ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা রায়: জঙ্গিবাদ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা রায়: জঙ্গিবাদ ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:১০

বাংলাদেশে মুক্তমনা লেখকদের মধ্যে প্রথম জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিলেন হুমায়ুন আজাদ। বিচারের নানা ঘাত পেড়িয়ে অবশেষে দেড় যুগ পর সেই হত্যা মামলার রায় হলো। জাতি দেখল ধীরে হলেও দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত। এছাড়াও এটা স্পষ্ট হলো দেশে বিচার ব্যবস্থা তার আপন আলোয় গতি বাড়াচ্ছে। শুধু হুমায়ুন আজাদ হত্যাকাণ্ডই নয় বিচারে গতি পাচ্ছে জঙ্গি হামলার অন্যসকল মামলাও। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল, সময়টা ১৮ বছরেরও বেশি। দেশের বরেণ্য লেখক হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে এত লম্বা সময়। তবে শেষতক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। হুমায়ুন আজাদের পরিবার ও ভক্তরা একরাশ হতাশা নিয়ে দেশের বিচার ব্যবস্থার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। এই মামলার রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার বহু দিকই খোলাসা করেছে। এ রায়ে মিলছে দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিত। পাশাপাশি জঙ্গিগোষ্ঠীদের দ্বারা হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোও যে এ রায়ে তার গতি বাড়াবে তা বলতে এখন তেমন বাঁধা নেই। বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক অভিজিৎ রায়, যুক্তিবাদী লেখক অনন্ত বিজয় দাশসহ প্রগতিমনা তরুণ লেখক-প্রকাশকের খুন হওয়ার ঘটনা বারবারই হুমায়ুন আজাদকে মরে করিয়ে দেয়। তার ওই ঘটনার সঙ্গে যে সাদৃশ্য রয়েছে পরের ঘটনাগুলোর। এসকল হত্যাকান্ডের দু’একটি ছাড়া মামলাগুলোর কোনোটারই খুব বেশি অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। আর তাই এই মামলার রায় অন্ধকারে সূর্য দেখার মতোই। এখন হুমায়ুন আজাদের পরিবারের মতো তার ভক্ত-অনুসারীদের চাওয়া দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হোক। মামলাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণটা এই যে, হুমায়ুন আজাদ জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিলেন ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, আর রায় হলো তার ১৮ বছর পর। তা ছাড়া, এ মামলায় চার্জশিট দিতে পুলিশের আট বছরেরও বেশি সময় লেগেছে। অন্যদিকে, দণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির মধ্যে দু’জনকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি।

জঙ্গিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখতে হবে: ড. হুমায়ুন আজাদ যে সময়টায় জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছিলেন, সে সময়ে দেশে জঙ্গি তৎপরতা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, প্রগতিশীল ধারার লেখক, অ্যাক্টিভিস্টরা সব সময় আতঙ্কে থাকতেন। বর্তমান সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ফলে দেশে এখন জঙ্গি তৎপরতা এখন নেই বললেই চলে। হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায়ের পর জঙ্গিদের কাছে আরেকটি বার্তা পৌঁছল যে, মানুষ খুন করলে পার পাওয়া যাবে না।
সকলের এটাই প্রত্যাশা থাকবে যে, হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার বর্তমান রায় উচ্চ আদালতেও বহাল থাকবে এবং শেষ পর্যন্ত আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। একই সঙ্গে দাবি থাকবে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক দুই আসামিকে খুঁজে বের করে তাদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে।
আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই, সতর্ক থাকতে হবে সবসময়: বর্তমান সময়ে জঙ্গি তৎপরতা স্তিমিত হয়ে এলেও আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। জঙ্গি তৎপরতার ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সদা সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। দেশের কোথায় কীভাবে জঙ্গিরা অবস্থান করছে কিংবা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেদিকেও থাকতে হবে সতর্ক দৃষ্টি। এক কথায়, জঙ্গিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত রাখতে হবে।

