সয়াবিন তেলে এত ঝাঁজ!
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ৬ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৫০
নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে টানাহেচড়া যেন কমছেই না। ঈদের আগে থেকেই পূর্বাভাস ছিলো সয়াবিনের দাম বাড়বে। কিন্তু ঈদের তৃতীয় দিনেই দাম বৃদ্ধি পাবে এ নিয়ে কেউই প্রস্তুত ছিলো না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করে এবার নতুন দরের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রেক্ষাপট ও সঙ্কটেই নতুন এই সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয় বলছে তারা নতুন এই দর নিয়ে এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণ করবেন। বিস্তারিত লিখেছেন বিনয় দাস
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ধারাবহিকভাবেই অস্থির হতে শুরু করে ভোজ্যতেলের বাজার। গত মার্চের মাঝামাঝি আর্জেন্টিনা সয়াবিন তেল রপ্তানি সীমিত করার ঘোষণা দেয়। আর গত ২৮ এপ্রিল থেকে ইন্দোনেশিয়া পাম তেল রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানিও কমতে শুরু করে গত দুই মাসে। এরই প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যবসায়ীরাও দাম বাড়ানোর পক্ষে বারবার নিজেদের আবেদন জানিয়ে আসতেছিলেন। এর মধ্যে রোজার ঈদের আগে হঠাৎ করেই খুচরা বাজার থেকে সয়াবিন তেল উধাও হয়ে যায়, যদিও আমদানিতে কোনো সঙ্কট ছিল না। এবার ঈদের পর বৃহস্পতিবার (৫ মে) বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফাচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক বার্তায় ভোজ্যতেলের নতুন দর ঘোষণা করা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় ভোক্তা অধিদফতরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব তপনকান্তি ঘোষের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন নেতাদের বৈঠক হয়েছে। সেই বৈঠকেই ভোজ্যতেলের নতুন এই দাম নির্ধারিত হয়েছে।
লিটার প্রতি দর বেড়েছে ৪০ টাকা: নতুন মূল্য তালিকা অনুযায়ী, পরিশোধিত পাম সুপার তেল প্রতি লিটারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ১৭২ টাকা, যা এতদিন ছিল ১৩০ টাকা। সেই হিসাবে পাম তেলের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। আর সয়াবিনের দাম খুচরায় বেড়েছে ২৮ শতাংশ, বোতলজাতের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ। আমদানি থাকলেও খুচরা বাজারে সরবরাহ সঙ্কটের মধ্যে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৪০ টাকা বাড়িয়েছেন মিল মালিকরা। নতুন দর অনুযায়ী, খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০ টাকা, যা এতদিন ১৪০ টাকা ছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৯৮ টাকা করা হয়েছে। যার ফলে ৫ লিটারের বোতলের দাম হবে ৯৮৫ টাকা। প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৭ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেল ১৪৩ টাকা করে নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে মিল মালিকরা দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে মন্ত্রণালয়ে গেলেও সরকার সায় দেয়নি। গত মার্চের মাঝামাঝিতে তেলের আমদানি, পরিশোধন ও বিক্রয় পর্যায়ে ভ্যাট প্রত্যাহারের পর ঈদের আগে লিটারে ৭ টাকা করে দাম কমানো হয়েছিল। এই পরিস্থিতিতে এপ্রিল ও মে মাসে ধীরে ধীরে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিতে থাকেন মিল মালিকরা। দাম বৃদ্ধির আশায় ডিলার ও পাইকারি বিক্রেতারাও তেলের মজুদ শুরু করেন। এসব ঘটনা ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে ধরা পড়ে।

কীভাবে দর নিয়ন্ত্রণ করা যায় তা এখন অর্থনীতির এজেন্ডা: ভোজ্যতেলের এমন লাগামহীন দামে সাধারণ মানুষের অবস্থা শোচণীয় হবার উপক্রম। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই গভীর সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে তা নিয়ে দ্রুত ভাবনা প্রয়োজন। সমস্যাটিকে আড়ালে রাখার কোনও সুযোগ নেই। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য হয়। এর বাইরে সংসারের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হলো গ্যাস, বিদ্যুৎ ও রান্নার তেল। এই তিনটির দাম সব অঙ্ককে হার মানাচ্ছে। এই অবস্থায় গরিব-মধ্যবিত্ত বাঁচবে কীভাবে প্রশ্ন সেখানে। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, রান্নার গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রতিটি ক্ষেত্রে সদিচ্ছা থাকলে দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে জনগণকে সুরাহা দেওয়া যায় বলেই মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাই কীভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যায় সেটি এখন অর্থনীতির এজেন্ডা।
‘বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করতে হবে’: নীতি নির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান দামের মধ্যে সরকারের ভর্তুকির বোঝা ‘সহনীয় মাত্রায়’ নামিয়ে আনতে জরুরি সেবাসমূহ, যেমন- গ্যাস ও বিদ্যুতের ‘মূল্য সমন্বয়’ প্রয়োজন। তারা মনে করছেন, করোনার টিকা, বুস্টার ডোজের মতো জরুরি স্বাস্থ্যসেবা উপকরণ সংগ্রহ, কৃষকদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে চাল ক্রয় বৃদ্ধি, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ইত্যাদি কাজের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে এই ‘মূল্য সমন্বয়’ সাহায্য করবে। তেল নিয়ে যে তেলেসমাতি হয়েছে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, বাজার ব্যবস্থায় মনিটরিং আরও জোরদার করা দরকার, যাতে মানুষ বাজারে যে দামে আসে সেই দামের চেয়ে বহুগুণ বেশি টাকা দিতে না হয় এবং বাজারে যেন ইচ্ছাকৃত কোনও সংকট সৃষ্টি করা না হয়। মজুতদারি, পণ্য বন্দরে রেখে দেওয়া, স্থানীয় বাজারে ও সড়কে চাঁদাবাজি, পুলিশি হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতির মাধ্যমে দাম বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে পারলে কিছুটা হলেও কাজ হবে।
বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটেই নতুন সিদ্ধান্ত: মিল মালিকদের ভাষ্য, বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের নিয়মিত মূল্য প্রতিটন ১২০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০০ ডলারে উঠেছে। পরে সেটা কিছুটা কমে ১৬০০ ডলারে থিতু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই দেশের বাজারে তেলের দাম বাড়াতে হচ্ছে। টিকে গ্রুপের পরিচালক শফিউল আতহার তসলিম মূল্য বৃদ্ধির নতুন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ গণমাধ্যমকে বলেন, মিল মালিকরা বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে আলাপ করেই তেলের মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছেন। আগামীকাল (শুক্রবার) থেকে এই মূল্য কার্যকর হবে।

