শচীন টেন্ডুলকার: যেভাবে মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে ক্রিকেট ঈশ্বর হলেন
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৫ মে ২০২২ । আপডেট ১২:৩০
যদি প্রশ্ন করা হয়, পৃথিবীর সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড় কে? তাহলে সকলে এক বাক্যে উত্তর দেবে শচীন টেন্ডুলকার। অনেকে বলে থাকেন, ধারাবাহিকতায় শচীন ডন ব্রাডম্যানকেও ছাড়িয়ে গেছেন। এমনকি ডন এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “আমার দেখা ক্রিকেট খেলোয়াড়দের মধ্যে শচীন সর্বোত্তম।” টেস্ট এবং একদিনের ম্যাচ মিলিয়ে ১০০টি সেঞ্চুরির রেকর্ড আছে শচীনের, যা অবিস্মরণীয়। বিশ্বনন্দিত ভারতরত্ন ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকারের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
শচীনকে বলা হয় ক্রিকেট ঈশ্বর। ক্রিকেট জগতের জীবন্ত কিংবদন্তী মহানায়ক শচীন টেন্ডুলকারের অনেক খেলা দেখতে না পারার আফসোস অনেক ক্রিকেট প্রেমিকই করে থাকেন। টেস্ট এবং একদিনের ক্রিকেট আজও শচীন জ্বরে আক্রান্ত।
সংক্ষেপে শচীন টেন্ডুলকার
তার পুরো নাম শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। তিনি একজন প্রাক্তন ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার। তাকে বলা হয় লিটল মাষ্টার। তার মত ভক্তকুল অন্য কোন ক্রিকেটারের আছে বলে মনে হয় না। শচীন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বোচ্চ মানের ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তার মাত্র ষোলো বছর বয়সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় এবং এরপর থেকে প্রায় চব্বিশ বছর তিনি আন্তর্জাতিক স্তরে ইন্ডিয়ার হয়ে ক্রিকেট খেলেন। শচীন টেন্ডুলকার টেস্ট ক্রিকেট ও একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলায় সর্বোচ্চ সংখ্যক শতকের অধিকারীসহ বেশ কিছু বিশ্ব রেকর্ড ধারণ করে আছেন। ইন্ডিয়ার হয়ে বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডও আছে তার।
দুরন্তপনায় রাঙানো ছিল শৈশব
শচীন টেন্ডুলকারের জন্ম হয়েছিল মুম্বাইতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল। তার পিতার নাম রমেশ টেন্ডুলকার ও মাতার নাম রজনী টেন্ডুলকার। ছোটোবেলায় শচীন ছিলেন খুব দুরস্ত। শচীন, অবিনাশ আর সুনীল ছিলেন তিন বন্ধু। তিন জন আমগাছে চড়ে মজা করতেন। বয়স্ক লোকেদের নজরে পড়ে গেলে ছুটে পালিয়ে যেতেন।
গরমের ছুটিতে তিনমূর্তি সারাদিন শুধু খেলে বেড়াতেন। কখনো ক্রিকেট, কখনো লুকোচুরি, আবার কখনো সাইকেল ভাড়া নিয়ে এখানে সেখানে যাওয়া। কোনো ব্যাপারেই বিন্দুমাত্র ক্লান্তি ছিল না সেদিনের বালক শচীনের। প্রত্যেক খেলায় শচীন নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখতেন।
প্রারম্ভিক খেলোয়াড় জীবন ও সুনীল গাভাসকারের স্বান্তনা
শচীনের জীবনের চলার পথে অনেক বাধা বিপত্তি এসেছে। তবে শচীন কিন্তু ভেঙে পড়েননি। সেবার সারদা আশ্রমের হয়ে স্কুল ক্রিকেটে দারুণ খেলেছিলেন শচীন। ভেবেছিলেন বর্ষসেরা জুনিয়ার ক্রিকেটারের সম্মান পাবেন। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এই সম্মান শচীন পাননি৷ তেরো বছর বয়সী সেই কিশোরের মানসিক যন্ত্রণার কথা বুঝতে পেরেছিলেন বিখ্যাত ক্রিকেটার সুনীল গাভাসকার।
তিনি একটি চিঠিতে বলেছিলেন, “গত মৌসুমে দারুণ খেলার জন্য অভিনন্দন। অন্যরা যখন খেলতে পারেনি, তখনও তুমি একাই চমৎকার খেলে গিয়েছ। এভাবেই চালিয়ে যাও। মুম্বাই ক্রিকেট সংস্থার কাছ থেকে সেরা জুনিয়ার ক্রিকেটারের পুরস্কার পাওনি বলে হতাশ হয়ো না। তুমি যদি ওই সম্মান প্রাপকদের তালিকায় চোখ বোলাও, দেখবে, সেখানে এমন একজনের নাম নেই, যে টেস্ট ক্রিকেটে খুব একটা খারাপ খেলেনি!”