এখনও পূর্ণাঙ্গ বিচার পাওয়ার আক্ষেপ: হুমায়ুন আজাদের ছোটো ভাই, এ মামলার বাদী মঞ্জুর কবির রায়ের পর তার প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেছেন, ফাঁসির রায় হয়েছে? ওই গৎবাঁধা। যাদের ফাঁসি হল তারা আদৌ ছিল না কিনা কে জানে? যে মূল আসামি তাকেইতো মামলায় রাখা হয়নি। প্রতিক্রিয়া দিয়ে কী হবে, ভাইতো ফিরবে না। যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি (হুমায়ুন আজাদ) হামলায় আহত হওয়ার পর দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীকে দায়ী করেছিলেন। তাকেই যখন বাদ দেওয়া হল, তারপর তো আর কিছু থাকে না। একই ধরনের বক্তব্য এসেছে লেখক, শিক্ষক, সহকর্মীদের কাছ থেকেও। তারা বলেছেন, এ রায় পেতে বিলম্ব হয়েছে অনেক, এখন সাজা যেন দ্রুত কার্যকর হয়। হুমায়ুন আজাদের সহকর্মী অধ্যাপক রফিকুল্লাহ খান বলেন, এ রায়ে যারা ধর্মান্ধ, জঙ্গিবাদী, তাদের যদি শিক্ষা হয়, তবেই এ রায় ঘোষণার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাইদী এ মামলার বিচারে না আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধী হয়েও কীভাবে এতটা সেইফ থেকে গেল, কীভাবে- এটা বুঝতে পারলাম না। যার নাম হুমায়ুন আজাদ স্বয়ং বলে গেছেন তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েই কিন্তু আঘাতটা করে। এখন রায় দ্রুত কার্যকর করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

অনন্য আজাদ

প্রসঙ্গত, প্রথমে দায়ের করা হত্যা চেষ্টা মামলায় পুলিশ ২০০৭ সালের ১৪ নভেম্বর হত্যাচেষ্টা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেয়। কিন্তু তাতে আপত্তি জানিয়ে বাদী মঞ্জুর কবির ২০০৯ সালের অক্টোবরে অধিকতর তদন্তের আবেদন করেন। সেই আবেদনে তিনি বলেছিলেন, পাক সার জমিন সাদ বাদ বইটি প্রকাশের পর ২০০৩ সালের ২৩ নভেম্বর জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সংসদে বইটির সমালোচনা করেন, কিন্তু তদন্ত কর্মকর্তা তার বিষয়ে তদন্ত করেননি। অপরাধী চক্র একটি বৃত্তি দিয়ে হুমায়ুন আজাদকে জার্মানিতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি হত্যার শিকার হন। হুমায়ুন আজাদ নিজেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় হামলার পেছনে মৌলবাদী সংগঠন এবং যুদ্ধাপরাধী সাঈদীর জড়িত থাকার ইংগিত করেছিলেন সাংবাদিকদের কাছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন। সিআইডির পরিদর্শক লুৎফর রহমান মামলাটি তদন্তের পর ২০১২ সালের ১৪ মে হত্যাচেষ্টার সঙ্গে হত্যার অভিযোগ যুক্ত করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। মো. মিজানুর রহমান মিনহাজ ওরফে শফিক ওরফে শাওন ওরফে হামিম ওরফে হাসিম, আনোয়ারুল আলম ওরফে ভাগ্নে শহীদ, নূর মোহাম্মদ শামীম ওরফে জে এম মবিন ওরফে সাবু, সালেহীন ওরফে সালাউদ্দিন ওরফে সজীব ওরফে তাওহিদ এবং হাফিজ মাহমুদ ওরফে রাকিব ওরফে রাসেলকে সেখানে আসামি করা হয়। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় আসামির তালিকা থেকে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীকে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়।

সাঈদী আসামি নয়, তাই রায় হলেও মামলা অসম্পূর্ণই রইলো’: হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার রায় নিয়ে খুব একটা উদ্রগ্রীব নন তার ছেলে অনন্য আজাদ। জামায়াতে ইসলামী নেতা রাজাকার দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী এবং হরকাতুল জিহাদের মুফতি আব্দুল হান্নানের নাম মামলায় থাকলেও যেদিন চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়, সেদিন থেকেই এই মামলার অগ্রগতি নিয়ে তিনি, তার মা কোহিনূর এবং বোন স্মিতার আগ্রহের মৃত্যু ঘটে বলে জানান তিনি।
হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টা মামলার একজন সাক্ষী ও পরিবারের সদস্য হিসেবে তিনি বলেন, এই মামলা এখনও অসম্পূর্ণ। আর সম্পূর্ণ করতে চাইলে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে হত্যা প্ররোচনার মামলায় গ্রেপ্তার করতে হবে। হুমায়ুন আজাদকে ধারণ করার মতো বাংলাদেশ আমরা যেমন গড়তে পারিনি, তেমনই হুমায়ুন আজাদ হত্যাচেষ্টা মামলার রায় ধারণ করাও সম্ভব নয়। তিনি বলেন, যেখানে উস্কানিমূলক লেখা প্রকাশ না করা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলা দিয়ে অসংখ্য অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, সাধারণ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়, সেখানে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রত্যক্ষ মদদে হুমায়ুন আজাদের উপর আক্রমণ করা হলেও তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া সহজ দৃষ্টিতে দেখার কোন সুযোগ নেই। এখানে রাজনৈতিক কোন ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে বা আপস করা হয়েছে- এমন বললে সম্ভবত ভুল হবে না। এ কথা বলার কারণ হচ্ছে, রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধপরাধ প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও তাকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয় নি।

কয়েক বছর আগে হাফিজ মাহমুদ ও সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিনকে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নেয় জঙ্গিরা। কিন্তু এই জঙ্গিরা কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত তা এখন আর কেউ বলে না। যারা প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, তারা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিল।

আসামিরা হলেন- নিষিদ্ধ ঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদিন বাঙলাদেশের (জেএমবি) ৪ সদস্য সালেহীন ওরফে সালাহউদ্দিন, আনোয়ারুল আলম ওরফে আনোয়ার, মিজানুর রহমান ওরফে মিনহাজ ও নুর মোহাম্মদ। এর মধ্যে সালেহীন ও নূর পলাতক এবং বাকি ২ জন কারাগারে আছেন। বাঙলাদেশ পুলিশ কতটা ব্যর্থ হলে ১৮ বছরেও আসামী ধরতে সক্ষম হয় না! আসলেই কি সক্ষম হয় না নাকি সক্ষম হতে দেওয়া হয় না- এটা প্রশ্ন করা যেতে পারে!
২০০৪ সালের ২৫ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদী জাতীয় সংসদে হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসটিকে ইসলাম বিরোধী আখ্যায়িত করে বক্তব্য দেন। তিনি বিভিন্ন সমাবেশেও টার্গেট করে বইটি নিয়ে বিষোদগার করেন। জনগণকে বিভ্রান্ত করেন। হুমায়ুন আজাদ নিজেই সাঈদীকে হামলার জন্য দায়ী করেছিলেন। ভিকটিম তো বলেই গেছেন সাঈদী এ ঘটনার সাথে জড়িত। কিন্তু তাকে তো আসামি করা হয়নি। সেই সময়ের ওয়াজ মাহফিল ও রাজনৈতিক সভার ভিডিও ফুটেজ দেখলেই প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হুমায়ুন আজাদকে হত্যার জন্য ধর্মান্ধগোষ্ঠীকে সাঈদী উস্কানি দিয়েছিলেন, কাউকে হত্যার উস্কানি দিলে তো তার বিরুদ্ধে বাঙলাদেশের আইনে মামলা করা যায়। কিন্তু এখানে হত্যার উসকানি দেওয়ার জন্যও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। তার বিরুদ্ধে হত্যা প্ররোচনার মামলা দাখিল করা হয়নি। অর্থাৎ ভিক্টিমের বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করা হয়।

ইউডি/সুপ্ত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading