পাঠ্যাভাস কি আসলেই কমে যাচ্ছে?

পাঠ্যাভাস কি আসলেই কমে যাচ্ছে?

সালাহ্উদ্দিন নাগরী । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ১২:১৫

সারা পৃথিবীতেই বই পড়া মানুষের সংখ্যা কমছে। কয়েক বছর আগে বুকার পুরস্কারজয়ী ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসন বলেছিলেন, ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে জানবে না।’ বর্তমান সভ্যতার পীঠস্থান ইউরোপ-আমেরিকায় আগে মানুষ বাস, ট্রেন, প্লেন ও স্টিমারযাত্রায় যেভাবে বই, পত্রপত্রিকা পড়ত, এখন তেমনটি আর দেখা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে যত না সোনাদানা নিয়েছিল, এর চেয়ে বেশি নিয়ে গিয়েছিল বইপুস্তক। আমাদের ছাত্রাবস্থায় অবসর কাটানো ও বিনোদনের অন্যতম উপায় ছিল বই, পত্রপত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়া।

মনে আছে, ভাইবোনরা যখন একত্রে বড় হয়েছি, তখন বাসায় খবরের কাগজ আসত দুপুরের দিকে, আর হকারের কাছ থেকে কে আগে তা ছিনিয়ে নেবে, সেজন্য ভাইবোনদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত এবং গোসল ও খাওয়াদাওয়ার পর আরাম করে পড়ার জন্য সেটি লুকিয়েও রাখা হতো। এ যুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এখন কি খবরের কাগজ নিয়ে সেই উন্মাদনা আছে?

কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমির বইমেলায় বই বিক্রির ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ আমাদের দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন, কিন্তু বাস্তব অবস্থা তেমন নয়। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্বল্প সময়ের বই বিক্রির এ প্রবণতাকে ভিত্তি করে সারা দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করা যায় না। আসলে সারা পৃথিবীতেই বইপড়ুয়াদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। আর এর কারণ হিসাবে প্রথম তিরটি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে স্মার্ট ডিভাইসের দিকে।

বাংলাদেশে কিছুদিন আগে কিছু শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি জরিপের ফল বলছে, ৬২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অবসরে ফেসবুক চ্যাট করে। ৭৭ শতাংশ বই পড়ার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটাতে বা ইউটিউবে মুভি দেখতে বেশি পছন্দ করে। মাত্র ৬ শতাংশ ফেসবুকে থাকার চেয়ে বই পড়তে পছন্দ করে। ৩৩ শতাংশ দিনে একটাও বই পড়ে না।

আমেরিকার এক জরিপে দেখা যায়, ১৫-২০ বছর আগে শিক্ষার্থীরা যতটুকু সময় বই পড়ত, বর্তমানে তা ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেওয়া। আর যুক্তরাজ্যের মানুষের বছরব্যাপী বই পড়াকে দিনের হিসাবে নিয়ে এলে তো ১ ঘণ্টাও ভাগে পড়ে না। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা থেকে মোটামুটি এটা নিশ্চিত যে, সারা পৃথিবীতেই বই পড়ার হার কমছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আপডেট থাকার জন্য তাকে অন্য কোনো মাধ্যমের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে না। এক স্মার্টফোনেই সব পাঠ চুকে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীর লাইব্রেরিগুলোয় যত বিখ্যাত, দুষ্প্রাপ্য বইপুস্তক, ম্যাগাজিন আছে, সেগুলোয় ঘরে বসেই ঢু মারা ও ডাউনলোড করা যাচ্ছে।

আগে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা গোয়েন্দা কাহিনি, রহস্য উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশনের বই খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়ত। এখন তারা ওগুলো পড়ার চেয়ে দেখতে, ইউটিউবে কার্টুন বা মুভিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ১৮০ টাকা বিল পরিশোধ করে সারা মাস নেটফ্লিক্সের সেবা গ্রহণ করছে। এতে বই পড়ার আগ্রহ কিছু হলেও তো কমছে।

আমরা বই কিনি, বই পড়িও; কিন্তু বইয়ের নির্যাসটুকু মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে ধারণ করি না। তাই বই পড়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। প্রতিদিনই শিক্ষিত মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে বিবেকবান, পরিশুদ্ধ মানুষের সংখ্যা কি বেড়েছে? অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে শুদ্ধ, বিবেকবান, দুর্নীতিমুক্ত, সৎ ও নির্ভীক মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে হবে।

নিজের, পরিবারের এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। হার্ডকপি বই বা ই-বই বা অনলাইন পেপার, পত্রপত্রিকা যা-ই পড়া হোক না কেন, এর ভালোটুকু অন্তরে ধারণ করতে হবে। মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে, আর তা যদি করা না যায়, তাহলে বই পড়া কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ভিন্ন কোনো অর্থ বহন করবে না। বই পড়ে যদি মানুষ হিসাবেই গড়ে ওঠা না যায়, তাহলে সে জ্ঞান আহরণের কোনো মূল্য নেই।

লেখক: সরকারি চাকরিজীবী

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading