এসডিজি বাস্তবায়নের তালিকায় সবার ওপরে বাংলাদেশ
অনিক সরকার । সোমবার, ১৬ মে ২০২২ । আপডেট ১৫:৪০
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ-এসডিজি বাস্তবায়নে ব্যাপক তোড়জোড় চলছে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে। এটি জাতিসংঘের কর্মসূচি। এসডিজির মেয়াদকাল ২০১৬-২০৩০ সাল। এর ১৭টি উন্নয়ন অভীষ্টের জন্য ১৬৯টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে ২৪১টি নির্দেশক রয়েছে। এটা পূরণে বাংলাদেশ সরকারও প্রতিশ্রতি দিচ্ছে এবং তৎপরতা চালাচ্ছে। দেশবাসীও কম-বেশি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে। কারণ, এর সাথে দেশের সার্বিক উন্নতি, শান্তি ও মর্যাদা জড়িত। সর্বোপরি এমডিজি পূরণে বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিশ্বে মডেলে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে, তার মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এসডিজি অর্জনে এগিয়ে থাকা বাকি দুটি দেশ হলো আফগানিস্তান ও আইভরি কোস্ট। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এসব উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়া এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি।
এবারের এসডিজি সূচকে বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। চার বছর আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালের সূচকে ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১২০তম অবস্থানে। ২০১৫ সালের পর থেকে এসডিজি সূচকে স্কোরের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে বাংলাদেশ, আইভরি কোস্ট এবং আফগানিস্তান।
এসডিজি সূচকে ১শ’র মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ৬৩.৫। এক বছর আগে এই স্কোর ছিল ৬৩.২৬, তার আগের বছর ছিল ৬৩.০২। বাকি দুটি দেশের মধ্যে আইভরি কোস্ট রয়েছে ১৩১তম অবস্থানে এবং এর স্কোর ৫৭.৫৬। অপরদিকে ৫৩.৯৩ স্কোর নিয়ে আফগানিস্তান রয়েছে ১৩৭তম অবস্থানে।
‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২১’ তে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। গত ৫ বছরের এ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সোমবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাতিসংঘ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারির ধাক্কা সব দেশের টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ২০১৫ সালে এই বাস্তবায়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার পর ২০২০ সালের আগের বছরের চেয়ে বাস্তবায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে; এর আগে কখনও এমনটি হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক দৈন্যের কারণে স্বল্পোন্নত দেশগুলো (এলআইডিসি) মহামারির সংকট কাটিয়ে উঠতে পারছে না। অন্যদিকে উন্নত দেশগুলো অঢেল অর্থ ব্যয় করে দ্রুত এই সংকট থেকে বের হয়ে আসছে। সব মিলিয়ে কম আয়ের দেশগুলো কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছে।
এর মধ্যেও বাংলাদেশ, আইভরি কোস্ট এবং আফগানিস্তান জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি বাস্তবায়নে ভালো করছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্য অঞ্চলের দেশগুলোর চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এসডিজি বাস্তবায়নে ভালো করেছে। এর মধ্যে সবার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ। এরপর আইভরি কোস্ট ও আফগানিস্তান।
২০৩০ সালকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) পূরণের সময়সীমা ধরে নেয়া হয়েছে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে এর কার্যক্রম শুরু। এখানে লক্ষ্যমাত্রা আছে ১৭টি। সেগুলো হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষুধামুক্তি, খাদ্যনিরাপত্তা ও উন্নত পুষ্টির লক্ষ্য অর্জন, টেকসই কৃষিব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা, সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করে যাওয়া, অন্তর্ভুক্তি ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা, আজীবন শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা, লিঙ্গসমতা অর্জন, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি।
এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে ১০টি বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এসব হচ্ছে- নারীর ক্ষমতায়ন, আশ্রয়ণ (গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসন) প্রকল্প, শিক্ষা সহায়তা, আমার বাড়ি আমার খামার, ডিজিটাল বাংলাদেশ, কমিউনিটি ক্লিনিক, বিনিয়োগ উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং সকলের জন্য বিদ্যুৎ। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ এবং ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আমরা আশা করি, ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় হবে প্রায় ৬০০০ ডলার এবং ২০৪১ সালে হবে ১২ হাজার ৫০০ ডলার।
‘ভিশন ২০৪১’ অনুসারে ২০৩১ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৯% এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ৯.৯০% অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা ধারণা করছি, ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার হবে ২.৫৫% ও ২০৪১ সালের মধ্যে হবে ১%-এরও কম এবং ২০৩১ সালের মধ্যে মাঝারি দারিদ্র্যের হার ৭% ও ২০৪১ সালের মধ্যে ২.৫৯% হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতুতে রেলসংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভোলা গ্যাস পাইপলাইন, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কয়লা টার্মিনাল, উপকূলীয় অঞ্চলে পেট্রো-রাসায়নিক শিল্প এবং পায়রা সমুদ্রবন্দরের মতো অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় শামিল হবে বাংলাদেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করবে। আমাদের স্বপ্ন, ২০৪১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশকে উদ্ভাবনী বাংলাদেশে রূপান্তরিত করা এবং ২০৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতার ১০০ বছরে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে উদযাপন করারও পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনা অনুযায়ী ২১০০ সালের মধ্যে একটি ‘সহনশীল নিরাপদ জলবায়ু ও সমৃদ্ধ ব-দ্বীপ’ অর্জনের অভিপ্রায় নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
ইউডি/সুস্মিত

