মার্কো পোলো: বিশ্বের প্রথম দুঃসাহসী অভিযাত্রী
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ১৩ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৪৫
মার্কো পোলো হলেন প্রথম সেই দুঃসাহসী ব্যক্তি যিনি কবি নজরুলের ভাষায় ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে’ বলে বিশ্বের অজানা দুর্গম পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আবিষ্কার করেছিলেন কতো অজানা পথ, পৃথিবীর রহস্যময় হাজারো ইতিহাস। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে রচনা করেছিলেন মিলনসেতু। মার্কো পোলো ছিলেন একেবারে বংশগতভাবেই অভিযাত্রী যাযাবরের যাযাবর। দুঃসাহসী ইতালীয় পর্যটক মার্কো পোলোর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
মার্কো পোলো হলেন বিশ্বের প্রথম দুঃসাহসী অভিযাত্রী। তিনি একজন দুঃসাহসী ইতালীয় পর্যটক। যিনি পায়ে হেঁটে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি অনেক অজানা পথের আবিষ্কারক। পৃথিবীর রহস্যময় হাজারো ইতিহাসের স্বাক্ষী সে। তিনিই প্রথম প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গে রচনা করেছিলেন মিলনসেতু।
মার্কো পোলো কে ছিলেন?
মার্কো পোলো ছিলেন একজন ভেনিসীয় (ইতালীর রাজধানী) পর্যটক এবং বণিক। পশ্চিমাদের মধ্যে সর্বপ্রথম সিল্ক রোড পাড়ি দিয়ে চীন দেশে এসে পৌঁছানো লোকজনের মধ্যে মার্কো পোলো ছিলেন অন্যতম। ইউরোপীয়দের কাছে চীনের তৎকালীন নাম ছিল ক্যাথে। এছাড়া মার্কো সর্বপ্রথম ইউরোপীয় হিসেবে মঙ্গোলদের সাম্রাজ্যে পদার্পণকারীদের অন্যতম। সে সময় মঙ্গোল সাম্রাজ্যের (চীন) সম্রাট ছিলেন কুবলাই খান। তার বই “লিভ্রে দেস মারভেলেস দ্যু মন্দে” (অর্থঃ বিস্বয়কর পৃথিবীর বর্ণনা) সমগ্র ইউরোপের কাছে এশিয়া এবং চীনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।
মার্কো পোলো এর জন্ম ও পরিবার
১২৫৪ খ্রীস্টাব্দে মার্কো পোলো ইতালীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম নিকোলো পোলো। তারা ইতালীর রাজধানী ভেনিস শহরে বসবাস করতেন। মার্কো পোলোর বাবাকে ব্যবসা–বাণিজ্যের কারণে দেশ বিদেশ ঘুরতে হতো সবসময়। তার জন্মের সময় তার বাবা–কাকা বাণিজ্য সফরে বিদেশে ছিলেন। এক আধ বছর নয়, মার্কো পোলোর বয়স যখন ১৭ বছর, তখন তার বাবা–কাকা দেশে ফিরে আসেন।
ইতালীর পোলোদের ছিলো এটাই জীবন। ওরা কখনো ঘরে থাকতো না। কেউ স্থল পথে, কেউ বা জলপথে চলে আসতো তুরস্কের কনস্টান্টিনোপলে। কনস্টান্টিনোপল সেকালে ছিলো ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। তুরস্কের ভেতর দিয়ে কেউ চলে আসতো আরো পুর্বদিকে তেহরান, খোরাসান, বোখারা, পামীর, কিরঘিজ প্রভৃতি শহরে। এসব দেশের রাজা–বাদশা খান সুলতানদের কাছে মূল্যবান মণি–মানিক্য, জিনিসপত্র বিক্রি করে ঘরে ফিরতো তারা।
মার্কো পোলো এর জীবনের অভিযান
