পরিবেশ-প্রকৃতি ও জীবন রক্ষায় আরও কার্যকরী উদ্যোগ প্রয়োজন
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২২ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৩:৪০
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ। পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে ধরিত্রীকে টিকিয়ে রাখাই দিবসটির একমাত্র লক্ষ্য। পরিবেশ সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রতি বছর ২২ এপ্রিল বিশ্বের ১৯৩টি দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বাসযোগ্য রাখতে জলবায়ু সংকট এবং পরিবেশ দূষণ রোধে সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা করণীয় নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন আসাদুজ্জামান সুপ্ত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে এবং পৃথিবীকে নিরাপদ এবং বাসযোগ্য রাখতে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস পালন করা হয়। মানুষের বিভিন্ন কর্মকাøে পৃথিবী আজ নানা বিপর্যয়ের মুখোমুখি। মানুষ যেমন পৃথিবীর সৌন্দর্য নষ্ট করছে তেমনি নষ্ট করছে তার পরিবেশ। পাল্টে যাচ্ছে জলবায়ু। মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছি এই পৃথিবীবাসী। তাই এখন থেরেকই পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে বিশ্ব ধরিত্রীকে বাসযোগ্য রাখতে সবার সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা। পৃথিবীকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য রাখতে জলবায়ু সংঙ্কট এবং পরিবেশ দূষণ রোধে আমাদের ভূমিকা যে রকম থাকতে হবে সেরকমই প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধানকেও তৎপর হতে হবে। বিশ্ব নেতাদের তাগিদ দিতে হবে। তবেই না আমাদের ধরিত্রী বাঁচবে, বাঁচবে প্রাণ প্রকৃতিও।
শিল্প কারখানা স্থাপনে পরিবেশে রক্ষার কথা ভাবতে অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিটি শিল্প কারখানা ও অন্যান্য সব স্থাপনা নির্মাণের সময় সংশ্লিষ্টদের পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে সরকার প্রধান বলেন, দেশব্যাপী আমরা পরিবেশবান্ধব শিল্পের প্রসার ঘটাচ্ছি। আমাদের পরিবেশ রক্ষা করাটা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আমরা প্রতিটি শিল্প কলকারখানা থেকে শুরু করে যতো প্রতিষ্ঠান আমরা তৈরি করছি, সেখানেই পরিবেশবান্ধব যাতে হয়, তার ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি। এমনকি গার্মেন্ট শিল্পের গ্রিন ইন্ড্রাস্ট্রিজ সারা পৃথিবীতে ১০টার মধ্যে এখন সাতটাই কিন্তু এখন বাংলাদেশে। পরিবেশ-প্রতিবেশের দিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছি।

পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টে ধ্বংসের পথে পৃথিবী
ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে পৃথিবী। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে মাটির ক্ষয়। তাই আগামী দিনে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না। সেচ হয় এমন জমির পরিমাণ বাড়ছে। মাটির ক্ষয় অনেক বেড়ে গেছে। ব্যাপক হারে গাছ কাটাও মাটির ওপরে চাপ তৈরি করছে। এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে সারের ব্যাপক প্রয়োগ। এর ফলে মাটির স্বাস্থ্য আরও খারাপ হয়েছে। অন্যদিকে তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বিভিন্ন মৌসুমের ফসলের পরিমাণ কমছে। এশিয়ার ৪৮টি দেশের মধ্যে বর্তমানে ৩৮টি দেশে খরার প্রভাব রয়েছে। পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য রাখতে চাইলে প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। গাছকে ভালোবাসতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন এখন পুরো মানবজাতির বড় ইস্যু হয়ে গেছে।
ধরিত্রী দিবসের প্রেক্ষাপট কী
১৯৬৯ সালে সানফ্রান্সিস্কোতে ইউনেস্কো সম্মেলনে শান্তি কর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবীর সম্মানে একটা দিন উৎসর্গ করতে প্রস্তাব করেন এবং শান্তির ধারণা থেকে উত্তর গোলার্ধে বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে ১৯৭০ সালের ২১ মার্চ প্রথম এই দিনটা উদযাপিত হয়। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এক দিন পরে একটি পরিঘোষণায় অনুমোদিত হয়, যা লিখেছিলেন ম্যাককনেল এবং মহাসচিব উ থান্ট জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করেছিলেন। এক মাস পর একটি পরিবেশগত শিক্ষামূলক দিন হিসেবে আলাদা ধরিত্রী দিবসের অবতারণা করেন আমেরিকার সেনেটর গেলর্ড নেলসন। যা প্রথম সংঘটিত হয় ১৯৭০ সালের ২২ এপ্রিল। নেলসন পরবর্তীতে তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেসিডেন্সিয়াল মেডাল অফ ফ্রিডম পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যখন এই ২২ এপ্রিল ধরিত্রী দিবস হিসেবে আমেরিকায় প্রচলিত, তখন ডেনিস হায়েস একটা সংগঠন চালু করেন, যিনি ১৯৭০ সালে আসল জাতীয় সমন্বয়সাধক ছিলেন। যা ১৯৯০ সালে আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছিল এবং ১৪১টি দেশে সংগঠিত ঘটনা হিসেবে দেখা দিয়েছিল।
ধরিত্রীকে বাঁচানোর পদক্ষেপ কী
এই ধরিত্রীকে বাঁচাতে সকলের সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সকল মানুষকে পরিবেশ সচেতন করে তুলতে হবে। বৃক্ষ কর্তন রোধ, বৃক্ষরোপন ও বনসৃজনের দিকে নজর দিতে হবে। দুরবর্তী স্থানে যাবার জন্য ব্যক্তিগাড়ি ব্যবহার না করে পাবলিক যান বহন ব্যবহার করা। কাছাকাছি পথ অতিক্রম করতে হাঁটা বা সাইকেল ব্যবহার করা। জীবাস্ম জ্বালানি যথাসম্ভব কম ব্যবহার করতে হবে। জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষনের দিকে সকল মানব জাতিকে নজর দিতে হবে। রি-সাইকেল পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রব্যের পুনর্ব্যবহার করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার জন্য বিভিন্ন গবেষণা মূলক কাজে প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে।
প্রকৃতি আসলে নিজের শূন্যস্থান নিজেই পূরণ করে নেয়, কারো জন্য অপেক্ষা করে না। ধরিত্রীকে অর্থাৎ প্রকৃতিকে আমরা আমাদের কর্মকান্ডের মাধ্যমে ধ্বংসের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পরিবেশ এবং প্রকৃতি সংরক্ষণবিদগণের আবেদন নিবেদনে কেউ কর্ণপাত করেনি। কিন্তু সময় এসেছে ধরিত্রীকে বাঁচানোর। না হলে প্রকৃতি ঠিকই তার রুপ পরিবর্তন করবে।

উদাসিনতার দায় মুছে উদ্যোগী হতে হবে
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আন্দোলন এবং আলোচনা পৃথিবী জুড়েই চলছে। অনেক দেশ নিয়েছে অনেক কার্যকর উদ্যোগ। বিপরীতে, উদাসিনতার দায়ে কোনো কোনো প্রভাবশালী দেশ হয়েছে সমালোচিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, করোনা ভাইরাস অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত মানুষের। এ পৃথিবীকে বাস-উপযোগী রাখতে সকলেরই যথাযথ ভূমিকা রাখা উচিত। পরিবেশের সাথে জীবজগতের সম্পর্ক সুনিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। মানুষের কল্যাণ এই পরিবেশের উপরই নির্ভর করে। পরিবেশ বলতে সাধারণভাবে আমাদের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকেই বুঝায়। অবিরাম পরিবেশ দূষণের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন পৃথিবীর বুকে জীবনের অস্তিত্ব রক্ষা করা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘ বলছে, জলবায়ু পরিবর্তন. মানুষের হাতে প্রকৃতির বদল ও বনভূমি হ্রাস, জমির চরিত্র বদল, কৃষি ও পশুপালনের মাত্রাছাড়া বৃদ্ধি এবং বেআইনি বন্যপ্রাণী ব্যবসা বৃদ্ধির ফলে কোভিড-১৯ এর মতো পশু থেকে মানুষে সংক্রামক রোগ বাড়তে পারে। পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য রাখার জন্য আমাদের প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগানোর মাধ্যমে তাপমাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে। এতে করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিপর্যয়, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমি ক্ষয় এবং কার্বন নিঃসরণ কমবে। জলবায়ু পরিবর্তন মানবজাতির জন্য মারাত্মক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই বাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে নিজেকে সচেতন হতে হবে ও অন্যকেও সচেতন করতে হবে।
‘পৃথিবীকে রক্ষা করতে বাস্তুসংস্থানসমূহ নিরাপদ করি’
এদিকে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটি ‘পৃথিবীকে রক্ষা করতে বাস্তুসংস্থানসমূহ নিরাপদ করি’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করেছে। আজ বিকাল ৪টায় সিরডাপ মিলনায়তনের সেমিনার হলে এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. আতিক রহমান।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য এবং বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. খন্দকার বজলুল হক। স্বাগত বক্তব্য করবেন আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন।
ইউডি/অনিক

