মাদাম কুরী: জোড়া নোবেল জয়ী সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১২:৪০
মাদাম কুরী একবার নয়, দু’বার বিজ্ঞান গবেষণায় অনন্য সাধারণ কৃতিত্বের স্বীকৃতি স্বরূপ নোবেল পুরস্কারে ধন্য হয়েছিলেন। বিশ্বের কোনো নারীর ভাগ্যে এমনটি আর ঘটেনি। এমন কি দু’বার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন একই ক্ষেত্রে, এমন নজির বিশ্বে বিরল। এ জন্যে তাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বলা হয়ে থাকে। প্রাতঃস্মরণীয়া বিজ্ঞানী মাদাম কুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম
জীবনের শুরুতে দুঃখ দারিদ্র্য আর প্রিয় ব্যক্তিকে কাছে পাওয়ার মর্মবেদনায় যিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, এ ই ঘৃণিত পৃথিবী থেকে বিদায় নিলে ক্ষতি খুব সামান্যই হবে। সেই অভিমানী তরুণীটিই নিজের প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে হয়েছিলেন জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী এবং বিশ্বের সর্বকালের সেরা মানুষদের একজন।
মাদাম কুরী কে ছিলেন?
মাদাম কুরী ছিলেন প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী যিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এই পোলীয় ও ফরাসি বিজ্ঞানী ১৯০৩ সালে তেজস্ক্রিয়তার উপর গবেষণার জন্য তার স্বামী পিয়ের ক্যুরি এবং তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কারক অঁরি বেকেরেলের সাথে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান।
মাদাম কুরী ছিলেন প্রথম মহিলা বিজ্ঞানী যিনি বিজ্ঞানের দুইটি ভিন্ন শাখায় দুইবার নোবেল পুরস্কার জেতেন। মাদাম কুরী প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়েরও প্রথম মহিলা অধ্যাপক ছিলেন এবং তিনই ছিলেন প্রথম মহিলা, যার অসামান্য মেধার কারণে ১৯৯৫ সালে প্যান্থিয়নে সমাহিত করা হয়।
মাদাম কুরীর জন্ম ও শৈশব
এই প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানী, সর্বকালের সেরা নারী মাদাম কুরী ১৮৬৭ সালের ৭ই নভেম্বর পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ভাদিশ্লাভ স্কেলাডোভস্কি ছিলেন একজন শিক্ষক। মাও ছিলেন স্থানীয় একটি গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা এবং পরিচালিকা। মাদাম কুরীর আসল নাম ম্যেরী কুরী। ম্যেরী কুরীর যখন দশ বছর বয়স, তখন তার মা যক্ষারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মেয়েও যক্ষায় আক্রান্ত হতে পারে, এই ভয়ে তার বাবা তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
গ্রামের বাড়িতে এক বছর থাকার পর ম্যেরী কুরী আবার ওয়ারশয় ফিরে এলেন। ইতিমধ্যে তিনি স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় স্বর্ণপদক পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার পরিবারের সবাই খুব মেধাবী ছিলেন।
কর্মজীবন ও প্রথম প্রেম
আর্থিক অবস্থা তাদের খুব খারাপ ছিলো বলে ম্যেরী কুরী প্রথমে এক রাশিয়ানের বাসায় গভর্নেসের চাকরি নেন। কিন্তু রাশিয়ান গৃহকত্রী বদমেজাজী হওয়ায় ১৮৬৬ সালে আর এক বাড়িতে তিনি চাকরি নেন। এখানেই গৃহকর্তার ছেলের সাথে তার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিন্তু ছেলের মা একজন গভর্নেসের সাথে ছেলের বিয়ে দিতে রাজী না হওয়ায় মেরী মানসিকভাবে দারুণ আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং গোটা জীবন সম্পর্কে নেমে আসে গভীর হতাশা। এই সময়ের এক চিঠিতে তিনি তাই লিখেছেন। ‘এই ঘৃণিত পৃথিবী থেকে আমি বিদায় নিতে চাই। এতে ক্ষতি হবে খুব সামান্যই।
