পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা

পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা

অদিতি ফাল্গু । বুধবার, ১১ মে ২০২২ । আপডেট ০৯:৩০

আমাদের এই সভ্যতার ইতিহাস মূলত পরিব্রাজক বা পর্যটকদের হাতে গড়া ইতিহাস। হিরোডোটাসের ইতিহাস গ্রন্থই বলুন অথবা হিউয়েন সাং, ফা-হিয়েন, মার্কো পোলো, ইবনে বতুতা বা আল-বেরুনীর মতো পরিব্রাজক বা ভূ-পর্যটকেরা সেই কত প্রাচীন যুগেই যখন এত আধুনিক যানবাহন কিছুই ছিল না, পদব্রজে অথবা মাসের পর মাস ক্যারাভানে দীর্ঘ ও প্রাণক্ষয়ী যাত্রায় এক দেশ থেকে আরেক দেশে গিয়ে জেনেছেন পৃথিবীর পরিচয়। এবং সেই পরিচয় জানিয়েছেন অন্যদেরও।

সত্যি বলতে, এই একবিংশ শতকে মানব সভ্যতা তার যাবতীয় সীমাবদ্ধতাসহ অর্থনীতি-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-পোশাক-রন্ধন-সঙ্গীত-স্থাপত্য-চিত্রকলাসহ এই তুঙ্গস্পর্শী মহিমা কখনোই অর্জন করতে পারত না যদি ‘ভ্রমণ’ বস্তুটি না থাকত।

মিশরের পিরামিড-স্ফিংকস-প্যাপিরাস, চীনের রেশমী কাপড় থেকে কনফুসিয়াস, গ্রিক দর্শন-বিজ্ঞান-সাহিত্য, দক্ষিণ আমেরিকার মায়া বা ইনকা থেকে সমরকন্দের মঙ্গোলীয় মান-মন্দির, ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান, সুমেরীয়-ভারতীয়-পার্সি মহাকাব্য গিলগামেশ-রামায়ণ-মহাভারত-শাহনামেহ, পার্সেপোলিস থেকে মহেঞ্জোদারো অথবা আমাদের আজকের রান্নাঘরে মোগলাই পোলাও নামের খাবারটি পর্যন্ত যে সেই তাজিকিস্তান-উজবেকিস্তান হয়ে আসা…এসবই সম্ভব হয়েছে একমাত্র আন্তঃমহাদেশীয় ভ্রমণের মাধ্যমে। রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’ থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানযাত্রী’ বা বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এর মতো পৃথিবীর যাবতীয় ভ্রমণ সাহিত্যের পাঠও পাঠকের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে প্রবলভাবে সক্ষম।

অথচ গভীর দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এটিই যে, স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৫০ বছরের ইতিহাসে আমরা আজ পর্যন্ত একটি নিরাপদ, পর্যটকবান্ধব ও নারীর প্রতি সমতাপূর্ণ একটি পর্যটন শিল্পের অবকাঠামো আজও গড়ে তুলতে সক্ষম হলাম না। হ্যাঁ, হয়তো ছোট একটি দেশ আমাদের।
এমনিক প্রতিবেশী ভারতের মতো হিমাচল বা অরুণাচল থেকে রাজস্থান বা কাশ্মীর অবধি মরুভূমি, তুষারাচ্ছন্ন পর্বত থেকে নদীমাতৃক সমভূমি ও আর্যাবর্ত বা উত্তরাপথ থেকে দাক্ষিণাত্য অবধি নানা প্রাসাদ-সৌধ-মন্দির-মসজিদসহ বিচিত্র স্থাপত্যের সম্ভার নেই আমাদের। কিন্তু যা আছে বা ছিল সেটুকু সাজিয়ে-গুছিয়েও কিন্তু পর্যটন শিল্পকে আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে গড়ে তোলা যেত।

কক্সবাজারের ৯৬ মাইল বা ১৫৫ কি.মি. ব্যাপ্ত পরিসরে অতি দীর্ঘ ও অভগ্ন সমুদ্র সৈকত, সিলেটের চা বাগান-জাফলং থেকে শুরু করে খাসিয়া-মণিপুরী নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে উত্তর বাংলা বা নদীমাতৃক বরিশাল…প্রকৃতি এই ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইলের দেশকে কম তো দেয়নি।
অথচ, একাধিকবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বিদেশি পর্যটক বিশেষত, নারী পর্যটক হেনস্থা বা আক্রান্ত হওয়ার কথা যদি বাদই দিই, এবার ঈদের ছুটিতে সিলেটের জাফলংয়ে পর্যটকদের উপর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের হামলা বা প্রহারের ভিডিও ইতিমধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এবং জাফলংয়ের পরপরই নাটোরেও এমনটি ঘটেছে বলে খবর এসেছে।

এরা কিন্তু বহিরাগত বা বিদেশি পর্যটকও নন। বাংলাদেশেরই সাধারণ নর-নারী। এমনটাও নয় যে কোনো বিদেশিনীর ভিন্ন ধাঁচের পোশাকে বহির্পৃথিবী চোখে না দেখা কতিপয় বাংলাদেশি যুবক অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে।

একাধিকবার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বিদেশি পর্যটক বিশেষত, নারী পর্যটক হেনস্থা বা আক্রান্ত হওয়ার কথা যদি বাদই দিই, এবার ঈদের ছুটিতে সিলেটের জাফলংয়ে পর্যটকদের উপর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের হামলা বা প্রহারের ভিডিও ইতিমধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ঈদের দিনগুলোতে প্রবেশ টিকিট বিক্রি ও ছবি তোলার নামে স্বেচ্ছাসেবক নামধারী কতিপয় যুবক পর্যটকদের সঙ্গে চাঁদাবাজি করছিলেন। একটি ছবি তুলে তারা পর্যটকদের জিম্মি করে ১ হাজার থেকে ১৫০০ টাকা দাবি করেন।

এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে পর্যটক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকায় থাকা কতিপয় যুবক পর্যটকদের ওপর বেপরোয়া হয়ে হামলা চালান। তারা বাঁশের লাঠি দিয়ে পর্যটকদের পেটাতে থাকেন। এ সময় তরুণীরা তাদের সঙ্গীদের বাঁচাতে এগিয়ে গেলে তাদেরও মারধর, হেনস্তা করা হয়। স্থানীয়রা ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলেও কেউ এগিয়ে আসেননি।’কোভিডের দু’বছরে পর্যটনে আয় কমে যাওয়ার কারণে ইতিমধ্যে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে বিপুল ধস নেমেছে। থাইল্যান্ড থেকে কিউবা অবধি নানা দেশেই পর্যটন রাষ্ট্রীয় আয়ের একটি বড় খাত।

লেখক-কথাসাহিত্যিক

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading