এডমন্ড হ্যালি: জ্যোতির্বিজ্ঞানের বহু তত্বের আবিষ্কারক
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৭ এপ্রিল ২০২২ । আপডেট ১৯:২০
ধূমকেতু আবিষ্কার করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন ব্রিটিশ জোর্তিবিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি। তার নামেই আবিষ্কৃত ধূমকেতুটির নাম রাখা হয় হ্যালির ধূমকেতু। ধূমকেতুদের মধ্যে হ্যালির ধূমকেতু সবচেয়ে বিখ্যাত। এই ধূমকেতুটি প্রতি ৭৬ বছরে একবার করে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে ও আকাশে উদিত হয়। জোর্তিবিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালির সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল অনিক।
এডমন্ড হ্যালি শুধু ধূমকেতুই আবিষ্কার করেননি। তিনিই সর্বপ্রথম পৃথিবীর ভৌগোলিক মানচিত্র প্রকাশ করেছিলেন। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব কতো এটাও হ্যালি আবিষ্কার করেছিলেন। এছাড়া শুক্রগ্রহের গতিপথও নির্ণয় ও দক্ষিণ গোলার্ধের ৩৪১টি নক্ষত্রের অক্ষাংশও দ্রাঘিমার অবস্থান নির্ণয় করেছিলেন তিনি।
এডমন্ড হ্যালি কে ছিলেন?
এডমন্ড হ্যালি ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূপদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ, আবহাওয়াবিদ এবং পদার্থবিজ্ঞানী। এই বিজ্ঞানী একটি মহান অবদান ছিল আইজাক নিউটন দেহের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ নিয়ে কাজ করা। এডমন্ড হ্যালি প্রথম বিজ্ঞানী যিনি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারেন যে ধূমকেতু সময়-সময় পৃথিবীর কাছাকাছি আসবে কারণ এই ধূমকেতুগুলিরও একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ আছে।
এডমন্ড হ্যালির জন্ম
এডমন্ড হ্যালি ১৬৫৬ খ্রীষ্টাব্দের ৮ই নভেম্বর ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন জন্মগ্রহণ করেন সেই সময়টা ছিলো আধুনিক বিজ্ঞানের উন্মেষের যুগ।
হ্যালির শিক্ষাজীবন
লন্ডনের সেন্টপল স্কুলের পড়া শেষ করে হ্যালি ১৬৭৩ খ্রীষ্টাব্দে অক্সফোর্ড কুইন্স কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ছিলেন জন ফ্রেমস্টিড। ফ্রেমস্টিড রয়াল গ্রীনিচ অবজারভেটরিতে গবেষণা করতেন। ফ্রেমস্টিড খুব স্নেহ করতেন জ্যোতির্বিজ্ঞানে উৎসাহী হ্যালিকে। এই পরিচয়ের সূত্র ধরেই হ্যালি বেশ কয়েকবার গ্রীনিচ অবজারভেটরিতে যাবার সুযোগ পান।
নক্ষত্রের ওপর গবেষণা
ছাত্র অবস্থাতেই হ্যালি তার শিক্ষক ফ্রেমস্টিডের তত্বাবধানে উত্তরাকাশে নক্ষত্র গণনার উপর গবেষণা করতে থাকেন। উত্তর আকাশের উপর গবেষণা করতে করতে তার নিজের উপর বিশ্বাস জন্মে যায়। তখন তিনি দক্ষিণ আকাশের নক্ষত্রের অবস্থান সমূহের উপর গবেষণা করার প্রস্তাব করেন। হ্যালির উপর ফ্রেমস্টিডের ছিলো অগাধ বিশ্বাস। তিনি প্রস্তাবটি সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন করেন এবং হ্যালি যাতে তার এই গবেষণা চালাতে পারেন তিনি তারও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে দেন।
নক্ষত্রের অবস্থান ও শুক্র গ্রহের গতিপথ নির্ণয়
হ্যালি ১৬৭৬ সনের নভেম্বর মাসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর একটা জাহাজে করে দক্ষিণ গোলার্ধে রওয়ানা দেন। তার গন্তব্য ছিলো আটলান্টিক মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপ সেন্ট হেলেনা। আবহাওয়া খারাপের কারণে তিনি সেন্ট হেলেনায় ততো ভালোভাবে গবেষণা চালাতে পারেননি। তবে তিনি দক্ষিণ গোলার্ধের ৩৪১টি নক্ষত্রের অক্ষাংশও দ্রাঘিমার অবস্থান নির্ণয় করেন। তিনি শুক্রগ্রহের গতিপথও নির্ণয় করেছেন।
