সমাজে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির নেপথ্যে যত কারন
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ২৫ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৬:১০
দেশে ভয়ঙ্কর হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অপরাধ প্রবণতা যা সমাজব্যবস্থায় ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। চুরি-ছিনতাই, ধর্ষণ, মাদকের সঙ্গে নিত্যনতুন যোগ হচ্ছে কিশোর অপরাধ ও সাইবার ক্রাইম। অপরাধের ধরনের পাশাপাশি বদলেছে অপরাধীদের কৌশলও। অপরাধ বাড়ার পেছনে নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অবস্থাকেই দোষ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অভিভাবকদেরও নজরদারি বাড়ানোও ওপর জোর দিতে বলচেন তারা। বিস্তারিত লিখেছেন কিফায়েত সুস্মিত
প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায় কিছু সংবাদ যেনো নিত্যদিনের খোড়াক বনে গেছে। এক জেলায় খুন, তো অন্য জেলায় ধর্ষণ। কোথাও চুরি-ডাকাতি কোথাও বা মাদকসেবীদের অত্যাচার। সবমিলিয়ে অপরাধ যেনো থামছেই না। সম্প্রতি আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু এবং কলেজ ছাত্রী প্রীতি হত্যাকাণ্ডের পর খুন হয়েছেন ‘গরিবের ডাক্তার’ বলে পরিচিত ডেন্টিস্ট আহমেদ মাহী বুলবুল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও কোনো ভাবেই অপরাধীদের লাগাম টানা যেনো যাচ্ছে না। এই অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির পেছনে তাহলে কী কাজ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মানসিকতাই হচ্ছে প্রধান কারন। মানসিকতার পরিবর্তন সবকিছুর মূলে। এর ফলেই সমাজের ভেতর নৈতিক মূল্যবোধের ঘাটতি, রেষারেষি, অপরাধ ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ছাড়াও সমাজের প্রতিটি অংশ আসলে নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। এসব ঘটনা বাড়ার পেছনে করোনার কিছুটা হাত রয়েছে বললেও ভুল হবে না। কারণ মানুষ অনেকদিন ধরে গণ্ডিবদ্ধ জায়গায় এক প্রকার কর্মহীন হয়ে আবদ্ধ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যেই এ ধরনের প্রবৃত্তি তৈরি হতে পারে। তবে এসব অপরাধ রোধে আইনি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বেশি কার্যকর হবে।

রাজধানীতে ১৪ বছরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তিন হাজার ৩৭৫টি: ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) হিসাব বলছে গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ১২টি। তার আগে জানুয়ারি মাসে নয়টি। বছর হিসেবে দেখা যায় ২০২১ সালে ঢাকায় ১৬৬টি এবং ২০২০ সালে ২১৯টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীতে ২০০৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৪ বছরে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তিন হাজার ৩৭৫টি, গড়ে প্রতিবছর ২৪১টি। ২০২১ সালে ডিএমপির আট বিভাগে অপরাধের মামলা হয়েছে ২৭ হাজার ৪৬১টি। সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে মাদক নিয়ে। এরপর রয়েছে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা। বিভিন্ন অপরাধে ২০২১ সালে সব মিলিয়ে গ্রেফতার করা হয় ৫০ হাজারের মতো ব্যক্তি। আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ৪২ হাজার ৩৬৯। ওই বছর ডিএমপিতে ২২ হাজার ৬৭৩টি মামলা হয়। ডিএমপির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপরাধের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে তেজগাঁও বিভাগের আওতাধীন এলাকায়। ওই এলাকায় ধর্ষণ, ডাকাতি, দস্যুতা, ছিনতাই, সিঁধেল চুরি, গাড়ি চুরি ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা বেশি ঘটেছে।
ঈদের আগে অপরাধের ঘটনা বাড়তে পারে: গত ১০ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে বিভাগীয় কমিশনারদের সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় সারা দেশের অপরাধ সংক্রান্ত মামলা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে জানা যায়, গত মার্চ মাসে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় ২ হাজার ৩০১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮৯৪টি। গত ফেব্রুয়ারির চেয়ে মার্চ মাসে ৪০৭টি মামলা বেশি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ঈদের আগে অপরাধের ঘটনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে চুরি ছিনতাই, ডাকাতি, জাল টাকার কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

বিচার ব্যবস্থাই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে: অপরাধ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক নূর খান গণমাধ্যমকে জানান, অপরাধ যে বাড়ছে তা যেমন নয়, তেমনি কমছেও না। তবে এটা আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। আলোচনায় না আসলে অপরাধ নিয়ে কথাও হয়না। অপরাধ না কমার কারণ হিসেবে তিনি জানান, বিচার না হওয়ায় অপরাধ কমছে না। অপরাধীর বিচার হলে আর আইনের আওতায় আনা গেলে এই পরিস্থিতি হত না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধে শ্রেণিবৈষম্য বৃদ্ধিও দায়ী: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান গণমাধ্যমে নিজের অভিমত প্রকাশে লিখেন, শ্রেণিবৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করছে, যার ফলে সামাজিক চাপ (সোশ্যাল স্ট্রেইন) বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কারণে অনেকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৫.৩০ শতাংশ মানুষ বেকার যা আগের বছরের তুলনায় ১.১০ শতাংশ বেশি। অপরদিকে, ধনীরা দিন দিন আরও বেশি সম্পদশালী হচ্ছে এবং দরিদ্ররা আরও বেশি দরিদ্র।

মাদক উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বহুগুণে: দেশে মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মাদকের ব্যবহার। আর এর ফলে যুবসমাজ দিনকে দিন নিজেদের ভবিষ্যৎকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিপথে পা বাড়াচ্ছে। মাদকের টাকা জোড়ার করতে তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে। এক্ষেত্রে তারা খুন করতেও পিছপা হচ্ছে না। এই ধরণের বেশকিছু ঘটনা ইতোমধ্যেই প্রকাশও পেয়েছে। শুধু তাই নয় মাদকাসক্তরা তাদের পরিবারকেন্দ্রিকও নানা অপরাধ করে যার কিছু গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় আর আর কিছু অপ্রকাশিত থাকে। মাদক গ্রহণের পর তারা জড়িয়ে পরে আরও অপরাধে। ধর্ষণ তাদের মধ্যে অন্যতম।
নৈতিক শিক্ষার অভাবও বড় কারন: সন্তানকে শিক্ষিত করার জন্য উঠেপড়ে লাগেন অভিভাবকগণ। নামী প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য প্রতিযোগীতায়ও দেখা যায় তাদের। কিন্তু সন্তান কি সুসিক্ষিত হচ্ছে কিনা তাতে নজর নেই কারো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকেই বড় করে দেখা হয় আজকাল। তাতে নৈতিক শিক্ষা হোঁচট খায়। আর নৈতিক শিক্ষা না পেলে ভালো-মন্দের পাথর্ক্য বোঝা বড় দায় সবার ক্ষেত্রেই। তাই এই ক্ষেত্রে নজর বাড়নো খুবই জরুরী।
অপরাধীদের মোটিভেশন দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ: বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান গণমাধ্যমকে বলেছেন, সামাজিক অপরাধ দমনে অপরাধীদের মোটিভেশন দেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে পরিবারগুলোয় যে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ আছে এ বিষয়ে সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। সমাজে এখন কোনো ভারসাম্য নেই। এখানে কেউ কাউকে শ্রদ্ধা করছে না। যারা অতিধার্মিক তারা অতি আধুনিক মানুষকে শ্রদ্ধা করছেন না। যদি সমাজ বা পরিবার ব্যালান্স ও মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলে তখন এ অপরাধ বেশি সংঘটিত হবে। এলিনা খান আরও বলেন,‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে মনে করছি সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। আবার পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়াকেও অন্যতম একটি কারণ বলে ধরে নেওয়া হতো। কিন্তু ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় এখন আমরা ভালোমন্দ মিলিয়ে অনেক কিছু দেখতে পারছি। এসবের কোনটি সঠিক আর কোনটি ভুল তা বোঝার মতো জ্ঞান অনেকেরই নেই। আবার কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা একেবারে গোঁড়া। তারা সমসাময়িক কোনো বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন না।

আইনের অপব্যবহার ও অপ্রতুলতা: বাংলাদেশে অপরাধ দমনের জন্য বিভিন্ন ধরনের আইন অব্যাহত আছে। যেমন, ফৌজদারি কার্যবিধি, দøবিধি, পুলিশ রেগুলেশন আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব আইনের কার্যকরী প্রয়োগ হচ্ছে না। অপরাধ সংঘটিত হলে সেটি আদালত পর্যন্ত পৌঁছালেও বাদী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে না, যার ফলে অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় অপরাধী বা অপরাধীর পরিবার বিভিন্নভাবে বাদী ও সাক্ষীর উপর চাপ প্রয়োগ করে। তাই এদেশের অনেক মামলাই উপযুক্ত প্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে ন্যায়বিচারের মুখ দেখতে পায় না।
সাইবার ক্রাইম এখন বড় হুমকি: বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও ইন্টারনেট ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর ছাড়িয়ে মফস্বলেও এখন ইন্টারনেট নিত্যদিনের সঙ্গী। এর ভালো দিকও যেমন রয়েছে তেমনি মুদ্রার উল্টো দিকও রয়েছে। এই ইন্টারনেটের অপব্যবহারে অনলাইন হ্যারাসমেন্ট, সাইবার বুলিং, পর্নোগ্রাফিসহ অনলাইন ভিত্তিক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সোচ্চার হতে হবে: সমাজ থেকে অপরাধ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা সম্ভব নয় তা যেমন সত্য তেমনি এটাও সত্য যে অপরাধ দমন তথা নিয়ন্ত্রণ করা যাবেই। পৃথিবীর বহুদেশে অপরাধ প্রবণতা শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তাদের জেলখানাগুলোতে নেই কোনো আসামী। সুতরাং, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি ও সামাজিকভাবে সবার দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সোচ্চার হওয়া দ্রুতই কমিয়ে নিয়ে আসতে পারে সকল অপরাধ প্রবণতার হার। তাতে সমাজে যেমন শান্তি ফিরবে দেশও এগিয়ে যাবে দ্রুততার সাথে।
ইউডি/সুপ্ত