তাতার সম্রাট কুবলাই খাঁ মার্কো পোলোর বাবা ও কাকাকে একবার ধর্ম প্রচারক নিযুক্ত করেছিলেন। যীশু খ্রীস্টের কবরের আলোর তেল নিয়ে তারা যখন কুবলাই খাঁর দরবারের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন, তখন মার্কো পোলোও তাদের সঙ্গে গেলেন। শুরু হলো তার জীবনের অভিযান। মার্কোর যাত্রাপথ সহজ ও সুগম ছিলো না। দুর্গম পথে হাজারো বিপদ আর রহস্য। পথে পড়েছে কখনো ধু–ধু মরুভূমি, কখনো পর্বতের সঙ্কীর্ণ ও বিপদসঙ্কুল পথ। উট, গাধা আর কুকুর নিয়ে মাসের পর মাস তারা হেঁটে চলেছেন এক দেশ থেকে আর এক দেশে।
জর্জিয়ার পথের অদ্ভুত ঘটনা
জর্জিয়ার পথে চলতে চলতে ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা। কোথা থেকে উড়ে এলো এক পক্ষীরাজ। সে মার্কোদের তাঁবুর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের মাল বহনের গাধা আর ঘোড়াগুলোকে ঠোটে করে নিয়ে গেল আকাশের দিকে, শূন্যে। মার্কোর বাবা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এটা হলো বাস্তবের বড় জাতের রক্তপায়ী ‘আভিগি’ নামের শকুন। এরা যেমন হিংস্র তেমনি বিশাল। বড় বড় জন্তু শিকার করতে পারে। এই জর্জিয়া পাহাড়ে তারা দেখেছিলো আর এক আশ্চর্য বস্তু—জ্বলন্ত জল। যে জল জ্বলে ওঠে। আসলে সেটা ছিলো জ্বলন্ত পেট্রোল। তারা সেদিন অবশ্য তা বুঝতে পারেনি।
এগিয়ে চলার বিরাম নেই তবু মার্কোদের। ক্রমে ক্রমে পিছনে ফেলে এলেন কোহিস্তানের পর্বতমালা, কাশগড় ইয়ারখন্দ, খেটান, পিয়েন, কারাকোরাম কিউনলুন। এরপর দীর্ঘ এক মাসে পাড়ি দিলেন বিপজ্জনক তাকালামাকান মরুভূমি। এসে পৌঁছলেন টাঙ্গুর হামি শহরে৷ তারপর পৌঁছলেন কান–চৌ শহরে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে চীনের বিখ্যাত প্রাচীর। মহামান্য কুবলাই খানের সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি এখান থেকেই। তারপর তারা যাত্রা করলেন অভীপ্সিত পথের দিকে।
কুবলাই খাঁর দরবার
নানা বিপদাপদে ও অজস্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একদিন তারা কুবলাই খাঁর দরবারে পৌঁছালেন। কুবলাই খাঁ তাঁদের সমাদর করলেন খুব। বেশি মুগ্ধ হলেন দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত তরুণ সওদাগর মার্কোকে দেখে। তিনি মার্কোকে একান্ত সহকারী হিসাবে নিয়োগ করলেন। তিনি তার বুদ্ধি অভিজ্ঞতা দক্ষতা আর সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একদিন কুবলাই খাঁর মন্ত্রীসভায়ও স্থান করে নিলেন।
মার্কোর দেশে ফিরে আসা
ইতিমধ্যে দীর্ঘ ঊনিশটি বছর পার হয়ে গেছে। মার্কো দেশে ফেরার মনস্থ করলেন। সম্রাটের পুত্রের জন্য পাত্রী খুঁজে দিয়ে এবং কুবলাই খাঁর মৃত্যু হওয়াতে মার্কো পরে আবারো দেশে ফিরে আসেন। ইতোমধ্যে তার আন্দামান, শ্রীলঙ্কা, মালাবার দ্বীপ ভ্রমণ করা হয়ে গেছে।
তার বই লেখা
দেশে ফিরে এক যুদ্ধে গিয়ে মার্কো শত্রুদের হাতে বন্দী ও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। এতে অবশ্য তার একটা ভালো সুবিধে হয়েছিলো। কারাগারের অবসর সময়ে সে তার বহু বছরের দীর্ঘ ভ্রমণের রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে একটি বই লিখলেন। বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনী।
মার্কো পোলোর মৃত্যু
এই মহান অভিযাত্রী মার্কো পোলোর মৃত্যু হয় ১৩২৩ খ্রীস্টাব্দে। মার্কো আজও তার রোমাঞ্চকর অভিযাত্রার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন।
ইউডি/অনিক

