মানবসত্তাকে জাগ্রত করার একমাত্র উপায় বই পড়া
আতোয়ারা আসমাউল তমা । শনিবার, ৭ মে ২০২২ । আপডেট ১০:০৫
বই মাত্র দুই বর্ণের একটি শব্দ। এই বই পড়লে মানুষের জ্ঞানের দ্যুতি বাড়ে। বই আপনসত্তাকে করে আলোকিত। যা সকল অনিয়ম আর অন্যায়কে মুছে দিতে শেখায়। আমাদের জীবসত্তা সদা জাগ্রত কিন্তু মানবসত্তা ঘুমন্ত। আর এই ঘুমান্ত মানবসত্তাকে জাগ্রত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে বই পড়া। বই এমন একটি বন্ধু যা কখনোই কোনো পরিস্থিতেই আপনাকে ধোঁকা দিবে না, মিথ্যের আশ্রয় নিবে না, একা করে দিবে না।
বই পড়ার উপকারিতা অনেক। যদি উদাহরণ দিতে বলা হয় তবে অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। যেমন- ভালো ঘুমাতে সাহায্য করে, আত্মসম্মান বোধ তৈরি করে, লেখনীশক্তি বৃদ্ধি, শব্দভাÐার বৃদ্ধি, স্মরণশক্তির বৃদ্ধি ঘটে, কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি করে, অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ, মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে, মানসিক উদ্দীপনা তৈরি করে, জ্ঞান বৃদ্ধি করে ইত্যাদি।
একটা সময় ছিল যখন দেখা যেত বাড়ির বড়রা অবসরে বই পড়তো। কেউ কেউ নিয়ম করে বই পড়তো। যা অন্যদের উৎসাহ বাড়িয়ে দিতো। কিন্তু বর্তমানে পরিবারের বড় সদস্যরা এতটাই ব্যস্ত যে দিনে কিংবা রাতের কোনো সময় তাদের হাতে বই দেখা যায় না। যার ফলে পরিবারের ছোট সদস্যরাও বই পড়ার দিকে কৌতুহলী না। সবাই বই ছেড়ে মোবাইল ফোনের গেমে আসক্ত। আচ্ছা ভাবুন তো আপনি বাসায় আরাম কেদারায় বসে কত সহজে একটা বই পড়ে জানতে পাচ্ছেন আমেরিকা, জাপান কিংবা জার্মানের উন্নত অস্ত্র বিদ্যা নিয়ে। বই মনের পরিধি বাড়ায়। বই পড়লে মানসিক, শারীরিক উন্নতি হয়, হতাশা দূরে সরে যায়, স্ট্রেস কমে যায়। হতাশা আর স্ট্রেস যদি জীবন থেকে সরে যায়, আয়ু তো বাড়বেই। বই পড়লে সৌজন্যবোধ তৈরী হয়। যা সবার কাছে নিজেকে আলাদা একজন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
বই পড়লে ডিমেনশিয়া এবং অ্যালঝেইমার্স নামের দুটি রোগ অনেক দূরে থাকে। ডিমেনশিয়া হল স্মৃতিভ্রংশ, উন্মাদ। অ্যালঝেইমার্স হল এক ধরনের বার্ধক্যজনিত স্নায়বিক অবক্ষয়মূলক রোগ। বই পড়া নিয়ে বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী দেখলে দেখা যায়, ওয়ারেন বাফেট তার পেশা জীবনের শুরুতে প্রতিদিন ৬০০-১০০০ পৃষ্ঠা নিয়মিত বই পড়তেন। বিল গেটস প্রতিবছর ৫০টি বই শেষ করেন। ইলন মাস্ক রকেট সায়েন্সের বিদ্যা বই পড়ার মাধ্যমেই অর্জন করেছেন। মার্ক কিউবান প্রতিদিন ৩ ঘণ্টার বেশি বই পড়েন। এত ব্যস্ত আর বিখ্যাত ব্যক্তিরা নিয়ম করে বই পড়েন, তবে আপনি কেন নয়?
বই মনোজগৎকে সমৃদ্ধ করে। আমাদের মন এবং ব্রেইন সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিচালিত হয়। মন অনেক সময় পরিচালিত হয় আমাদের সমাজের আশেপাশের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, কুসংস্কার ও আচার-আচরণ নিয়ে কিন্তু মেধা অর্থাৎ ব্রেইন সেটাকে যুক্তি চিন্তার মাধ্যমে পরিচালিত করে। যখন কেউ একটি বই পড়ে তখন তার ব্রেইন তার চিন্তার গতিময়তার মাধ্যমে তাকে চালিত করে ফলে মনোজগতের অন্ধকার, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে তাকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। যারা বই পড়ে না তাদের মধ্যে আমাদের সমাজের তথাকথিত অন্ধবিশ্বাস আজও জাগ্রত। এই যে আমাদের আশেপাশে এত অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো ঘটতে দেখা যায় যেমন, অষ্টম শ্রেণির মেয়ে পালিয়ে গেছে, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করেছে দশম শ্রেণির ছাত্র। এসব মূলত ঘটে তাদের যে আত্মা রয়েছে সেটা পুরোটাই অন্ধকারে নিমগ্ন। যার ফলে তারা কী করছে সঠিক বুঝতে পারে না। বই আত্মার এই অন্ধকারকে মুছে ফেলে। যে ছেলে-মেয়েগুলো দিনের বেশি সময় বইয়ের পাতায় আটকে থাকে তাদের মাঝে এধরনের ভাবনাও কাজ করে না। তাদের চিন্তা শক্তি বাকিদের থেকে অনেক উন্নত।
যারা বই পড়ে তারা সব সময় নতুন কিছু করার অঙ্গীকার করে। আমাদের পড়াশোনা করা ছেলে-মেয়েদের মাঝে এখন দুটো দল হয়ে গেছে একদল পড়াশোনা আর বইয়ের পাতায় নতুন কিছু করার উপায় খুঁজে কীভাবে দেশ জাতিকে এক ধাপ উপরে নেওয়া যায়। আর তারা এগিয়েও যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হল এই এগিয়ে যাওয়া ছেলে-মেয়ের সংখ্যাটা কম তাই ভালোর চেয়ে খারাপের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। আর একদল ওই খারাপের সংখ্যাটাকে সমর্থন করছে। নিজের, পরিবারের ও দেশের উপকারের জন্যই আমাদের বই পড়তে হবে, অন্যকে পড়তে উৎসাহী করতে হবে, জানতে হবে, জানাতে হবে।
লেখক- শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউডি/সুস্মিত