সয়াবিনের সঙ্কট বিশ্বব্যাপী: বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি তেলের বাজার পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে সেটা আমরাও বুঝতে পারছি। ইন্ডিয়ায় লিটার ২০৫ টাকা করেছে। ইংল্যান্ডে তেলের বিক্রি সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। জার্মানে আরও খারাপ অবস্থা। ব্রাজিল সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী, তারাও দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, বিশ্বব্যাপী সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এখন বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এখন দেখা যাক তারা কী করে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমরাও একটা যৌক্তিক দাম ঠিক করে দেওয়ার চিন্তা করছি।
সয়াবিন নিয়ে বিশ্ববাজার অস্থির কেন?: ভোজ্যতেলের বিশ্ববাজারে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। বিশ্ববাজারে আজ যে দরের রেকর্ড হচ্ছে, কাল তা রেকর্ডের পাতা থেকে মুছে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজার থেকে বুকিং করতে বেগ পেতে হচ্ছে এ দেশের আমদানিকারকদের। ইন্দোনেশিয়া পামতেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের দিন গত বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে সব রেকর্ড ভেঙেছে সয়াবিনের দর। আমেরিকায় পণ্য লেনদেনের বাজার তথা কমোডিটি এক্সচেঞ্জ শিকাগো বোর্ড অব ট্রেড বা সিবিওটিতে ওই দিন প্রতি টন সয়াবিন তেল লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৯৯৭ মার্কিন ডলারে। সেই হিসাবে লিটারপ্রতি দর দাঁড়ায় ১৫৭ টাকা। মে মাসে সরবরাহ হবে, এমন চুক্তিতে এই দরে লেনদেন চলছিল বিশ্ববাজারে। ইন্দোনেশিয়ার পামতেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর থেকে সয়াবিনের দাম টনপ্রতি ২০০ ডলার বেড়েছে। দাম বাড়লেও বিশ্ববাজারে ব্যবসায়ীদের মধ্যে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, ইন্দোনেশিয়ার নিষেধাজ্ঞা বেশি দিন থাকবে না। তাতে কমোডিটি এক্সচেঞ্জেও পণ্যটির দামে প্রভাব পড়ে। গুজবে গত সোমবার প্রতি টন সয়াবিন তেলের দর ১৭৪ ডলার কমে নেমে আসে ১ হাজার ৮২৩ ডলারে। অবশ্য গত মঙ্গলবার সিবিওটিতে সয়াবিনের দাম সামান্য বেড়ে ১ হাজার ৮৫৮ ডলারে ওঠে।

দাম বাড়িয়ে সিন্ডিকেটকারীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে: সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়ে সিন্ডিকেটকারীদের শাস্তির বদলে পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজ নামে একটি সংগঠন। বৃহস্পতিবার (৫ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ করেন সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ। বিবৃতিতে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঈদের আগে সয়াবিন তেল সরবরাহ না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করল আমদানি ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন করে মূল্যনির্ধারণ অর্থাৎ বাড়িয়ে দিয়ে তাদের পুরস্কৃত করল। সরকার জনগণকে স্বস্তি দিতে যেখানে আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে শুল্ক প্রত্যাহার করল সেই সুবিধা তো জনগণ পেল না।
এক সপ্তাহ পর্যবেক্ষণের পর নতুন সিদ্ধান্ত: মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেন বাণিজ্য সচিব তপন কান্তি ঘোষ। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, মিল মালিকরা আমাদেরকে জানিয়েছে। তারা কাল (শুক্রবার) থেকে কার্যকর করবে। দীর্ঘ দেড় মাস বাড়ানো হয়নি। এর মধ্যে দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাদের অনেক লস হচ্ছিল। লস হলে তো তারা মার্কেটে তেল দেবে না। আগামী সপ্তাহে আমরা হিসাব করে দেখবো, তারা সঠিকভাবে দাম বাড়ালো কি না? বাজারে তেল সঙ্কট সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা সরবরাহ সঙ্কটের জন্য নিয়মিত অ্যাকশন নিচ্ছি। অবৈধ মজুদের জন্য ভোক্তা অধিকার থেকে নিয়েমিত অভিযান করা হচ্ছে, জরিমানা করা হচ্ছে। আশা করছি, মূল্য সমন্বয়ের ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ইউডি/সুপ্ত

