জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন নিয়ে ভোগান্তি: শেষ হবে কবে
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৪:৩০
সাম্প্রতিক সময়ে জন্ম ও মৃত্যু সনদ প্রদান প্রক্রিয়া নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে নানা ধরনের ভোগান্তির কথা। এসকল ভোগান্তিতে নাকাল হতে হচ্ছে নাগরিকদের। এ ভোগান্তির শেষ কোথায়? ভোগান্তি নিরসনে কর্মকর্তাদের তৎপর হতে হবে ও প্রযুক্তিগত জটিলতা নিরসন করতে হবে। বিস্তারিত লিখেছেন সাইফুল অনিক।
জন্ম নিবন্ধনের বিষয়টি কীভাবে আরও সহজ করা যায়, মানুষের ভোগান্তি কমানো যায়, সে বিষয়ে সরকার কাজ করছে। এক্ষত্রে কর্মকর্তাদের আরও উদ্যোগী ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। সার্ভার জটিলতা ভোগান্তির অন্যতম কারণ। এক্ষেত্রে সার্ভারসহ নানা প্রযুক্তিগত জটিলতা নিরসন করতে পারলে নিবন্ধনে ভোগান্তি এড়ানো যাবে।
জন্ম নিবন্ধন সনদ নিতে কিংবা নামের বানান সংশোধন করতে নাগরিকদের পদে পদে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। যদিও রেজিস্ট্রার জেনারেল দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে, অনলাইনে যথাযথ তথ্য দিয়ে নতুন নিবন্ধন কিংবা সংশোধন করা যায় সহজেই। বাস্তবে তৃণমূলে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়হীনতায় সেবাগ্রহীতাদের ভোগান্তির অন্ত নেই। অথচ নাগরিকের ১৮টি সেবা পেতে জন্ম নিবন্ধন আর চারটি সেবা পেতে প্রয়োজন মৃত্যু নিবন্ধন। জন্ম নিবন্ধন সংক্রান্ত সমস্যা এখন প্রতিটি পর্যায়ে। ডিজিটাল জন্ম নিবন্ধন এখন অনেকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানান জটিলতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরেও সমাধান মিলছে না অনেকের। এর সঙ্গে কর্তাদের গাফিলতির তথ্য আসছে হরহামেশাই। ভুক্তভোগীরা বলছেন, জন্ম নিবন্ধনের মতো প্রয়োজনীয় একটি বিষয়ে এত জটিলতা রাখা বাস্তব সম্মত নয়। সাধারণ মানুষের জন্য সহজ পদ্ধতি হলে এ ধরনের ভোগান্তি হতো না বলে মনে করছেন তারা।
কোথায় হচ্ছে ভোগান্তি?
২০০৭ সালে ভোটার তালিকা তৈরির কার্যক্রম শুরু হলেও ২০০১-২০০৬ সালে ২৮টি জেলায় ও চারটি সিটি করপোরেশনে জন্ম নিবন্ধনের কাজ শুরু হয়। শুরুর দিকে ভোটার তালিকায় নাম লেখাতে জন্ম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক না করায় বর্তমানে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তখন যাঁরা জন্ম নিবন্ধন করেননি, ভোটার আইডি নম্বর দিয়েই তাঁরা বেশির ভাগ নাগরিক সেবা পাচ্ছেন। কিন্তু সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে এখন চাওয়া হচ্ছে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন সনদ।
সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করাতে আসা ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন বলেন, ‘ছেলের জন্ম নিবন্ধন করতে এক মাস ধরে ঘুরছি। শুরুতে কাউন্সিলরের অফিসে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে বলা হলো জোন অফিসে যেতে। এরপর এখানে আসলাম। এখন বলছে আগে মা-বাবার জন্ম নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু আমাদের তো ভোটার আইডি আছে।’
এনআইডি না জন্ম নিবন্ধন?
সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে বাবা-মায়ের জন্ম নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে। আগে মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়েই সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করা যেত। গত বছর ১ জানুয়ারি থেকে নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় সন্তানের জন্ম নিবন্ধন করাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন মা-বাবা। কারণ নতুন নিয়ম অনুযায়ী সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের আগে মা-বাবাকে জন্ম নিবন্ধন করতে হয়। আর ২০০১ সালের আগে জন্ম নেওয়াদের জন্ম নিবন্ধনে মা-বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর হলেই চলে।
ডিজিট বিড়ম্বনা
২০১০ সাল থেকে অনলাইনে জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়। অনলাইনে এন্ট্রির সময় সনদ নম্বরের প্রথমে জন্ম সালের চার অঙ্ক ব্যবহার শুরু হয়। এতে নিবন্ধন নম্বর দাঁড়ায় ১৭ ডিজিটবিশিষ্ট। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ২০১৭ সালেও কিছু অনলাইন নিবন্ধনকৃত সনদে জন্ম সালের শেষ দুই অঙ্ক ব্যবহার করে ১৫ ডিজিটের সনদ প্রদান করা হয়েছে। কোনো সনদে ১৭ ডিজিট আবার কোনো সনদে ১৫ ডিজিট। বর্তমানে ১৭ ডিজিটের নিবন্ধন নম্বর চাওয়া হচ্ছে। ১৫ ডিজিটের নিবন্ধন নম্বর ১৭ ডিজিট করতে গিয়ে নতুন সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ১৫ ডিজিটের সনদ নম্বরের প্রথমে জন্ম সালের চার অঙ্কের প্রথম দুই অঙ্ক (যেমন, জন্ম সাল ১৯৮৪-এর ১৯) বসালে সনদ নম্বরের শেষের ছয় ডিজিট পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ পুরোনো সনদ নম্বর আর ঠিক থাকে না। কারও কারও জাতীয় পরিচয়পত্র প্রথমে ১৩ ডিজিটের ছিল, পরে ১৭ ডিজিট করা হয় জন্ম সালের চার অঙ্ক ১৩ ডিজিটের সামনে বসিয়ে। কিন্তু নম্বরের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পূর্বে যারা বিভিন্ন কাজে ১৫ ডিজিটের জন্মসনদ ব্যবহার করেছেন; বর্তমানে ১৭ ডিজিটের সনদ ব্যবহার করলে ঝামেলায় যে পড়বেন, তা সহজেই অনুমেয়।

বিষয়টি এখন ‘বার্নিং ইস্যু’
জন্ম নিবন্ধনের সময় সাধারণ ভুলের কারণেও মানুষকে যে অনেক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, সে কথা স্বীকার করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম। সম্প্রতি সচিবালয়ে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, “হয়ত কেউ একটি চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু সেখানে যোগ দিতে পারছেন না ওই ভুলের জন্য। হয়ত এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন তাকে ঘুরতে হচ্ছে। এদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।”
জন্ম নিবন্ধন বা সনদের সংশোধনের সময় কেউ হয়রানির শিকার হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। জন্মনিবন্ধন কার্যক্রম গতিশীল করার লক্ষ্যে আয়োজিত এ মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বলেন, “আমি যদি তাকে (জন্মনিবন্ধনকারী) হয়রানি থেকে মুক্তি দিতে পারি, তাহলে তো সে তার নিজের কাজে ঠিকভাবে মনোনিবেশ করতে পারে। বিষয়টি এখন ‘বার্নিং ইস্যু’।
সংশোধনীতেও আছে ভোগান্তি
জন্ম নিবন্ধনের সময় নাম, ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম, জন্ম তারিখ, লিঙ্গ সংক্রান্ত ভুল, বাংলা থেকে ইংরেজি করা বা ইংরেজি থেকে বাংলা করাতে গিয়ে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে বেশি। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সারাদেশে জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের ১ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার ৬০৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালেই আবেদন হয়েছে ৭৫ লাখ ৬৩ হাজার ৯২৩টি।
অভিযোগ আছে হয়রানিরও
বর্তমানে জন্ম নিবন্ধন ও মৃত্যু সনদের ওপর বেশ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সাধারণত বিয়ে, পাসপোর্ট, স্কুলে ভর্তিসহ নানা কাজে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রয়োজন হয়। এখন সন্তানদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও জন্ম নিবন্ধনের প্রয়োজন পড়ছে। যাদের জন্ম ২০০১ সালের পর তাদের জন্ম নিবন্ধনের জন্য বাবা-মায়ের জন্ম সনদ বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই জন্ম নিবন্ধন করতে বেশ হয়রানি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। সরকারিভাবে নির্দিষ্ট ফি বেঁধে দেওয়া হলেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হচ্ছে। নিবন্ধন করতে ৫০ থেকে ১০০ টাকার কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে ৩০০-৪০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন অজুহাতে। শুধু তাই নয়, নিবন্ধন করতে একাধিকবার যাওয়া লাগছে কাউন্সিলরের কার্যালয় বা ইউনিয়ন পরিষদে।

মৃত্যু নিবন্ধনের হাল অবস্থা
সঠিক সময়ের মধ্যে মৃত্যু নিবন্ধন করা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু সেটি করতে হবে মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে এবং মৃত্যু নিবন্ধন ওই পরিবারের বিভিন্ন কাজে যেমন দরকার তেমনি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধন সম্পর্কে বেশ সরকারি প্রচারণা থাকলেও মৃত্যু নিবন্ধন উৎসাহিত করতে তেমন কোন কার্যক্রম দেখা যায় না। এক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের ন্যায় মৃত্যু নিবন্ধনেও খানিক ভোগান্তি রয়েছে। মৃত্যু নিবন্ধনে মৃত ব্যক্তির ১৮ বছর পূর্ণ হলেই লাগবে জন্ম সনদ ও জাতীয় পরিচয় পত্র। অনেক ক্ষত্রে বয়স্ক নাগরিকের জাতীয় পরিচয় পত্র থাকলেও থাকছে না জন্ম সনদ। কারণ তার জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির সময়ে জন্ম সনদ বাঞ্ছনীয় ছিল না। এক্ষত্রে বর্তমান নিয়মাবলি মারপ্যাঁচে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পরিবারকে।
ভোগান্তি রোধে করণীয়
সৃষ্ট জটিলতা সহসাই সমাধান করা সম্ভব নয়। সমাধানে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। তবে জন্ম নিবন্ধন ও এর সনদ পাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সব দুর্ভোগ ও ভোগান্তির অবসান ঘটুক সেটা আমাদের দাবি। সেবা দিতে হবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন করতে যদি কারিগরি সমস্যা দেখা দেয় তা দূর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বর্তমানে প্রায় সব বাচ্চার জন্ম হয় হাসপাতালে। সেখান থেকে একটি সার্টিফিকেটও দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকেই সরকারি জন্ম সনদের ব্যবস্থা করে দিলে ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব। এছাড়া হাসপাতালের সার্টিফিকেট থেকে তথ্য দিয়ে অনলাইন আবেদনের মাধ্যমে জন্ম সনদ প্রদান করলেও জন ভোগান্তি কমতে পারে। বর্তমান সময়ে ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় কাজ সুন্দরভাবে চাইলেই সম্ভব।
নাগরিকদের আরও সচেতন হতে হবে। সকলেই সরকারি নির্দেশ মোতাবেক সকল সরকারি দলিল বা পরিচয় পত্র পুঙ্খানু পুঙ্খ ভাবে সঠিক তথ্য দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। সন্তানের নিবন্ধন তৈরির আগে নিজেদের ও আরও বয়জোষ্ঠদের জন্ম নিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয় পত্র ক্ষেত্র বিশেষে মৃত্যু সনদ তৈরি করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে কোন রকম জটিলতা সৃষ্টি না হয়। নিজেদের সকল কাগজ ও দলিল সঠিক থাকলে ভোগান্তি কমে আসবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। নাগরিকদের দেয়া সঠিক তথ্য সংরক্ষণের সময় যেন কোন ভুল না হল সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে ও কাজে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সবার দায়িত্বশীলতায় ভোগান্তি কমে আসবে ০-১০ এর কোঠায়।
ইউডি/অনিক