মুম্বাই রাজ্য দলে যোগদান
চোদ্দো বছরের কিশোর শচীন টেন্ডুলকার প্রথম বোম্বাই রাজ্য দলে সুযোগ পান। গুজরাটের বিরুদ্ধে প্রথম রঞ্জি ট্রফির আসরে প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ছিলেন শচীন। তারপর ব্যাট হাতে শুরু হল তার বিশ্ব শাসনের পালা।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পন
গাভাসকার হয়তো নিজের জীবনের কথা মনে করেছিলেন। ১৯৮৭ সালের ৩ আগস্ট বিশ্ববন্দিত ক্রিকেটার গাভাসকারের কাছ থেকে এই চিঠি পেয়ে শচীন আবার উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠেন। দু’বছরের মধ্যেই সর্বকনিষ্ঠ ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার হিসাবে টেস্ট দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। আর এক ক্রিকেট ব্যক্তিত্বকে শচীন খুবই শ্রদ্ধা করেন, তিনি হলেন দিলীপ বেঙ্গসরকার। শচীনের খেলা দেখে মুগ্ধ ইন্ডিয়ান অধিনায়ক বেঙ্গসরকার তাকে বিলেতি ‘গান অ্যান্ড মুড’ ব্যাট উপহার দিয়েছিলেন। কপিল দেবকে ডেকে এনে বলেছিলেন, শচীনের ওপর বিশেষভাবে নজর রাখতে।
তার ক্রিকেট কারিয়ার
১৯৯৮ সালে ৩৪ ম্যাচে ১৮৯৪ রানের বিশ্বরেকর্ড আছে। এক বিশ্বকাপে ৫২৩ রানের নজির আছে। স্কুল ক্রিকেটে বিনোদ কাম্বলির সঙ্গে জুটিতে ৬৬৪ রানের বিশ্ব রেকর্ড করেছিলেন। ১৬ই মার্চ ২০১২ শততম শতরানের শৃঙ্গে ক্রিকেটের মহানায়ক শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। তার সব ফর্মেটে ৬৬৪ ম্যাচে ৩৪,৩৫৭ রান ও ১০০ সেঞ্চুরি করেছেন। ওয়ান ডেতে ৪৯টি ও টেস্ট ৫১টি সেঞ্চুরি তার। এর মধ্যে দেশে ৪৪ বিদেশে ৫৬টি সেঞ্চুরি তার। শততম সেঞ্চুরিটি করেছেন এশিয়া কাপে মিরপুরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ১৪৭ বলে ১১৪ রান, স্ট্রাইকরেট ৭৭ এর কিছু বেশি।
শচীন টেন্ডুলকার এর রেকর্ড
ক্রিকেট জগতের জীবন্ত কিংবদন্তী মহানায়ক শচীন তেন্ডুলকরের অনেক খেলা দেখতে না পারার আফসোস অনেক ক্রিকেট প্রেমিকই করে থাকেন। টেস্ট এবং একদিনের ক্রিকেট আজও শচীন জ্বরে আক্রান্ত। কতগুলি রেকর্ড শচীন টেন্ডুলকার করেছেন, কেউ জানে না। টেস্টে সর্বোচ্চ রান, একদিনের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান, টেস্ট এবং একদিনের ক্রিকেটে সর্বাধিক সেঞ্চুরি, এইসব রেকর্ড আছে তার ঝুলিতে।
শচীন টেন্ডুলকারের পুরস্কার সমুহ
পৃথিবীর ক্রিকেট প্রেমী মানুষেরা দুচোখ ভরে দেখেছেন জীবন্ত কিংবদন্তী মহানায়কের মহান কীর্তি। পেয়েছেন রাজীব গান্ধী খেলরত্ন ৯৮ সালে এবং অর্জুন পুরস্কার ১৯৯৪ সালে। ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে প্রবাদ প্রতীম ক্রিকেটার শচীন টেন্ডুলকার ইন্ডিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান ভারতরত্ন পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। শচীন টেন্ডুলকার রাষ্ট্রপতি মনোনিত রাজ্যসভার সদস্য হিসাবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন৷
ইউডি/অনিক

