ইউক্রেন আক্রমণ ভবিষ্যৎ যুদ্ধে পরমাণুভীতি বাড়িয়েছে
ডা. জাহেদ উর রহমান । বুধবার, ২৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১১:২০
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনা করতে পারে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে চীন-তাইওয়ান সংকটকে ঘিরে। চীন যতই তাইওয়ানকে নিজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করুক না কেন, তাইওয়ান নিজেকে স্বাধীন দেশ বলেই মনে করছে এবং বর্তমানে দেশটির জনসংখ্যার মূল অংশ কোনোভাবেই চীনের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথা আর ভাবে না।
সার্বিক পরিস্থিতিতে চীন প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করবে বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছে। চীন যদি বল প্রয়োগ করে তাইওয়ানকে একীভূত করে নেয়, তার ফলে তাইওয়ানের সাহায্যে জাপান চীনের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করবে, এমন সম্ভাবনা প্রবল। এখন পর্যন্ত একটি চুক্তির আওতায় তাইওয়ানকে অত্যাধুনিক ভারী প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা আমেরিকা তাইওয়ান আক্রান্ত হলে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে কিনা এটা স্পষ্ট নয়।
কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, আমেরিকাও সেই যুদ্ধে জড়াবে। এ সংকট শেষ পর্যন্ত সর্বাত্মক একটা বিশ্বযুদ্ধেই গড়াতে পারে। কিন্তু রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর প্রশ্ন উঠছে, চীন আদৌ কি সহজে তাইওয়ানকে নিজের সঙ্গে একীভূত করতে পারবে?
রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের দুই মাস হয়ে গেল। রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনে ঢোকার পর অতি দ্রুত ইউক্রেনীয় বাহিনী অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করবে এবং সেখানকার জনগণ রাশিয়ার সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানাবে এমন একটা ধারণা ভ্লাদিমির পুতিনের ছিল। এ আগ্রাসনের মাধ্যমে এক ঢিলে অনেক পাখি মারবেন সেই আশা তার ছিল; কিন্তু এখনো তেমনটি ঘটেনি।
একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট, সর্বাত্মক আক্রমণের মাধ্যমে কয়েক দিনের মধ্যে কিয়েভ দখল করে সেখানে বেলারুশের আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কোর মতো একজন ‘পুতুল’ শাসক বসানো হবে, এরপর রুশ বাহিনী ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে সুন্দরভাবে দেশে ফিরে যাবে-এমন আশায় গুড়েবালি হয়েছে। ইউক্রেনীয়দের অকল্পনীয় প্রতিরোধের কারণে চড়া মাশুল দিয়ে মারিউপোল শহরের নিয়ন্ত্রণ আর কিছু দিনের মধ্যেই যাচ্ছে রাশিয়ার হাতে, কিন্তু তারা দোনবাসের পুরো এলাকার নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে কিনা, অনিশ্চিত সেটা।
ইউক্রেন আক্রমণ করার আপাত যে কারণ রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ইউক্রেনের ন্যাটোর অন্তর্ভুক্তকরণ ঠেকিয়ে নিজের সীমানা থেকে ন্যাটোকে দূরে রাখার চিন্তা, সেটাও এগোচ্ছে না ঠিক পথে। রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসন শুরুর আগেই ন্যাটো সদস্য তিন বাল্টিক দেশেরই সীমান্ত ছিল রাশিয়ার সঙ্গে। এর মধ্যে এস্তোনিয়া ও লাতভিয়ার আছে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে আর লিথুয়ানিয়ার আছে রাশিয়ার ছিটমহল কালিনিনগ্রাদের সঙ্গে।
এখন ইউক্রেনের পরিণতি দেখে স্নায়ুযুদ্ধের সময় ও নিরপেক্ষ থাকা দেশ ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দিচ্ছে, এটা প্রায় নিশ্চিত। ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলে পারমাণবিক বোমা মোতায়েনের হুমকি দিয়েছে। তবে সেই হুমকিকে দেশ দুটি খুব একটা পাত্তা দেবে বলে মনে হয় না, কারণ বাল্টিক অঞ্চলে রাশিয়ার ছিটমহল কালিনিনগ্রাদে এখনই পারমাণবিক বোমা মোতায়েন করা আছে, এটা প্রায় নিশ্চিত। আলোচিত দেশ দুটি যোগ দিলে, ফিনল্যান্ডের সীমান্ত যুক্ত করলে ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সীমান্তের দৈর্ঘ্য বর্তমানের দ্বিগুণের বেশি হয়ে যাবে।
ইউক্রেন আগ্রাসনে কমপক্ষে আটজন জেনারেলসহ হাজার রাশিয়ান সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে (সংখ্যাটি স্পষ্ট নয়)। রাশিয়ার শত শত ট্যাংক এবং সাঁজোয়া যান বিধ্বস্ত হয়েছে। ভূপাতিত হয়েছে বেশকিছু হেলিকপ্টার ও যুদ্ধবিমান। এমনকি ইউক্রেনে আক্রমণ পরিচালনাকারী রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় নৌবহরের নেতৃত্বদানকারী জাহাজ, যেখানে কমান্ডার থাকেন (ফ্ল্যাগশিপ) সেই মস্কোভাকে নিজের তৈরি ‘নেপচুন’ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে ইউক্রেন। এ জাহাজে ইউক্রেনীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা রাশিয়া স্বীকার না করলেও মস্কোভা ডুবে যাওয়ার পর কিয়েভসহ ইউক্রেনের নানা শহরে ‘প্রতিশোধমূলক’ ভয়ংকর হামলা চালিয়ে আদতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলারই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রধারী কোনো দেশ যদি তার তুলনায় অনেক দুর্বল কোনো দেশকে আক্রমণ করতে যায়, তাহলে যুদ্ধের শুরুতেই মাথায় রাখবে তার অন্তত ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে। আর রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর সরাসরি সংঘাতের সম্ভাবনা তো এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। ইউক্রেন যুদ্ধে এবং এ যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে অন্যান্য যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা বেড়ে গেছে।
লেখক: শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট
ইউডি/সুস্মিত

