বিদেশিদের কাছে ধরনার রাজনীতি: এই দেউলিয়াপনা আর কত!
উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ২১ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৫০
‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জার্মানির রাষ্ট্রদূত’, সম্প্রতি বিএনপির প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এমন মন্তব্য করেন। তার মন্তব্যকে মিথ্যা বলে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্রোস্টার। বিশ্লেষকরা বলছেন, কূটনৈতিক মহলকে ঘিরে বিএনপি’র মিথ্যাচার দলটির রাজনীতির দেউলিয়াপনার বহিঃপ্রকাশ। বিস্তারিত লিখেছেন সাদাত কবির
দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে বিএনপি একের পর এক নেতিবাচক মন্তব্য করে আসছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার শুরু থেকেই। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন নিয়েও বিএনপি গণমাধ্যমগুলোতে নিজেদের অভিমত প্রকাশ করে থাকে। সম্প্রতি বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় ক’জন নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্রোস্টারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ শেষে তাদের গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যকে এবার মিথ্যাচার বলে অসন্তুষ্টি জানিয়েছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত। দেশের শীর্ষ একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে একজন রাষ্ট্রদূতের এমন অভিযোগ দেশের ভাবমূর্তিতে কতটা প্রভাব ফেলছে তা বলাই বাহুল্য। গণমাধ্যমে দেয়া বিএনপি’র এমন মিথ্যাচার বক্তব্য তাদের রাজনৈতিক কার্যকলাপকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা এমন মিথ্যাচার বর্হিবিশ্বে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে প্রশ্নের উদয় ঘটাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু বিএনপিই নয়, কোনো রাজনৈতিক দলেরই বিদেশিদের কাছে ধরনা দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষণ্ন হয়। এছাড়াও ওই রাজনৈতিক দলটি জনগনের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
বিএনপির মিথ্যাচার নিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূতের অসন্তোষ:: বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্রোস্টার মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র সম্পর্কে তাকে উদ্ধৃত করে বিএনপির মন্তব্যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছেন যে, ওই দলের কথা ‘সত্য নয়’। বুধবার (২০ এপ্রিল) জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ-ডিক্যাব আয়োজিত অনুষ্ঠানে জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বিএনপি’র মন্তব্যে আমি অখুশি।’ তিনি বলেন, আমি (পত্রিকায়) পড়েছি… (বিএনপি) উদ্ধৃতি দিয়েছে যে, আমি দেশের (বাংলাদেশ) মানবাধিকার পরিস্থিতি ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি, কিন্তু এটি সত্য নয়। আমি সরাসরি আপনার সাথে কথা বলছি। আপনি আমাকে উদ্ধৃত করতে পারেন। কিন্তু আমাকে কেন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে উদ্ধৃত করা হবে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তার বৈঠককে সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, বিএনপি কেন গত সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি তা তিনি জানতে চেয়েছেন। গত ১৭ মার্চ জার্মান রাষ্ট্রদূত রাজধানীতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তার দলের আমন্ত্রণে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বৈঠক শেষে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন যে, জার্মান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে বিএনপি’র সেদিনের প্রেস ব্রিফিংয়ে উদ্ধৃত শব্দাবলীর বিষয়ে ট্রোয়েস্টার বলেন, বিএনপি নেতা সেদিন তাকে উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমকে যে কথাগুলি বলেছিলেন তাতে তিনি অসন্তুষ্ট। প্রসঙ্গত, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে গত ১৭ মার্চ বৈঠক করেন রাষ্ট্রদূত ট্রোস্টার। প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামা ওবায়েদ। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, তাদের আলোচনায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন, মানবাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় উঠেছে। বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের বিষয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূত কী বলেছেন, এমন প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সম্বন্ধে বিশ্বব্যাপী সবাই অবগত আছে। এখানে নতুন করে বলার কিছু নেই। এগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনাও হচ্ছে এটা তো আপনারা জানেন। এসব ব্যাপারে ওনারা কনসার্ন। বাংলাদেশের বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আলোচনা হচ্ছে, ওনারা তো তার একটা অংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, আমেরিকা বলছে, ব্রিটেন বলেছে, সবাই বলছে।

ওই আলোচনার বিষয়বস্তু ছিলো দ্বিপাক্ষিক ইস্যু ও দেশের পরিস্থিতি: সেই বৈঠকের এক মাস পর জার্মান রাষ্ট্রদূত বলেন, রাষ্ট্রদূত হিসাবে নতুন এলে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়, ওই দিন তেমন একটি বৈঠক ছিল। ১৬ মার্চ আমীর খসরু মাহমুদের সঙ্গে ওই বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও বিএনপির অনুরোধে একদিন পেছানো হয়। শুধু চৌধুরীর সাথে বৈঠক করার শিডিউল ছিল। তবে, আমাদের স্বাগত জানান চৌধুরী ও মহাসচিব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর)। ওই বৈঠকে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে দ্বিপাক্ষিক ইস্যু ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে ‘বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ’ আলোচনা হওয়ার কথা উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই দেশে কী হচ্ছে, তা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। অবশ্যই মানবাধিকার ইস্যুও তার মধ্যে এসেছে। আমরা সরকারের সাথেও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার মধ্যে আছি। কারণ, বৈশ্বিক মানবাধিকারের বিষয়টি আমাদের পররাষ্ট্রনীতির দর্শনের মধ্যেই আছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয় আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত ট্র্যোস্টার বলেন, আমরা নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তারা ব্যাখ্যা করেছেন, কেন তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকছে, কেন অতীতে নির্বাচনে অংশ নেননি এবং কেন তাদের মনোভাবের পরিবর্তন করেনি। এখন পর্যন্ত (পরবর্তী) নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনীহার বিষয়ও ব্যাখ্যা করেছেন তারা। ডিক্যাব সভাপতি রেজাউল করিম লোটাসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এ কে এম মঈনউদ্দীন স্বাগত বক্তব্য দেন।
আলোচনায় নির্বাচন নিয়ে বিএনপি যা বলেছিলো: ১৭ মার্চের ওই আলোচনার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছিলেন, আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে জার্মানি সে বিষয়ে ‘চোখ রাখছে’। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ওইদিন বিকাল ৩টা থেকে ৪টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত রুদ্ধদ্বার এই বৈঠকে অংশ নেয়। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, নির্বাচন বাদে তো কোনো আলোচনা হতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের বিষয়ে সারা বিশ্ব বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছে। স্বাভাবিক ভাবে ওনারা জানতে চেয়েছেন, আগামী নির্বাচনে বাংলাদেশ কোথায় যাচ্ছে? সকলের চোখ তো বাংলাদেশের দিকে। আগামী নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? তারা চোখ রাখছে, তারাও দেখতে চাচ্ছে আগামী দিনে বাংলাদেশের নির্বাচন কোথায় যায়? সেটা তারা চোখ রাখছে। ওনাদেরও অবজারভেশন আছে। রাষ্ট্রদূতের ভাষ্য নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির বিষয়ে সবাই অবগত আছেন, এখানে অবগত করার কিছু নাই। এখন দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা সবারই জানা আছে।
নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে: সম্প্রতি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি ষড়যন্ত্র করছে। তিনি বলেন, জনগণ শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন ও অর্জনে খুশি তাই তারা আগামী জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকেই বেছে নেবে। তাই বিএনপি এখন থেকেই নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে ষড়যন্ত্র আর মিথ্যাচার করছে। নেতিবাচক ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির জন্য বিএনপিকে আর জনগণ চায় না, এটা বুঝতে পেরেই তারা জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে দাবি করে ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, দেখে শুনে মনে হয় বিএনপির অবস্থা এখন পথহারা পথিকের মতো দিশেহারা, তারা কখন যে কি বলে সেটা তারা নিজেরাও জানে না। আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এমন অভিযোগের ওবায়দুল কাদের বলেন, আসলে আওয়ামী লীগ নয়, জনগণ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিএনপিই এখন জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত প্রশ্নবিদ্ধ: অপরাজনীতি চর্চার কারণে বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যত আজ প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। দেশের অর্থনীতিতে চাঙা ভাব ফিরে আসছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, বিএনপি আন্দোলন ও নির্বাচনে অব্যাহত ব্যর্থতায় এখন চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। দলটির রাজনীতি এখন স্বার্থ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে চক্রাবদ্ধ। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে গিয়ে নেতিবাচক রাজনীতির কারণে তারা সমস্যার আরও গভীরে চলে যাচ্ছে। তারা এদেশে একমাত্র চিহ্নিত রাজনৈতিক অপশক্তি, ক্ষমতালোভী দল।
মিথ্যাচার রাজনীতিকে নোংরা করে: রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনীতির মাঠে কথার লড়াই হবে। এক দলের প্রশ্ন অন্যদল খন্ডন করবে। এটা রাজনৈতিক শিষ্টাচার। কিন্তু মিথ্যাচার কিংবা একটি কথার ভিন্ন অর্থ দিয়ে সেই কথাকে গণমাধ্যমে প্রকাশ করা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে পরে না। আর ভিনদেশীদের কথাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন তো রাষ্ট্রের ভাবমূর্তিতে আঘাত হানার শামিল। তাই এসব থেকে দূরে থেকে রাজনৈতিক আলাপনে থাকুক একে অপরের জন্য শ্রদ্ধাশীল আচরন। দেশের ভাবমূর্তিতে যেন কালি না পড়ে সেদিকটা সকল রাজনৈতিক দলকেই দেখতে হবে। কেননা সবার ঊর্দ্ধে যে দেশ, তার সম্মান ধরে রাখতেই হবে।
ইউডি/সুপ্ত

