অপরিকল্পিত পদক্ষেপ নষ্ট করছে হাওরের প্রকৃত চরিত্র
শামিম আহমেদ । শনিবার, ৭ মে ২০২২ । আপডেট ১০:৪৫
সাগর সংস্কৃত শব্দ, বিবর্তিত শব্দ সায়র। সায়র থেকে কালের বিবর্তনে হাওর শব্দের উৎপত্তি। আক্ষরিক অর্থে হাওর হচ্ছে এক বিস্তৃত জলমগ্ন কিংবা জলশূন্য ভূমি কিংবা নি্রজন জলাভূমি। যা মৌসুমে সাগরের মতো মনে হয় এবং কোনো মৌসুমে শুধু ফসলের মাঠ। বড় বড় হাওরে সূর্য উঠে ও অস্ত যায়। দেশে হাওর অধ্যুষিত জেলা সাতটি। উপমহাদেশের বৃহত্তর হাওর অঞ্চল হিসেবে উত্তর পূর্বাঞ্চলের এই এসব জেলা পরিচিত। প্রকৃতির বিশেষ আশির্বাদ রয়েছে এই অঞ্চল ঘিরে। সাত জেলায় ৪২৩টি ছোট বড় হাওর রয়েছে।
দেশের কৃষি ও মৎস্য অর্থনীতি, জীব বৈচিত্র্য-পরিবেশ রক্ষা, নৌ যোগাযোগসহ বিভিন্ন দিক থেকে আগের মতো হাওরের জেলাগুলো অবদান রাখতে পারছে না। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাওরের এই অঞ্চল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত, সমৃদ্ধ। স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি ছাড়াও ডেষে কম-বেশি উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে সবখানেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হাওরের প্রকৃত চরিত্র নষ্ট করছে। প্রকৃতিও এ অঞ্চলজুড়ে অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। অবদান রাখছে নৌ যোগাযোগেও। শীত মৌসুমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথি পাখি আসে হাওরে। জীব বৈচিত্রের দিক থেকেও এ অঞ্চল অনেক সমৃদ্ধ ছিল।
গত কয়েক বছর ধরে হাওর অধ্যুষিত সাত জেলা থেকে যেসব সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসছে তা সত্যিই উদ্বেগের। প্রকৃতির নিজ হাতে গড়া আশির্বাদের এ অঞ্চলে; এখন তেমন একটা ভালো খবর নেই। ভালো নেই হাওর, ভালো নেই মানুষও। হাওর ধ্বংসে প্রকৃতি আর মানুষে মিলে দুই ধরনের প্রতিযোগিতা চলে বছরজুড়ে। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে তাপমাত্রার পরিবর্তন, পলির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বিরূপ প্রভাব পরছে পুরো এলাকাজুড়ে। আরেকটি হলো দখল-দূষণ, অবাধে পশু-পাখি-মৎস্য শিকার, গাছকাটা, জীববৈচিত্র্য নষ্ট করা, অপরিকল্পিক বাঁধ নির্মাণ, ইচ্ছেমতো উন্নয়ন, হাওর ও নদীর খনন না করা, ইজারা প্রথা, মাছের অভয়ারণ্য নির্ধারণ করে তদারকি না করাসহ নানা কারণে বদলে যাচ্ছে হাওরগুলোর পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য। অনেকেই বলেন এখন হাওরে আর আগের মতো উত্তাল ঢেউ ওঠে না। পানির গভীরতা কমছে দিন দিন। সমুদ্রের মতো বিলাশ নীল জলরাশি দেখা এখন অনেকটাই ভাগ্যের। অর্থাৎ ইতোমধ্যে বিরূপ প্রভাব স্পষ্ট।
হাওরের বিশাল জায়গাজুড়ে রয়েছে জলজ বন। বিভিন্ন ধরনের জলজ ভাসমান উদ্ভিদ, শেকড়ধারী উদ্ভিদ, ওষুধি উদ্ভিদ ও অতিরিক্ত জলসহিষ্ণু উদ্ভিদও প্রচুর জন্মে। এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে রয়েছে হিজল, করচ, বরুণ, বনতুলসী, নলখাগড়া, পানিফল, হেলেঞ্চা, বলুয়া, চালিয়া প্রভৃতি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রজাতির নানা ওষুধিসহ বৈচিত্র্যপূর্ণ ছোট ছোট বিভিন্ন প্রজাতির জলজ গাছ। সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং গরু-মহিষের অবাধ বিচরণ ও হাওর-বনের গাছপালা কেটে নেওয়ায় ঝুঁকির মুখে পড়েছে বনের জীববৈচিত্র্যও।
পুরো হাওরাঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির শীতকালীন পরিযায়ী পাখিসহ ৫৫৮ প্রজাতির বন্যপ্রাণী শনাক্ত করা হয়েছে। এসব বন্যপ্রাণীর মধ্যে স্তন্যপায়ী, পাখি, উভচর ও সরীসৃপ উল্লেখযোগ্য। বন্যপ্রাণীর মধ্যে মেছোবাঘ, শিয়াল, গন্ধগোকুল এখন আর খুব একটা চোখে পড়ে না। বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল ও বড় আকারের গ্রে কিংস্টর্কসহ বালিহাঁস, লেঞ্জা হাঁস, বেগুনি কালেম, পাতি কুট, মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়ংহাস, পান্তামুখী, লালচেমাথা ভুতি হাঁস, লালশির, ডুবুরি, পানকৌড়ি, ডাহুক, সাদাবক, মাছরাঙা, বাংলা শকুন, সারস, শঙ্খচিলও কমছে। শুকনো মৌসুমে ছোট ছোট বনে শিকারীদের অত্যাচারে পাখির সংখ্যা কমেছে। এক হাজারেরও বেশি অমেরুদÐি প্রাণীর আবাস থাকলেও তা হ্রাস পাচ্ছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয় এমন কীটনাশকের ব্যবহার হাওর অঞ্চলে নিষিদ্ধ করতে হবে। জলাধার কোনো অবস্থাতেই ইজারা দেওয়া যাবে না। মাছের অভয়ারণ্য ঘোষণা করে তা যথাযথ সংরক্ষণ ও মাছের প্রজাতি ধ্বংস করে এমন জালগুলো নিষিদ্ধ করার বিকল্প নেই। দেশি প্রজাতির মাছ বাঁচাতে প্রয়োজনে গবেষণাগারে এসব মাছের ডিম ফুটিয়ে হাওরে ছাড়া উচিত। অবাধে গাছকাটা, বণ্যপ্রাণি, পাখ পাখালি ধরা বন্ধ করে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পানিতে উৎপাদন হয় এমন ধান চাষের গবেষণা জরুরি। প্রতি বর্ষায় আবারো আগের মতো প্রাণ ফিরে পাক হাওররাঞ্চল। বিশাল নীল জলারাশিতে উঠুক আগের ঢেউ।
লেখক- সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

