সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে হবে
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:২০
আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিয়ে নানা সংশয়ের প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য আস্থার সঙ্কট কাটাতে ইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। সেই সঙ্গে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতেও নির্বাচন আয়োজনকারী সাংবিধানিক সংস্থাটিকে তাগিদ দিয়েছেন তারা। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে কাউকে জোর করা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষে সম্ভব নয়। বিস্তারিত লিখেছেন মিলন গাজী
শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক ও মুদ্রিত সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের সঙ্গে তিন দফা সংলাপের পর সোমবার (১৮ এপ্রিল) ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে নির্বাচন ভবনে এই সংলাপে ৩৯ জন সম্পাদক ও সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে সংলাপে উপস্থিত ছিলেন ২৭ জন। চার নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা এমিলি, মো. আলমগীর ও আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন সংলাপে।
সকল দলের উপস্থিতি নিশ্চিত ও আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠার পরামর্শ: আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচনে সকল দলের উপস্থিতি নিশ্চিত করা। এছাড়াও আগামী নির্বাচন নিয়ে যে আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে তা কাটিয়ে উঠারও পরামর্শ দিয়েছেন আমন্ত্রিত সাংবাদিকরা। তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ইভিএম ত্রুটি নিয়েও ইসির সঙ্গে আলোচনা করেন। তারা একটি বিশ্বাসযোগ্য, অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নতুন ইসির প্রতি জনগণের বিশ্বাসস্থাপনের তাগিদ দেন।
নির্বাচনে অংশ নিতে কাউকে জোর করা সম্ভব নয়: নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে কাউকে জোর করা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ এবং তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টাই ইসির আগামীর লক্ষ্য উল্লেখ করে সিইসি বলেন, কে নির্বাচনে অংশ নেবে, কে নেবে না; সেটা ফোর্স করা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। তবে ইসির দায়িত্ব আহ্বান করা যে, আপনারা আসেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। নির্বাচনে অংশ না নিলে কিন্তু গণতন্ত্র বিকশিত হবে না।

নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে: প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, অনেক বিধান আমাদের অনুকূলে থাকলেও তা প্রয়োগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও হস্তক্ষেপ মুক্ত রাখতে যা যা করতে হয়, তা তা করতে হবে। আমাদের আইনে পর্যাপ্ত বিধান আছে। নির্বাচন সম্পর্কিত তেমন অনিয়মের তথ্য এলে আমাদের দায়িত্ব হবে সেই নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া; এটা আমাদের দায়িত্বের অংশ। সংলাপ শেষে সিইসি আরও বলেন, সকলকে চেষ্টা করতে হবে একটা সুন্দর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য। আমরা অর্থহীন সংলাপ করছি না। তিনি বলেন, সংলাপে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) নিয়ে কথা এসে। আমরা ইতিমধ্যে এ নিয়ে কয়েকটি মিটিং করেছি। যেহেতু বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, অনেকে পক্ষে বলেছেন। ইভিএমের যে সুবিধাটা সেখানে পেশিশক্তির ব্যবহার হ্রাস করতে পারে, যেখানে সিল দিয়ে ব্যালট বাক্স পূরণ করা যায় না। কাজেই ইভিএমের ভালো দিক আছে। আমরা ইভিএম নিয়ে স্টাডি করছি, যেটা জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছেন। নির্বাচনে কেউ আসলো কি আসলো না, কেউ কেউ বলেছেন- এটা আমাদের দায়িত্ব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আপনারা বলেছেন, নির্বাচনে পক্ষ-প্রতিপক্ষ মাঠে থেকে ব্যালেন্স তৈরি করে। দলগুলো যদি তাদের লোকবল দিয়েই ভারসাম্য করতে পারে… নির্বাচনে যদি দু’টো পক্ষ থাকে, তবে দু’টো পক্ষকে খেলতে হবে, তাহলে নির্বাচনটা ওইদিক থেকে সহজ হয়।
স্বচ্ছতা খুব গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভেতরে ক্যামেরা নিয়ে যদি আপনরাদের দেখাতে পারি, কেন্দ্রের ভেতরে যদি ক্যামেরা থাকে, বাইরে যদি মনিটরে দেখা যায়, এগুলো নিয়ে কথা হয়েছে। এগুলো নিয়ে আমার সহকর্মীরাও বিশ্বাস করেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের বিচরণ যদি থাকে, তারাও রিপোর্ট করতে পারবেন। একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য এই সমস্ত বিষয়ের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি। আমাদের সাধারণভাবে ওপেন হতে হবে, তথ্য দিতে হবে বলে মনে করি।
সৎভাবে দায়িত্ব পালনের স্প্রিহা, চেষ্টা আছে, থাকবে: কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমাদের সৎভাবে দায়িত্ব পালনের স্প্রিহা, চেষ্টা আছে, থাকবে। ব্যাপক অনিয়মের তথ্য আমাদের কাছে আসলে, সাহস নয়, আমাদের দায়িত্ব হয়ে যাবে যে, যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করা। অনেক সময় কারচুপি হয়, সেটা রোধ করতে হবে। আমরা আমাদের সামর্থ, দক্ষতা বৃদ্ধির চেষ্টা করবো। দেশটা সকলের… আপনারাও আমাদের সহায়তা করবেন। নিজের পেশাগত জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সাবেক সচিব হাবিবুল আউয়াল বলেন, আমরা জবাবদিহিতায় মিডিয়াকে বেশি ভয় পাই। কী সব লিখে আপনার আমার জীবনটাকে বিপর্যস্ত করে ফেলেন, কে জানে। কিছুটা ভীতি তো রয়েছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে কমিশনের দায়িত্ব ও সাহসের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন সিইসি। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য থাকে ইলেকশনটা ফ্রি ফ্রম হস্তক্ষেপ। এটা যেন হয় সেদিক্ষে লক্ষ্য রাখতে হবে। সেটা নিশ্চিত করতে যা যা করণীয়, আমাদের করতে হবে।
সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাস স্থাপন করাই প্রথম কাজ: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, বিশ্বাসযোগ্যতার একটা সঙ্কট রয়েছে। সেটা যদি কাটিয়ে উঠতে পারেন, তাহলে সেটা হবে আপনাদের বড় সাফল্য। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের আপনাদের বিশ্বাস করতে হবে, গণমাধ্যমের আপনাদের বিশ্বাস করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আপনাদের উপর আস্থা রাখতে হবে। তাহলে সবাই নির্বাচনে আসবে। পেশাজীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর নির্বাচন কমিশনে দায়িত্ব নেওয়া ব্যক্তিদের সফলতা প্রত্যাশা করেন তৌফিক খালিদী। তিনি বলেন, এটাই আপনাদের জীবনের শেষ অ্যাসাইনমেন্ট। সেটা মনে রেখে আপনারা অনেক ভালো কাজ করবেন।”
বিএফইউজের সাবেক সভাপতি ও সিটিজেন টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এখানে দুটো বিষয় করতে হবে। একটা হল আস্থার সঙ্কট, আরেকটা ইভিএমের ত্রুটি। এগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। বাংলা ট্রিবিউনের হেড অব নিউজ মাসুদ কামাল আস্থার সঙ্কটকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, সাধারণ মানুষ নির্বাচন কমিশনের কথা বিশ্বাস করে না। এ বিশ্বাসের পরিমাণ গত দুটো নির্বাচনে শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে। সাধারণ মানুষের কাছে আপনাদের গ্রহণযোগ্যতা আছে কি না, আস্থা অর্জন করতে পারলেন কি না, জানতে জানতে আগের দুটো নির্বাচন মূল্যায়ন করেন।

নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ইসির বিষয় নয়: মাছরাঙা টিভির হেড অব নিউজ রেজোয়ানুল হক রাজা বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়টি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ইসির বিষয় নয়। তবে রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনে আনার ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা থাকতে হবে। তিনি মনে করেন, ইভিএমের ‘পেপার ট্রেইল’ চালু করলে অর্ধেক সমালোচনা কমে যাবে। দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে ইসি আস্থার সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ইনডিপেনডেন্ট টিভির চিফ নিউজ এডিটর আশিস সৈকত বলেন, নির্বাচনের কমিশনের দৃঢ়তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানে ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে আপনাদের, সরকারে কে থাকলো সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সময় টিভির হেড অব নিউজ মুজতবা দানিশ বলেন, বড় দলগুলোর অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যদি ভালো নির্বাচন করতে হয় দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা বসতে হবে। তাদের গুডবুকে না নিতে পারলে কাজ উঠবে না। এটিএন বাংলার প্রধান নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন বলেন, ইসি চায় নির্বাচনে সকলের অংশগ্রহণ থাকুক। আমি আশা করি, আপনারা চেষ্টা করবেন যেন বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করতে পারে- এরকম একটা আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা। ইসি যেন সিইসিকেন্দ্রিক হয়ে না উঠে, সে দিকে দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
অধিকাংশ আলোচক সব দলকে আনার উপর গুরুত্ব দিলেও রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, দলকে আহ্বান করার দায়িত্ব ইসিরও না, সরকারেরও না। জামাই আদর করে নির্বাচনে ডেকে আনতে হবে না। কমিশনের দায়িত্ব নির্বাচন করা।

আলোচনায় আরও অংশ নেন টেলিভিশনগুলোর মধ্যে ডিবিসি নিউজের প্রধান সম্পাদক ও সিইও মঞ্জুরুল ইসলাম, একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, গ্লোবাল টিভির এডিটর ইন চিফ সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, আরটিভির সিইও সৈয়দ আশিক রহমান, যমুনা টিভির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ, নিউজ ২৪ এর নির্বাহী সম্পাদক রাহুল রাহা, স্পাইস টিভির এডিটোরিয়াল হেড তুষার আব্দুল্লাহ, একুশে টিভির হেড অব নিউজ রাশেদ চৌধুরী, চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, এনটিভির বার্তা প্রধান জহিরুল আলম, চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন, নাগরিক টিভির হেড অব নিউজ দীপ আজাদ, এশিয়ান টিভির হেড অব নিউজ মানস ঘোষ, বাংলাভিশনের প্রধান সম্পাদক ও হেড অব নিউজ আবদুল হাই সিদ্দিক, দেশ টিভির চিফ নিউজ এডিটর বোরহানুল হক সম্রাট, মাইটিভির হেড অব নিউজ শেখ নাজমুল হক সৈকত, মোহনা টিভির হেড অব নিউজ মুহা. আহসান উদ-দৌলা মারুফ, জাগো নিউজের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক।
প্রসঙ্গত, বর্তমান নির্বাচন কমিশন গত ১৩ মার্চ প্রথম দফায় ৩০ শিক্ষাবিদকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাতে সাড়া দিয়ে ১৫ জন উপস্থিত হয়েছিলেন।দ্বিতীয় দফার সংলাপে ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ জানালে সংলাপে অংশ নেন ১৯ জন। আর তৃতীয় দফা সংলাপে আমন্ত্রিত ৩৪ জন সাংবাদিকের মধ্যে ২৩ জন ইসির বৈঠকে অংশ নেন।
ইউডি/সুপ্ত

