে। সুনীলের নিজের চিত্রনাট্যে তৈরি ছবি ‘শোধ’ জাতীয় পুরস্কার পায়। ‘সিটি অফ জয়’ ছবির মুখ্য পরামর্শদাতাও ছিলেন সুনীলই।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যু
২০১২ সালের ২২শে অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কবি লেখক কৃত্তিবাস যুগের প্রানপুরুষ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মহাপ্রয়ান ঘটে।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading