ঘরহীনকে ঠাঁই দিয়ে মাথা তুলে বাঁচতে শিখিয়েন প্রধানমন্ত্রী
মীর নাহিদ আহসান । বুধবার, ২৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:১০
‘আগে ছিলাম রাস্তার ভিখারি, এখন আমি লাখপতি। শুধু বঙ্গবন্ধুকন্যার জন্য আমি এ পর্যায়ে আসতে পেরেছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আমার মা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিবের আত্মা যেন শান্তি পায়, আমি সেই কামনা করি। তারা যেন স্বর্গ থেকে দেখতে পান, আমরা সুখী হয়েছি।’ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় ৫৩ হাজার পরিবারকে ঘর প্রদান কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জমির মালিকানাসহ আধাপাকা ঘর পেয়ে মৌলভীবাজারের কালাপুর ইউনিয়নের মাইজদিহি গ্রামের বীরাঙ্গনা শিলা গুহ আবেগাপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলেন।
আবেগী কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখনো প্রতিদিন আপনার জন্য বাতি জ্বালাই। আমার বোন যেন সুখী থাকে। আমার বোনকে যেন করোনাভাইরাস আক্রান্ত করতে না পারে। আমার বোন যেন হাজার বছর বাঁচে-সেই কামনা করি।’ মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে বীরাঙ্গনা শিলা গুহ বলেন, ‘আমি যুদ্ধের সময়েও ভাবতে পারিনি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ বয়সেও আমাকে দেখে রাখবে। তাই আমি ভীষণ ভীষণ খুশি হয়েছি তার প্রতি। বঙ্গবন্ধুকন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার কাছে আমার একটা দাবি-আমায় যে ঘর দিয়েছেন, সেই ঘরে একবার আসবেন। আমি আপনাকে সাতকরা দিয়ে তরকারি রান্না করে খাওয়াব।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জাতির পিতার দেখানো পথে আপনি নিরন্তর ছুটে চলেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার নানাবিধ কর্মসূচি নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, যার অন্যতম ছিল জনগণের জন্য টেকসই বাসস্থান। আশ্রয় মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার মাত্র ৯ মাসের মাথায় রচিত সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসাবে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হলো। সদ্যস্বাধীন দেশে জাতির পিতা ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের বাসস্থানের জন্য নির্মাণ করেছিলেন গুচ্ছগ্রাম। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তৎকালীন নোয়াখালী জেলা (বর্তমান লক্ষ্মীপুর) সফরে গিয়ে আশ্রয়হীনদের প্রথম পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। লালসবুজের পতাকা যে উত্তাল শক্তি তৈরি করেছিল, পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে সেই অর্জনকে ধূসর করে দিয়েছিল স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তি। যার ফলে ছিন্নমূল মানুষের বাসস্থানের আশা পরিণত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে।
আকাশছোঁয়া স্বপ্নচারী জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে ভূমিহীন, গৃহহীন সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিতে ক্লান্তি ও নিদ্রা ছেড়ে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার আপনার আহ্বানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে আপনি প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে এক লাখ ২৩ হাজার ২৪৪টি ঘর দিয়ে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পরিবারকে আনন্দে কাঁদিয়েছেন। এর আগে কক্সবাজারে জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য পৃথিবীর সর্ববৃহৎ আশ্রয়ণ প্রকল্প শুরু করেছেন আপনি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৭ সাল থেকে মে ২০২১ পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৩ হাজার ৫৬২ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। মানবতার মা হয়ে পর্যায়ক্রমে প্রায় ১০ লাখ পরিবারকে আশ্রয়ণের আওতায় নিয়ে আসার স্বপ্ন দেখছেন আপনি।
এবারও অগ্রাধিকার পেয়েছেন অসচ্ছল বীর মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা নারী এবং প্রতিবন্ধী মানুষ। ৩য় পর্যায়ে নির্মিতব্য ৭৭৯টি ঘর নির্মাণে সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ২০ কোটি ২১ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝে কবুলিয়ত ও নামজারিসহ দুই শতাংশ করে জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে। পৌঁছেছে বিদ্যুৎ, আছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা। প্রতিটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে গৃহপ্রদান সনদ। ব্যবস্থা করা হয়েছে উন্মুক্ত খেলার মাঠ। যেখানে আগামী প্রজন্মের শিশুরা একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে। সবুজায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রোপণের কাজ চলছে। একদিন এ জায়গাটাই ছায়াঘেরা মায়াময় গ্রামে পরিণত হবে।
সেখানে ক্ষেত্রবিশেষে কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ, কবরস্থান, পুকুর ও গবাদি পশুপালনের জন্য সাধারণ জমির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পুনর্বাসিত নারী-পুরুষদের বিভিন্ন ব্যবহারিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তোলা হবে। প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা কাজ করে উপার্জন করতে পারবে। গৃহিণীরা হাঁস-মুরগি, ছাগল ও অন্যান্য গৃহপালিত প্রাণী পালন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে বাংলাদেশের বদলে যাওয়া সক্ষমতা সম্পর্কে আপনি ইতোমধ্যে বিশ্বকে জানান দিয়েছেন। আপনি বাংলার মানুষকে প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন উপহার দিয়ে চলেছেন। উপহারের ঘর পাওয়া বীরাঙ্গনা শিলা গুহের নিমন্ত্রণের জবাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি বলেছিলেন, ‘আমি যদি সুযোগ পাই, নিশ্চয়ই আপনার ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করব।’ প্রজাতন্ত্রের একজন সামান্য কর্মচারী হিসাবে সেই থেকে আমিও প্রতীক্ষার প্রহর গুনছি কখন আপনি মৌলভীবাজার এসে আপনার দেওয়া মহামূল্যবান উপহারগুলো নিজের চোখে দেখে আমাদের চির কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করবেন।
লেখক: জেলা প্রশাসক, মৌলভীবাজার।
ইউডি/সুস্মিত