মাদাম কুরীর শিক্ষাজীবন
এরপর মেরী প্যারিসের সারবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানে ভর্তি হন। বড় বোন ব্রোনিয়ার উপর ভরসা করে তার জীবনে পরিপূর্ণ করে গড়ে তোলার জন্য একটা নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌছে দেওয়ার জন্যে নামলেন একান্ত সাধনায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান গবেষণাগারে নির্জনতায় কাটাতে লাগলেন দিনের পর দিন। অর্থাভাবে এ সময় তাকে আধপেটা রুটি মাখন খেয়ে কাটাতে হতো। তবু তিনি ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম স্থান অধিকার করে এম.এসসি. পাস করেন। পরের বছর একই ডিগ্রীতে তিনি ২য় স্থান অধিকার করেন।
বিবাহ জীবন
মাদাম কুরী প্যারিস সফররত তার পূর্বপরিচিত পোলিশ অধ্যাপক কোভ্যলস্কির মাধ্যমে ফরাসি তরুণ বিজ্ঞানী পিয়েরী কুরীর সঙ্গে পরিচিত হন। মেরীর সাথে প্রথম আলাপেই পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞানের প্রতিভাবান বিজ্ঞানী পিয়েরী কুরী মুগ্ধ হয়ে যান। তারা দু’জনে অধ্যাপক শুৎজেন বাজারের গবেষণাগারে গবেষণা করার অনুমোদন পান। ক্রমে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তারা এক সময় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
আবিষ্কার ও পুরস্কার
এই বিজ্ঞানী দম্পতি একটানা দু’বছর গবেষণার পর যৌগিক উপাদান বিসমার্ক আবিষ্কার করেন। আর বিসমার্ককে আরো শোধন করতে গিয়ে ১৮৯৬ সালে আবিষ্কার করেন পোলোনিয়াম। আরো গবেষণা করে তারা এক অত্যাশ্চর্য পদার্থ আবিষ্কার করলেন, নাম রাখলেন রেডিয়াম। এই রেডিয়াম সত্যি এক অদ্ভুত উপাদান। যা ইউরেনিয়াম থেকে ১০ লাখ গুণ তেজস্ক্রিয়তাসম্পন্ন।
এই অত্যাশ্চর্য আবিষ্কারের জন্য লন্ডনের রয়াল সোসাইটি কুরী দম্পতিকে ১৯০৩ সালে ডেভি পদকে ভূষিত করে। এই ১৯০৩ সালেই মাদাম কুরী বিজ্ঞানী হেনরি বেকোয়েরেলের সাথে যুগ্মভাবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
পুনরায় নোবেল প্রাপ্তি
১৯০৬ সালে স্বামী পিয়েরী কুরী এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। স্বামীর অকাল প্রয়াণে মাদাম কুরীর হৃদয় ভেঙে যায়। কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার অব্যাহত থাকে। তিনি ১৯১০ সালে একক প্রচেষ্টায় বিশুদ্ধ অবস্থায় রেডিয়ামকে পৃথক করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এই কৃতিত্বের জন্য তিনি এককভাবে দ্বিতীয়বারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করে অনন্য সাধারণ কৃতিত্ব দেখান।
মাদাম কুরীর মৃত্যু
স্বামীর শোক এবং দীর্ঘদিনের একটানা পরিশ্রমে মাদাম কুরীর শরীর ভেঙে পড়ে। ১৯৩৪ সালের মে মাসে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এর দু’মাস পরেই জুলাই মাসে ৬৭ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। জানা যায়, রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তাই তার অকাল মৃত্যুর কারণ ছিলো। বিশ্বের বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীর নাম চিরস্মরণীয় শুধু তাই নয়, প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইউডি/অনিক