হ্যালির ক্যাটালগ ও গ্রন্থ প্রকাশ
এডমন্ড হ্যালি দক্ষিণ গোলার্ধে এক বছর ধরে গবেষণা করে নক্ষত্রের যে ক্যাটালগ তৈরি করেছিলেন, সেটা ১৬৭৮ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। দক্ষিণ আকাশের নক্ষত্র গণনার উপর হ্যালির গবেষণাই ছিলো প্রথম গবেষণা এবং প্রামাণ্য গ্রন্থ। গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পর পরই জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে এডমন্ড হ্যালির নাম ছড়িয়ে পড়ে বিজ্ঞান জগতে এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি স্বীকৃতি লাভ করেন।
রয়েল সোসাইটির সদস্য ও মাস্টার ডিগ্রি
হ্যালি তার এই কৃতিত্বের জন্য ১৬৭৮ খ্রীষ্টাব্দে লন্ডনের রয়েল সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেন। শুধু তাই নয়, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তার কৃতিত্বের জন্য কোর্স কমপ্লিট না করা সত্ত্বেও তাকে মাস্টার ডিগ্রী প্রদান করে।
নিউটনের সাথে সাক্ষাৎ
এইসময় বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী নিউটন গ্রহরাজির গতিবিধির উপর গবেষণা করেছিলেন। ১৬৮৪ খ্রীষ্টাব্দে এডমন্ড হ্যালি কেব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে স্যার আইজ্যাক নিউটনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। মধ্যাকর্ষণ শক্তি আবিষ্কারের জন্য নিউটনের তখন বিশ্বজোড়া খ্যাতি। নিউটন তাকে জানান যে, তিনি গ্রহরাজির গতিবিধির গাণিতিক ব্যাখ্যা প্রদান করে একটা বই লিখেছেন; নাম ‘প্রিন্সিপিয়া’। নিউটন তার এই গুরুত্বপূর্ণ বইটির সংশোধন মুদ্রণ ও প্রকাশের সার্বিক দায়িত্ব অর্পণ করে হ্যালির উপর। কাজটি ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল। কিন্তু মেধাবী হ্যালি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্বটি পালন করেন। বইটি ১৬৮৭ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।
ধূমকেতু আবিষ্কার
হ্যালি ১৬৮৬ খ্রীষ্টাব্দে ভু-পৃষ্ঠের একটা ম্যাপ প্রকাশ করেন। ম্যাপটিতে সাগর ও স্থলভাগের বায়ু চলাচলের একটা নিখুঁত চিত্র প্রকাশ করেন তিনি। এটাই ছিলো পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভৌগোলিক মানচিত্র। হ্যালির জীবনের আরেকটি সর্বাপেক্ষা বড় কাজ হলো হ্যালির ধূমকেতু আবিষ্কার। তিনি মহাকাশ নিয়েও গবেষণা করেছেন প্রচুর। বিশেষ করে তিনি সৌরজগতের সবচেয়ে বৃহত্তম ধূমকেতুর পরিক্রমণ নিয়ে অনেক গবেষণা করেন।
ধূমকেতু নিয়ে তার গবেষণার ফলশ্রুতিতে প্রকাশিত হয় Asynopsis of the Astronomy of Comets . az alce। তিনি সৌরজগতের ২৪ টি উল্লেখযোগ্য ধূমকেতুর গতিপথ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। হ্যালির ধূমকেতুটি সর্বশেষ আকাশে উদিত হয়েছিলো ১৯৮৬ সালে। আবার দেখা যাবে ৭৬ বছর পরে ২০৬১ সালে।
সূর্য ও পৃথিবীর দূরত্ব
সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব কতো এটাও হ্যালি আবিষ্কার করেছিলেন।
কৃতিমান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মৃত্যু
এই মহান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডমন্ড হ্যালি ১৭৪২ সনের ১৪ই জানুয়ারি ৮৬ বছর বয়সে পরলোক যাত্রা করেন।
ইউডি/অনিক

