ইন্ডিয়ায় গ্রেপ্তার পি কে হালদার: দেশে ফিরিয়ে দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ১২:০০
এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর হাজার কোটি টাকা লোপাট মামলার মূল অভিযুক্ত ও পলাতক আসামি প্রশান্ত কুমার হালদারকে (পি কে হালদার) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছদ্ম নামে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেছিলেন বাংলাদেশের আলোচিত এই পলাতক আসামি। শনিবার (১৪ মে) ইন্ডিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এক অভিযানের মাধ্যমে ইন্ডিয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও দুদকের অনুরোধে ওই অভিযানটি পরিচালনা করা হয়। বিস্তারিত লিখেছেন আবদুল্লাহ সিফাত
হাজার কোটি টাকা পাচারকারী পি কে হালদার নাম পাল্টে ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে বসবাস করতেন। অথচ এতো কাছে থেকেও তার হদিস মিলছিলো না দেশের কোনো গোয়েন্দা সংস্থাদের কাছে। গত শুক্রবার আচমকা খবর মেলে ইন্ডিয়াতে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন পিকে হালদার। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। শুক্রবার দিনভর কলকাতা ও উত্তর ২৪ পরগনার অন্তত ৯টি স্থানে অভিযান চালায় ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। সেসময় উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার পোলেরহাটে দু’টি বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গায় পি কে হালদারের ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার অবৈধ সম্পত্তির খোঁজে অভিযান শুরু করে দেশটির এই সংস্থা। কর্মকর্তারা বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এই তল্লাশি অভিযান পরিচালনা করেন। শনিবার পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা পি কে হালদারসহ মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলাবাহিনী।
আচমকা অভিযানের নেপথ্যে কী?
ইডির এক কর্মকর্তা বলেন, শুধু কাগজে-কলমেই আছে যে আসামিরা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ পুলিশের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে জানায়, যারা পরবর্তীতে ইন্ডিয়ান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে শুক্রবার ইন্ডিয়ার সরকারের কাছে পিকে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
দ্রুত দেশে ফিরিয়ে বিচারের আওতায় আনা হোক
বিশ্লেষকরা বলছেন, পিকে হালদার গ্রেপ্তার হয়েছে এটা যেমন স্বস্তির সংবাদ আবার এখন তাকে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হবে। দেশে এনে তার বিরুদ্ধে করা অসংখ্য মামলার দ্রুত বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা আসামিরা সহজেই ধরাছোয়ার বাইরে থাকবে এটা হতে পারে না। তাকে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে যেনো এই ধরণের কর্মকাø ভবিষ্যতে কেউ না করে এবং এমন কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ যেন আর না দেখে।

আনুষ্ঠানিক ভাবে জানালে পরবর্তী পদক্ষেপ
পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতার দেশের পিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন। শনিবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পিকে হালদার গ্রেফতার হওয়ার বিষয়ে আমরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানি না। তবে জানামাত্র তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা নিয়ে দুদক কাজ করছে।অনেকে নামে-বেনামে দেশ থেকে টাকা পাচার করছে। তারা দেশের শত্রু। তাদের ধরে নিয়ে আসা ভালো। পিকে হালেদারের মতো ধরে নিয়ে আসার দুই-একটি দৃষ্টান্ত হলে তা আরও ভালো হবে।

ইন্ডিয়া থেকে পি কে হালদারকে ফেরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, যেহেতু এ দেশে তার বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাকে আমরা নিয়ে আসব। তবে পি কে হালদার আটক হওয়ার কোনো খবর ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্যে, আনুষ্ঠানিকভাবে জানলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
পিকে হালদারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মামলাকারী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান শনিবার গণমাধ্যমকে বলেন, তারা পি কে হালদারের আটক হওয়ার খবরটি পেয়েছেন। তিনি বলেন, তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছি, বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও। দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ বলেন, আমরা জানতে পেরেছি যে পি কে হালদারকে পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
‘মিউচুয়াল ট্রিটি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে’
পি কে হালদারকে ফেরানোর প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো স্পেসিফিক আইনে সে গ্রেপ্তার হলে তাকে সেই আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হবে (ইন্ডিয়ায়), অথবা আমাদের সঙ্গে যে ইন্ডিয়ার মিউচুয়াল ট্রিটি বা বহিঃসমর্পণ চুক্তি আছে, সেই চুক্তির চুক্তির আওতায় তাকে বাংলাদেশে সমর্পণ করা হবে।
বাংলাদেশে ফেরত আনার পরের প্রক্রিয়া নিয়ে দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ বলেন, সমর্পণ করা হলে তাকে (পি কে হাওলদার) আদালতে উঠানো হবে। তখন দুদকের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে। আদালত তার আইন অনুযায়ী নিজস্ব যে অর্ডার দেবে দুদক সেই মোতাবেক কাজ করবে। তিনি জানান, পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে ডে ৩ ডজন মামলা আছে, প্রত্যেকটিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। সে ধরা পড়েছে, এটা আমাদের জন্য বিশেষ সুখবর। কারণ ইনভেস্টেগেশনের জন্য যেসব পেনডিং আছে, সেগুলো অনেক সহজতর হয়ে যাবে এই কারণে যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের একটা সুযোগ তৈরি হল।

ইন্ডিয়াতে মিলেছে ২০-২৫টি বাড়ির মালিকানার তথ্য
শনিবার পি কে হালদারের সম্পত্তির খোঁজে দ্বিতীয় দফায় আবারও অভিযান শুরু করে দেশটির আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত মুম্বাই এবং রাজধানী দিল্লিতেও অভিযান চালায় সে দেশের কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তকারী সংস্থা-ইডি। ইডি বলেছে, ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার সহায়তায় পি কে হালদার পশ্চিমবঙ্গসহ সে দেশের একাধিক রাজ্যে বিপুল সম্পদ করেছেন। বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে অর্থপাচারের মাধ্যমে ইন্ডিয়ায় একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে খোঁজ পেয়েছে ইডি। দেশটির কেন্দ্রীয় এই তদন্ত সংস্থা বলছে, তারা ইতোমধ্যে পি কে হালদারের কাছ থেকে বেশ কিছু নথি উদ্ধার করেছেন। এসব নথিতে প্রাথমিকভাবে ইন্ডিয়াতে তার ২০ থেকে ২৫টির মতো বাড়ির মালিকানার তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশের পিকে ইন্ডিয়াতে হলেন শিব শঙ্কর
এক বিবৃতিতে ইডি বলেছে, প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) নিজেকে শিব শঙ্কর হালদার নামে ইন্ডিয়ার নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতেন। বাংলাদেশি এই অর্থপাচারকারী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য থেকে সে দেশের রেশন কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড, প্যান এবং আধার কার্ডও সংগ্রহ করেছিলেন। প্রশান্ত কুমার হালদারের অন্য সহযোগীরাও এসব কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে সংগ্রহ করেন। দেশটির প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশি এই নাগরিকরা প্রতারণার মাধ্যমে ইন্ডিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসায়িক কোম্পানি চালু করেন। কোম্পানি পরিচালনার পাশাপাশি কলকাতা মেট্রোপলিটন এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পি কে হালদারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ব্যক্তিগত আইনজীবী সুকুমার মৃধার অন্তত তিনটি বাড়ি রয়েছে অশোকনগরে। এই এলাকায় তিনি মাছ ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।

পি কে হালদারের অর্থ-আত্মসাতের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা
২০১৯ সালে দেশে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের সময় পিকে হালদার স্পটলাইটে আসেন। তিনি এবং তার সহযোগীরা ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান- পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স এবং রিলায়েন্স ফাইন্যান্স থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। এই ৪টি প্রতিষ্ঠান তখন থেকে ভয়াবহ সংকটে আছে এবং এদের মধ্যে পিএলএফএস এখন লিকুইডেশনের প্রক্রিয়ায় আছে। এই ৩টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জমা দেওয়া তহবিল পুনরুদ্ধার করতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। এখন পর্যন্ত পিকে হালদারের সঙ্গে সম্পর্কিত ৮৩টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২৭৫ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করে। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পলাতক পি কে হালদার তার নামে অবৈধ উপায়ে এবং ভুয়া কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে প্রায় ৪২৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। অবৈধ সম্পদের অবস্থান গোপন করতে ১৭৮টি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করেন পি কে হালদার। তিনি এসব অ্যাকাউন্টে ৬ হাজার ৮০ কোটি টাকা জমা রাখেন। পাশাপাশি এসব অ্যাকাউন্ট থেকে তার নামে ও বেনামে আরও ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা উত্তোলন করেন। দুদকের তথ্য বলছে, পি কে হালদার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ১১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
ইউডি/সুস্মিত

