পারিবারিক সুশিক্ষা যেন হারিয়ে না যায়
মুনতাসির হোসেন মিহান । বৃহস্পতিবার, ১২ মে ২০২২ । আপডেট ১০:১৫
জন্ম থেকে মৃত্যু এই সময়কালকে সামাজিকরণ প্রক্রিয়া নামে আখ্যায়িত করা হয়। সামাজিকরণ প্রক্রিয়ার প্রথম ও প্রধান ধাপ হচ্ছে পরিবার। পরিবার সামাজিকরণ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। সমাজে স্বীকৃত বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর একত্রে বসবাস করাকে পরিবার বলে। অর্থাৎ বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে এক বা একাধিক পুরুষ ও নারী, তাদের সন্তানাদি, পিতামাতা এবং অন্যান্য পরিজন নিয়ে যে সংগঠন গড়ে ওঠে- তাকে পরিবার বলে। কিন্তু ব্যাপক অর্থে পরিবারের মর্যাদা, মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব বিশাল। জন্মের পর একটি শিশু স্বাভাবিক শিক্ষা পায় পরিবার থেকে। একজন মানুষের সামাজিক আচরণ ও বিকাশ ঘটে পারিবারিক শিক্ষা থেকে। একজন মানুষ পরিবার থেকে বিভিন্ন শিক্ষা লাভ করে। যেমন: কথাবার্তা, আচার-আচরণ, বেশভূষা, বড়দের শ্রদ্ধা, বয়স্ক ব্যক্তিদের সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাবের মাধ্যমে যখন ফুটে ওঠে তখন তা আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, পেশাগতভাবে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।
পারিবারিক রীতিনীতি, আচরণ, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়গুলো একজন মানুষকে সামাজিকভাবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। পারিবারিক শিক্ষা হচ্ছে আদর্শ ও মূল্যবোধ তৈরির প্রধানতম উপকরণ। সদ্য বাড়ন্ত শৈশব থেকে কৈশোর, যৌবন পেরিয়ে বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হওয়ার পাশাপাশি একজন মানুষের পারিবারিক শিক্ষা সুদৃঢ় হয়। পারিবারিক শিক্ষার প্রতি আত্মনিবেদন ও তা লালন করলে একজন মানুষ সামাজিকভাবে সমাজ বা সম্প্রদায়ের মধ্যে যেমন গ্রহণযোগ্য হয়, তেমনি পেশাগতক্ষেত্রেও তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।
আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামো ব্যবস্থাপনায় পরিবারিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। পারিবারিক শিক্ষা এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা , যে শিক্ষার গুরুত্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চাইতেও অনেক বেশি। একজন মানুষের পরিপূর্ণ যাপিত জীবন তৈরি হয় পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে। সেগুলো হচ্ছে জৈবিক, অর্থনৈতিক, চিত্ত বিনোদন, শিক্ষামূলক, মনস্তাত্ত্বিকমূলক ইত্যাদি। একজন মানুষ তার পরিবার থেকে এই পারিবারিক কার্যাবলীগুলো শেখা ও জানার মাধ্যমে নিজের মধ্যে আত্মস্থ করতে পারে। তার এই পারিবারিক শিক্ষার সার্বিক প্রয়োগ করা হয় সামাজিক ও পেশাদারি ক্ষেত্রে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জীবনযাত্রায় পারিবারিক শিক্ষা অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমেই একটি পরিবার থেকে তৈরি হয় ন্যায় আদর্শ এবং মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ। জন্মের পর আমাদের সামাজিক পরিচয় তৈরি হয় পারিবারিক শিক্ষা থেকে। পারিবারিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংগঠনগুলো আরো শক্তিশালী হয়। পারিবারিক শিক্ষা আমাদের মেধা-মননে বিকাশ ও মস্তিষ্ককে কর্মক্ষম করে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পারিবারিক শিক্ষার এত তাতপর্য-কদর-সেই পারিবারিক শিক্ষা আধুনিকতা ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারের ফলে এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি বছর ঢাকা শহরে ৬ লাখ ১২ হাজার মানুষ যুক্ত হয়, যা দিনে ১ হাজার ৭০০। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হবে। ফলে এক সময় দেখা যাবে যে , গ্রাম থেকে সিংহভাগ ক্ষুদ্র পরিবার তাদের জীবন অন্বেষণে শহরকে প্রাধান্য দিয়ে রাজধানীতে বসতি স্থাপন করবে। এতে গ্রামীণ পরিবারের উন্নয়ন ও বিকাশ দারুণ ভাবে ব্যাহত হবে। তাই, এমতাবস্থায় আমাদের সবার পরিপূর্ণ উন্নত জীবনযাত্রা তৈরির পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষার প্রতি শতভাগ নিবেদন এবং তা ধারণের দিকে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। পরিবারিক স্বাভাবিক উপাদানগুলো নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের জন্য চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের কর্মকাণ্ড চালু করতে হবে। এতে পারিবারিক কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ গঠনগত পরিবর্তন সাধিত হবে।
লেখক- শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
ইউডি/সুস্মিত

