ঈদে ট্রাকে ডিজে পার্টির অপসংস্কৃতি বন্ধ করা জরুরী
আশিকুর রহমান । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ১২:২৫
ঐতিহ্যের দিক থেকে ঈদের আনন্দ হবে সামাজিক আর মার্জিত। অথচ কিছু তরুণ ঈদের আনন্দকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করছে। যেটা সম্পূর্ণ অপসংস্কৃতির উৎসব। খোলা ট্রাকে গাদাগাদি করে উদ্দাম নৃত্য, উচ্চ শব্দে বাজানো হচ্ছে গান, চলছে ডিজে পার্টি। রাস্তাঘাটে মেয়েদের দেখলে বাজে মন্তব্য ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি। অসভ্যতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অল্পবয়সী ছেলেরা এভাবেই পাড়া দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইদানীংকালে ঈদ আনন্দে যুক্ত হয়েছে নতুন এই আপদ! তাছাড়া এভাবে খোলা ট্রাকে নাচানাচি করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়টিও মাথায় নেই কারো। গত কয়েক বছর ধরেই ঈদের দিন থেকে শুরু করে দুই/তিন দিন পর্যন্ত উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে সারা দেশেই ডিজে পার্টি করছে অল্পবয়সী ছেলেরা। এতে সৃষ্টি হচ্ছে শব্দ দূষন। এ নিয়ে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা।
শব্দ দূষণ চোখে দেখা যায় না বলে এর ক্ষতিকর বিষয়টি আমরা উপেক্ষা করি। অথচ শব্দ দূষণ মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের নখ পর্যন্ত শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি করে। মাত্রাতিরিক্ত শব্দ শুধুমাত্র মানবজীবনেই নয়, জীববৈচিত্র্যের জন্যও ক্ষতিকর। সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি শব্দ দূষণের কবলে রয়েছে সারাদেশ। বর্তমানে শব্দ দূষণ একটি মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিশেষ করে শব্দ দূষণের কারণে নতুন প্রজন্ম মানসিক ও শারীরিকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শব্দ দূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হ্রাস, বধিরতা, হৃদরোগ, খিটখিটে মেজাজ, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হওয়া, ঘুমের ব্যাঘাতসহ নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান এবং পবার সম্পাদক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হৃদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহে রক্তচাপ ও হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেয়। মাংসপেশীর সংকোচন করে এবং পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়।
বাংলাদেশে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোন এলাকায়, দিনের কোন সময়ে, কোন ধরনের শব্দ দূষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। এই বিধিমালার ৯ ধারায় উচ্চস্বরে গান বাজানোসহ বিভিন্ন ধরনের শব্দ দূষণের বিষয়ে বলা আছে। বিধিমালায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পেয়ে আবাসিক এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আবাসিক এলাকায় দিনের বেলায় ৫৫ ডেসিবেল ও রাতের বেলায় ৪৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ অতিক্রম করতে পারবে না।
এ আইনের ১৮ ধারায় আরো বলা আছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবাসিক এলাকায় শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যন্ত্র বাজালে বা আইন অমান্য করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা এবং এক মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া পরে একই ধরনের অপরাধ করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৬ মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আবুল হাসেম বলেন, সড়কে ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে লোকজন বহন করাই নিষিদ্ধ। ঈদের সময় অনেককে বিনোদনের নামে ট্রাক/পিকআপ ভ্যান নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে কয়েকটি পিকআপ ও আটক করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, আমাদের আনন্দে অন্যের ক্ষতি হবে- এমন আনন্দ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং এ জন্য সামাজিক আন্দোলন করতে হবে। সড়কে দুর্ঘটনারোধে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সামনের ঈদেগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের চেকপোস্ট থাকবে। সড়কে পুলিশি টহল অব্যাহত থাকবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় কঠোর নজরদারিতে থাকবে।
এবারের ঈদে পিকআপ ভ্যানভর্তি তরুণদের আটক করার কিছু খবর এসেছে গণমাধ্যমে। তাদের মধ্যে কিছু হল- লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে ৯ পিকআপ ভ্যানভর্তি তরুণদের আটক করা হয়েছে। এ সময় সড়ক পরিবহন আইন অমান্য করায় পিকআপ চালকদের ২১ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মৌখিকভাবে সতর্ক করে পিকআপে থাকা ১৩৮ জন তরুণকে ছেড়ে দেওয়া হয়। দিনাজপুরের বিরামপুরে ২৬ চালককে ৩৪ হাজার ৫৫০ টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভোলা সদরে ১টি পিকআপ গাড়ি আটক করে ভোলা সদর মডেল থানা। অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ায় পিক-আপে থাকা ২৫ কিশোরকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঈদ আনন্দের নামে এই অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ঈদ একটি ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান। তাই এর আনন্দ হবে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে। এছাড়া আমাদের ঈদ আনন্দকে সামাজিক ও দৃষ্টি সুন্দর করতে হবে। এ জন্য পারিবারিক ও সামজিক সচেতনতা জরুরী।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
ইউডি/অনিক

