কমাতে হবে প্লাস্টিকের ব্যবহার
তনুশ্রী পাল । বুধবার, ১৮ মে ২০২২ । আপডেট ১১:২০
প্লাস্টিক, প্লাস্টিকজাত পণ্য যেমন- টুথব্রাশ, চিরুনি, চশমা, জুতা, স্যান্ডেল, মোবাইল সেট, কলম, স্যানিটাইজারের কনটেইনার, খনিজ পানির বোতল, করোনাকালে ফেসশিল্ড, মাস্ক- এসব পণ্য আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। এসব ছাড়া জীবন ধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শুধু ভ্রমণকালেই যে পাতলা প্লাস্টিকের গ্লাসে পানি, চা, কফি বা গরম কিছু খাওয়া হচ্ছে তা নয়; ক্রোকারিজ, কাটলারিজ ধোয়ামোছার ভয়ে এখন বাসাবাড়িতে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে। সব দেশের সব এয়ার ক্র্যাফটে প্লাস্টিক প্যাকেটে গরম খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকে সরবরাহকৃত রেডিমেড খাবারের পুরোটাই পলিথিন ও প্লাস্টিকজাত সামগ্রীর সাহায্যে প্যাকেট করা হচ্ছে। মিনারেল ওয়াটারের বোতলকে যে কতবার রিফিল করে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ইয়াত্তা নেই। দীর্ঘদিন রিফিল করে পানি পানের পর রং নষ্ট হয়ে যাওয়া বোতলগুলোয় ঘরে তৈরি ফলের জুস, মধু, সরিষার তেল রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। বাসাবাড়িতে মসলাপাতিসহ রান্নার বিভিন্ন সামগ্রী প্লাস্টিক কৌটায় আবদ্ধ। বালতি, ড্রাম, পানি সংরক্ষণের ওভারহেড ট্যাংকি, পিভিসি পাইপ, পানির ট্যাপ ইত্যাদি প্লাস্টিকের তৈরি।
এসব থেকে অতি ক্ষুদ্র কণা প্রতিদিন মানুষের পেটে যাচ্ছে। এতে ক্যান্সার, কিডনির সমস্যাসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগের ঝুঁকি বাড়চ্ছে। শুধু কি স্বাস্থ্যঝুঁকি? প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত দ্রব্যের যথেচ্ছ ব্যবহারে পরিবেশ বিষাক্ত ও দূষিত হচ্ছে। এসব কথা আমরা সবাই জানি, তারপরও এর করাল গ্রাস থেকে বের হওয়া যাচ্ছে না। বরং ব্যবহারবান্ধব এবং দামে কম হওয়ায় প্লাস্টিকজাত পণ্য দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং নিত্যনতুন এসব পণ্য প্রতিনিয়ত বাজার দখল করছে। জীবন ধারণের প্রতিটি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।
গবেষণায় জানা যায়, প্রতি বছর মাথাপিছু প্রায় ৫ কেজি প্লাস্টিক দ্রব্যাদি ব্যবহৃত হয়। পত্রিকার খবর মতে, বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের। আর প্লাস্টিক উৎপাদকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। ২০ লাখেরও বেশি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে জড়িত। ঢাকা শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখ পলিব্যাগ পরিত্যক্ত হয়ে তা পুকুর, ডোবা, নদী-নালা ও সাগরে গিয়ে জমা হচ্ছে। কৃষকের চাষের জমি, পুকুর, রাস্তাঘাট ভরে আছে প্লাস্টিক বর্জ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক গবেষণায় বলছে, দোকানে মুদিপণ্য বহনের জন্য যেসব ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো প্রকৃতিতে মিশে যেতে ২০ বছর সময় লাগে। চা, কফি, জুস কিংবা কোমল পানীয়ের জন্য যেসব প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। আর ডায়াপার ও প্লাস্টিক বোতল টিকে থাকে ৪৫০ বছর পর্যন্ত। বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক বর্জ্য পরিবেশ-প্রতিবেশের যেমন সমস্যা তৈরি করছে, একইসঙ্গে ব্যক্তি, প্রাণীসহ সবকিছুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
মৎস্য ও ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ ব্যাহত হচ্ছে। নিরাপদ পানিপ্রাপ্তিতে বিঘ্ন সৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা তৈরি করছে, সর্বোপরি পৃথিবীর জলবায়ুকেই পরিবর্তন করে ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনে প্রাকৃতিক কারণের সঙ্গে সঙ্গে মনুষ্য সৃষ্ট কারণগুলোই এখন মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। আর প্লাস্টিক বর্জ্য এর মাত্রাকে শুধু বাড়িয়েই চলেছে। পলিথিনের যুতসই বিকল্প যতদিন আবিষ্কৃত না হবে, ততদিন হয়তো আমাদের পলিথিন-প্লাস্টিক নির্ভরতায় থাকতে হবে। কিন্তু তাই বলে তো হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। পলিথিন বর্জ্য যেন অন্তত ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ না হয়, সেজন্য সতর্কতা অবলম্বন করতেই হবে।
প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ প্রভাব থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, রাষ্ট্র নানা কার্যক্রম গ্রহণ করছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে আমাদের সরকার ২০১০ সালে জুট প্যাকেজিং আইন পাস করেছে। ইতোমধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্যরে ট্রান্স বাউন্ডারি মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রণে একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে ‘সিঙ্গেল ইউজ’ প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধে কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে সচেতনতা, আইন মান্যতার তাগিদ সৃষ্টি না হলে রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কোনো কার্যক্রমই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। সরকারের এ শুভ উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নে সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
লেখক: শিক্ষার্থী
ইউডি/সুস্মিত

