কাজী নজরুল ইসলাম: দুখু মিয়ার মহীরূহ মহাকবিতে রূপান্তরিত হওয়ার গল্প

কাজী নজরুল ইসলাম: দুখু মিয়ার মহীরূহ মহাকবিতে রূপান্তরিত হওয়ার গল্প

উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ১৭ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:৩৫

বাংলা সাহিত্যের এক বিষ্ময় প্রতিভার নাম কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতা, নাটক ও উপনাস্যের মতো সাহিত্যের প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে তার ছিলো অবাধ বিচরণ। নিজেই লিখতেন গান, দিতেন সেইসব গানের সুর এবং সেইসাথে গাইতেন গানও। এছাড়াও পাশাপাশি সাংবাদিক হিসাবে কলম ধরেছিলেন। নানা আন্দোলন করেছিলেন রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে তার অবস্থানের কারণের জন্য কাজী নজরুল ইসলামকে “বিদ্রোহী কবি” হিসাবে আখ্যা দেওয়া হয়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

১৯৫২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে রাঁচির একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং তারপরে ভিয়েনায় চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত করা হয় যেখানে তাকে পিক্‌স নামক রোগ ধরা পড়ে। তিনি ১৯৫৩ সালে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তার চার সন্তান যথাক্রমে কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ, কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ।

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে মে, বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ ই জ্যৈষ্ঠ বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ, মায়ের নাম জাহেদা খাতুন।

নজরুল যেভাবে দুখু মিয়া
নজরুলের বড় আরো তিন ভাই ছিলো, কিন্তু জন্মের পর পরই তারা মারা যায়। সন্তান হওয়ার পর পরই অন্যান্য ছেলেরা মারা যাওয়ায় নজরুলের দাদি তার নাম রেখেছিলো দুখু মিয়া। এই দুখু মিয়াই একদিন মহীরূহ মহাকবিতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পর তার মতো বড় কবি বঙ্গদেশে আর জন্মগ্রহণ করেননি।

কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব
কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব কেটেছে নানা দুঃখ কষ্টের মধ্যে। তার পিতা ছিলেন এক মাজারের খাদেম এবং এক মসজিদের ইমা। নজরুলের বয়স যখন দশ বছর তখন তার বাবা মারা যান। ছোট তিন ভাই ও দুই বোন ও বিধবা মায়ের সংসারের সকল বোঝা এসে পড়ে তার কাধে। এই গুরুদায়িত্ব পালন করতে তাকে হিমসিম খেয়ে উঠতে হয়েছিলো।

ছোটবেলায় নজরুল এক মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি সুললিত কন্ঠে কোরআন তেলওয়াত করতে পারতেন। এ সময় দুষ্টুমির পাশাপাশি নজরুল তার আপন কাকার কাছে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যেরও নানা পাঠ নিতে থাকেন।

কাজী নজরুল ইসলামের শিক্ষাজীবন
কাজী নজরুল ইসলাম তার ছেলেবেলায় বরাবরই ছিলেন অস্থিরচিত্তের মানুষ। তিনি বাবার মৃত্যুর পর মাদ্রাসায় পড়া বন্ধ করে প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হন এবং মাত্র দু’বছরের মধ্যে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষা বেশ ভালোভাবেই পাস করে ফেলেন। পরে তিনি স্কুলের বাঁধাধরা পড়াশুনা না করলেও বাংলা ভাষায় অনেক বই এবং হিন্দু এবং মুসলমান ধর্ম শাস্ত্রের বিষয়ে পান্ডিত্য অর্জন করেন। এরপর তিনি রানীগঞ্জের এক স্কুলে ভর্তি হন।

সেনাবাহিনীতে যোগদান
নজরুল তখন দশম শ্রেণীতে পড়েন, ম্যাট্রিক পরীক্ষার পূর্বে টেস্ট পরীক্ষা এসে গেল। কিন্তু ১৯১৭ সালে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে। কাজী নজরুল ইসলাম স্থির করলেন যুদ্ধে যোগ দেবেন। ১৯১৭ সালে নজরুল ৪৯ নম্বর বাঙালী পল্টনে যোগ দিয়ে গেলেন করাচীতে। করাচী সেনানিবাসে নজরুল ফার্সি ভাষার কালজয়ী প্রতিভা হাফিজ, শেখ সাদী, রুমি, ওমর খৈয়াম প্রমুখের রচনাসম্ভার সম্বন্ধে পাঠ নেন।

এখান থেকেই নজরুল সৃষ্টিধর্মী কবিতা, গল্প, গান, গজল, উপন্যাস প্রভৃতি লেখার জন্য অন্তরের তাগিত অনুভব করলেন। বিভিন্ন ধরনের লেখা লিখে নজরুল কলকাতার নামকরা পত্রিকায় পাঠাতে লাগলেন। সেগুলো যথামৰ্যাদায় ছাপাও হতে লাগলো। ১৯১৯ সালে বাঙালী পল্টন ভেঙে দেওয়ায় নজরুল দেশে ফিরে এসে পুরোদমে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করলেন।

কাজী নজরুল ইসলামের চলচ্চিত্র
নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এটিতে তিনি একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ এবং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রের ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল।

তার বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতা
মাত্র বাইশ বছর বয়সে নজরুল লিখে ফেললেন তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এই কবিতাটি রচনা করে কাজী নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে গেলেন বিদ্রোহী কবি হিসাবে। দেশে প্রচুর সাড়া পড়ে গেল। এই একটি মাত্র কবিতার জন্য নজরুলকে চিরঞ্জীব পরিচিতি দান করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাকে সমাদরে স্বাগত জানিয়ে আশীর্বাদ করলেন। তারপরের ইতিহাস বিজয়ের ইতিহাস, গৌরবের ইতিহাস, অমরত্বের ইতিহাস। ১৯২৩ খ্রিঃ অক্টোবর মাসে নজরুলের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীনা প্রকাশিত হয়।

কাজী নজরুল ইসলামের পুরস্কার ও সম্মাননা
১৯৪৫ খ্রীঃ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুলকে জগত্তারিনী পদক পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছেন। ১৯৬০ সালে ইন্ডিয়া সরকার তাকে তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর কাজী নজরুল ইসলামকে ১৯৭২ সালে ঢাকায় আনা হয় এবং তাকে জাতীয় কবি হিসাবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। পরে তাকে ‘একুশ পদক’ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৪২ সালের ৮ই জুলাই থেকে দুরারোগ্য মূক ও বধির রোগে আক্রান্ত হন। বছরের পর বছর মূক ও বধির হয়ে জীবন মৃত থাকা অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট চিরবিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম ঢাকায় পরলোক গমন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাকে জাতীয় মর্যাদায় সমাধিস্থ করা হয়।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading