যানজট নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ কতটুকু উদ্যমী
আবু তাহের খান । শুক্রবার, ৬ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৩০
দ্রব্যমূল্যের মতোই ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে দেশের যানজট পরিস্থিতিও, বিশেষত রাজধানীতে। আর যানজটের নেতিবাচক প্রভাব শুধু মানুষের চলাচলের দুর্ভোগকেই বাড়াচ্ছে না এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো নাগরিক জীবনকেই এলোমেলো ও দুর্বিসহ করে তুলেছে। এরমধ্যে নিত্যপণ্যের উপর থেকে আমদানিশুল্ক হ্রাস, টিসিবির মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, বাজার পরিধারণ ইত্যাদি কিছু কিছু ব্যবস্থা নিয়ে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে (যদিও মূল সমাধান এটি নয় প্রকৃত সমাধানের জন্য প্রয়োজন নীতিকাঠামোর আমূল পরিবর্তন)। কিন্তু যানজট নিয়ন্ত্রণে কী করা হচ্ছে, তা একেবারেই দৃশ্যমান নয়। বিষয়টি নিয়ে সেমিনার, গোলটেবিল বৈঠক ইত্যাদি পর্যায়ে ও বিশেষজ্ঞমহলে আলোচনা হচ্ছে বটে। কিন্তু এর সমাধানে সরাসরি যুক্ত যেসব প্রতিষ্ঠান তারা এ ব্যাপারে কতটুকু উদ্যমী এবং বিষয়টিকে তারা কতটুকু গুরুত্বের সাথে নিচ্ছেন, তার উপরই বস্তুত নির্ভর করছে সমস্যার বাস্তব সমাধান।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে ১৯৮০-এর দশক শেষার্ধ পর্যন্ত রাজধানীতে সরকারি দফতরসমূহের (ব্যাংক ব্যতীত) সময়সূচি ছিল সকাল সাড়ে ৭টা থেকে কোনো বিরতি ছাড়া বেলা ২টা পর্যন্ত। বয়সী মানুষদের অনেকেই এখনো মনে করেন যে, অফিসের সে সময়সূচি অনেক বেশি উৎপাদনশীল ছিল। এতে দাফতরিক সময়ের পাশাপাশি ব্যক্তি-সময়ের সাশ্রয় হওয়ার বিষয়টিও সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রমাণিত। তদুপরি এ সূচির আওতায় সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দুপুরের খাবার ঘরে ফিরে খাওয়ার সুযোগ থাকায় এ ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয়েরও সুযোগ রয়েছে। আর এর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক সামাজিক প্রভাব হচ্ছে, এতে করে রাতে আগেভাগে ঘুমানো এবং খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠার স্বাস্থ্যকর অভ্যাসটি সহজেই রপ্ত হয়ে যায়। বস্তুত সরকারি দফতরের এ সময়সূচি যখন থেকে পরিবর্তন করা হলো, তখন থেকেই এ দেশে সকালে বিলম্বে ঘুম থেকে ওঠার বদঅভ্যাসটি ব্যাপকতা লাভ করে। এমনি প্রেক্ষাপটে চলমান যানজট পরিস্থিতির ভয়াবহতার কথা বিবেচনা করে রাজধানীর সরকারি দফতরসমূহের সময়সূচি অবিলম্বে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিরতিহীনভাবে বেলা ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে ব্যাংকসমূহের বর্তমান সময়সূচি যথারীতি বহাল থাকতে পারে।
সিদ্ধান্ত ছিল এবং অনুমান করি কাগজে-কলমে এখনো তা বহাল আছে যে, আন্তঃজেলা রুটের কোনো বাসই রাজধানীর ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। আর সে সিদ্ধান্তের আলোকেই তখন গুলিস্তান থেকে বাসস্ট্যান্ড সরিয়ে গাবতলী, মহাখালী ও সায়দাবাদে স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উদাসীনতা ও শিথিল দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই এ চমৎকার সিদ্ধান্তটি বর্তমানে ব্যাপকভাবে শিথিল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, এ ব্যাপারে বাসমালিকদের সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো কোনো মহলের অনৈতিক সম্পর্ক ও যোগসাজশের কারণেই এমনটি হচ্ছে। সে যাইহোক, উল্লিখিত সিদ্ধান্তটি কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করতে পারলে ঢাকা শহরের যানজট অনেকখানি কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
ঢাকার ফুটপাতজনিত যানজট সমস্যা যতটা না হকার ও দোকানদারদের দ্বারা সৃষ্ট, তারচেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক মতলববাজির ফলশ্র“তি। এ ফুটপাতগুলোর অধিকাংশই একশ্রেণির রাজনৈতিক কর্মীর চাঁদা সংগ্রহের নেটওয়ার্ক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে ফুটপাতভিত্তিক রাজনৈতিক চাঁদাবাজি বন্ধ করা না গেলে ফুটপাতে হকার ও দোকানদার বসাজনিত সন্নিহিত সড়কসমূহের যানজট কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। একইভাবে যানজট নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না টার্মিনাল ও বাসস্ট্যান্ডগুলোতে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে না পারলেও। এ ক্ষেত্রে পাড়া-মহল্লার চাঁদাবাজদের ভূমিকাও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তত ২৫-৩০ শতাংশ ক্লাশ অনলাইনে নেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে, যা যানজট নিরসনে বাপকভাবে সহয়ক হবে। তদুপরি ফিজিক্যাল ক্লাশের কোনো শিক্ষার্থী যদি স্বেচ্ছায় অনলাইনে ক্লাশ করতে চায়, তাহলে তাকেও সে সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ফিজিক্যাল ও অনলাইন উভয় ক্লাশের শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষাসমূহ অনলাইনের নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যা যানজট নিরসনে সহায়ক হবে অথচ এতে শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মানেট তেমন কোনো হেরফের হবে বলে মনে হয় না।
যানজটের কথা ভেবে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু অসৎ ডিজিটাল বিপণন কোম্পানি যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে, একই ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে তজ্জন্য এ ব্যবস্থাকে একটি দৃঢ় ও সুনির্দিষ্ট আইনীকাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যেখানে যেকোনো ধরনের অনিয়মের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের যানজট পরিস্থিতি প্রতিদিনই খারাপ থেকে অধিকতর খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাতে করে পুরো ঢাকা শহরই অদূর ভবিষ্যতে এমন স্থবিরতার পর্যায়ে চলে যেতে পারে যে, শহরটি আর বসবাসযোগ্যতার স্তরে থাকবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তদুপরি দেশের অর্থনীতির উপরও এ যানজট নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী না বলা পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা কেউ কোনো উদ্যোগ নেবেন না— এমন পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করার মতো অবস্থা এখন আর হাতে নেই। অতএব সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একসাথে বসে এ ক্ষেত্রে সমন্বিত তৎপরতা গ্রহণে এগিয়ে আসেন, তাহলে বিদ্যমান পরিস্থিতি যত খারাপই হোক না কেন, তা থেকে বহুলাংশে বেরিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করি।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক)
ইউডি/সুস্মিত

