নানা উদ্যোগ তৎপরতা সত্ত্বেও বন্ধ হচ্ছে না মানব পাচার
শহীদুজ্জামান সেলিম । শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:৩৫
সরকারের নানা ধরনের উদ্যোগ ও তৎপরতা সত্ত্বেও মানব পাচার কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। দেশের এক শ্রেণির প্রতারকের কাছে নিঃস্ব ও বিপন্ন হয়ে পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষ। তাদের পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে, এমন কি কারো কারো জীবনও চলে যাচ্ছে। বিদেশে তারা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। মধ্যযুগের মানবতাবিরোধী জঘন্য অপকর্ম দাস প্রথার আধুনিক সংস্করণ ‘মানব পাচার’ বর্তমানে সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। একশ্রেণীর সমাজবিরোধী দুর্বৃত্ত অর্থ উপার্জনের সহজ উপায় হিসেবে মানব পাচারকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছে।
দেশে নারী ও শিশু পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে বিভিন্ন আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করাসহ পুলিশ সদর দপ্তরে স্থাপন করা হয়েছে মনিটরিং সেল। স্থল ও বিমান বন্দরগুলোতে নেয়া হয়েছে বিশেষ তল্লাশির ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটিও কাজ করছে। আবার উদ্ধারকৃত নারী ও শিশু পুনর্বাসনের জন্যও নেয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা ও কর্মসূচি। মানব পাচার রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য গণমাধ্যম নিতে পারে বড় ধরনের ভূমিকা। গণমাধ্যমগুলো জনসচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ও সর্তকতা বাণী নিয়মিতভাবে প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারে।
অবৈধপথে মানব পাচার পরিচালনার কাজে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তিশালীচক্র সক্রিয় রয়েছে। মানব পাচার বর্তমানে আন্তঃদেশীয় ও আন্তর্জাতিক লাভজনক বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সাধারণত যশোর, সাতক্ষীরা, বেনাপোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দর্শনা, দিনাজপুর, লালমনিরহাট সীমান্ত ও স্থলবন্দর সীমান্ত এলাকা দিয়ে নারী ও শিশু পাচার হয়ে আসছে। মূলত যশোর, সাতক্ষীরা, লালমনিরহার, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের অরক্ষিত সীমান্ত পয়েন্টসমূহ নারী ও শিশু পাচারের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ সকল সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি হলে নারী ও শিশু পাচার বহুলাংশে কমে আসবে। অপরিচিত ও সন্দেহভাজন লোকজনের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখা, কেউ চাকরি ও বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে তার সত্যতা যাচাই করা এবং শিক্ষক ও অভিভাবগণ তাদের ছাত্রছাত্রী ও সন্তাননদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে পারেন।
অপরাধ দমনে দেশে অনেক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে। তারপরও নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা এখনও কমছে না বরং দিন দিন এর মাত্রা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলেছে। একের পর এক মানব পাচারের যে ঘটনা ঘটে চলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কোনোভাবে তার দায় এড়াতে পারে না। অতীতে আমরা দেখেছি, যখন কোনো অপরাধী চক্র ধরা পড়ে, তখন তাদের নিয়ে কিছুদিন তৎপরতা চলে। তারপর সবাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। মানব পাচার আধুনিক সভ্যতার একটি নিকৃষ্টতম জঘন্য অপরাধ। বিদ্যমান মানব পাচার আইন-২০১২ সঠিক প্রয়োগ, সরকারি ও এনজিওদের সক্রিয় অংশগ্রহণে দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে দেশে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হলে দালালের মাধ্যমে অবৈধপথে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা নিঃসন্দেহে কমে আসবে। পাশাপাশি এ জাতীয় জঘন্য অপরাধ নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বদা তৎপর ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
মানব পাচার বাংলাদেশের অন্যতম শিরঃপীড়ায় পরিণত হয়েছে। জল, স্থল ও আকাশপথে প্রতিদিন মানব পাচার চলছে। মূলত জীবন ও জীবিকার কারণে, দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে, দারিদ্র্যের পীড়নে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। এসব মানুষের বেশির ভাগই প্রতারিত হচ্ছে, হচ্ছে সর্বস্বান্ত। ‘একটা সময় শুধু রোহিঙ্গা পুরুষরা কাজের তাগিদে সাগর পাড়ি দিতেন। এখন কিন্তু নারী ও শিশু পাচার বাড়ছে। অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাওয়ায় বাংলাদেশের অনেক অভিবাসী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছেন। চলাচলে সীমাবদ্ধতা, ঋণের চক্রে পড়া, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নির্যাতন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং দাসত্বের মতো শোষণমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন অভিবাসীরা। দরিদ্র ও প্রান্তিক, নারী ও পুরুষ এবং শিশুরাই মানব পাচারকারীদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন। আমরা মনে করি, মানবপাচার বন্ধ না হলে দেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। কাজেই কোস্টগার্ড, পুলিশ ও বিজিবিসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে সীমান্তের সক্ষমতা বাড়িয়ে, পাচার বন্ধ করতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক- কলামিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

