দেশকে নতুন পথের সন্ধান দেবে সমুদ্র অর্থনীতি

দেশকে নতুন পথের সন্ধান দেবে সমুদ্র অর্থনীতি

খালেদুর রহমান । মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২৫

বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। চলেছে তো বুঝলাম। কিন্তু কোন দিকে? জবাব খুঁজতে দেশের ভেতরে একটু তাকাতে হবে। পরিসংখ্যান ঘাঁটতে হবে। সর্বোপরি বিদেশিদের পর্যবেক্ষণ কী তাও যুক্ত করে যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে ফলাফলে আসতে হবে। দেশটির বয়স এখন ধাপে ধাপে এগিয়ে এসে অর্ধশত বছরকে স্পর্শ করেছে। রাষ্ট্রের জন্য বয়সটা খুব একটা বেশি না হলেও ব্যক্তি নাগরিকপর্যায়ে কম নয়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে উঠে আসা নাগরিক সমাজ অনেক কিছুই অবলোকন করেছে। জেনেছে-বুঝেছে এবং পরিপক্ব হয়েছে। এই পরিপক্বতাই নিয়ে এসেছে আজকের বাস্তবতায়।

এ দেশ আজ আর তলাবিহীন ঝুড়ির পর্যায়ে নেই। ঝুড়ির বদলে দেশ আজ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। উন্নয়নের স্রোতোধারায় বাংলাদেশ আজ বিশ্বদরবারে একটি রোল মডেল। অনেককেই যা অনুসরণ-অনুকরণ করে এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে দেশের নজরকাড়া অর্জন কমবেশি প্রায় সব খাতেই। এবার লক্ষ্য সমুদ্রে।

প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে। এইচবিএসসির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত হবে। ওয়ার্লড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, ২০২০-এ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলো থেকে এগিয়ে থাকবে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার বিরোধ-মীমংসার ফলে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খুলে গেছে সমুদ্র অর্থনীতির সিংহ দরজা।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু সামুদ্রিক মাছ ও শৈবাল রপ্তানি করেই বছরে আয় হতে পারে এক বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ। ফলে এই সম্পদ কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব এবং সরকার সে পথেই পা বাড়ানোর কথা ভাবছে। বিশ্বব্যাংকের প্রাক্কলন (২০১৮) অনুযায়ী আমাদের সমুদ্র দেশের অর্থনীতিতে মোট মূল্য সংযোজনে ৬.২ বিলিয়ন ডলার বা জিডিপিতে ৩ শতাংশ অবদান রাখছে। এ অর্থনীতি মূলত পর্যটন ও বিনোদন (২৫ শতাংশ), মৎস্য আহরণ ও অ্যাকুয়াকালচার (২২ শতাংশ), পরিবহন (২২ শতাংশ) এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন ( ১৯ শতাংশ) নিয়ে গঠিত। মৎস্য আহরণ ও অ্যাকুয়াকালচারে পূর্ণ ও খণ্ডকালীন মিলিয়ে ১৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান রয়েছে।

টেকসই উন্নয়নে সমুদ্রসম্পদ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বাংলাদেশের অংশে অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখার কাজ শুরু করেছে। দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ১৯টি মন্ত্রণালয়ের ওপর। তথ্য মতে, একটি সমৃদ্ধিশালী এবং টেকসই নীল (সমুদ্র) অর্থনীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, মৎস্য চাষ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মানবসম্পদ, ট্রান্সশিপমেন্ট, পর্যটন ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতকে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, বিপুল পরিমাণ মালামাল-শুল্ক দেশের অভ্যন্তরে রাখার উদ্দেশ্যে স্থানীয় শিপিং কোম্পানিগুলোকে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা বিদ্যমান জাহাজের সঙ্গে আরো কিছু জাহাজ সংযুক্ত করতে পারে।

এদিকে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শামুক, শেলফিস, কাঁকড়া, হাঙর, অক্টোপাস এবং অন্য প্রাণী ছাড়াও শুধু মাছ প্রজাতির সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। ধারণা মতে, প্রতি বছর মোট আট মিলিয়ন টন মাছের মজুদ থেকে আহরণ করা হয় মাত্র দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন মাছ। অনেকের মতে, সমুদ্রে যদি আমাদের চাষাবাদ ইতিবাচক করা যায় তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে এশিয়ায় সেরা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এখানেই শেষ নয়, সমুদ্রকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। এর বিশালতার কাছে বারবার পরাস্ত হয়েছে মানুষ। তবু মানুষের জানার আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। নেই বলেই বিজ্ঞানকে সঙ্গে নিয়ে হৃৎপিণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা। চেষ্টাতেই সফলতা। এই বিশ্বাসে স্থির থেকে বাংলাদেশও ডুবসাঁতারে ধরতে চলেছে নীল অর্থনীতিতে। সম্ভবত সেই নীল অর্থনীতিই বাংলাদেশকে নতুন পথের সন্ধান দেবে এটাই প্রত্যাশা।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading