খাদ্যের নিশ্চয়তায় গড়তে হবে টেকসই কৃষিব্যবস্থা
আফসানা সুলতানা । শনিবার, ২১ মে ২০২২ । আপডেট ১২:২০
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুসাওে বাংলাদেশের ৪৬.৬১ শতাংশ পরিবার কৃষির উপর নির্ভরশীল। তবে বিশ্বব্যাংকের হিসাবমতে, বাংলাদেশের ৮৭ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের আয়ের উৎস কৃষি। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি আসে প্রধানত ৫ টি খাত থেকে যার মধ্যে কৃষি অন্যতম। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১৬.৬ শতাংশ। কৃষি ও বনায়ন খাত থেকেবাংলাদেশের জিডিপি’র ১০ শতাংশের বেশি অর্থ আসে যাটাকার অঙ্কে প্রায় ১,০৭,০০০ কোটি টাকা।
আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার না করে একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষকদের কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও আগ্রহী করে তোলা এবং সেগুলো যথাসম্ভব সহজলভ্য ও সুলভ মূল্যে সরবারহ করা। জমি প্রস্তুতকরণ থেকে শুরু করে ফসল মাড়াই পর্যন্ত সমস্ত প্রক্রিয়াটি যান্ত্রিকীকরণ হলে কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন। এর ফলে সময় ও খরচেরও সাশ্রয় হবে।কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ যেমন অনেকাংশে কমে যায় ঠিক তেমনভাবে ফসলের নিবিড়তাও ৫-২২ ভাগ বেড়ে যায়। বীজ বোনার সময় বীজ বপন যন্ত্র ব্যবহার করলে প্রায় ২০ ভাগ বীজ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ ভাগ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া যন্ত্রেও সাহায্যে ফসল কাটলে ফসলের অপচয় অনেক কম হয়, অর্থের সাশ্রয় হয়। ফলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পায়।
বর্ষাকালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন অনেক চাষাবাদের উপযোগী জমিও চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ একটি বিকল্প হতে পারে।যদিও দেশের কিছু কিছু অংশে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হয়। কিন্তু এটি বড় আকারে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি। এই পদ্ধতিতে কচুরিপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা ও বিভিন্ন ঘাস একসাথে স্তুপ করে পচিয়ে ভাসমান বেড তৈরি করে সেখানে ফসল চাষ করা হয়।
টেকসই কৃষি ব্যবস্থার লক্ষ্যে আবহাওয়া সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা জরুরি। কৃষি কাজের সাথে আবহাওয়ার নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। উন্নত দেশে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট ফসল ফলানর ক্ষেত্রে সে এলাকার বিগত কয়েক বছরের আবহাওয়া বিবেচনা করে উপযুক্ত ফসলের জাত বাছাই করে রোপণ করা হয়। যেহেতু কোনো এলাকার আবহাওয়া, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, শিশির, বাষ্পীভবন, তাপমাত্রা, লবনাক্ততা, মাটির গুনাগুন এবং সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা বিবেচনা করে ওই এলাকার জন্য উপযুক্ত ফসলের জাত নির্বাচন করা হয় তাই কৃষক পরিবেশ /প্রাকৃতিক কোনো কারণে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পান এবং ফসলের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। নিকট ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তন নিঃসন্দেহে কৃষির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। তাই সঙ্গত কারণেই আমাদের এখন থেকেই একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এর প্রেক্ষিতে কিছু স্বল্পমেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ফসল উৎপাদন ও কাটার পর স্বাভাবিক ভাবেই তা ভোক্তার উদ্দেশ্যে বাজারজাত করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এই বাজার ব্যবস্থার মধ্যে একটি বড় ধরনের ফাঁক রয়ে গেছে। যার কারণে কৃষক তাদের কাক্সিক্ষত লাভের মুখ দেখেননা। বাজার ব্যবস্থার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগকারীদের অবস্থানের কারণে একদিকে কৃষক যেমন তাদের ন্যায্য মুল্য থেকে বঞ্চিত হন তেমনি ভোক্তারাও তেমন লাভবান হন না। লাভের প্রায় সবটুকই যায় মধ্যস্বত্বভোগকারীর পকেটে। পাশাপাশি বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণ খাদ্য শস্য নষ্ট হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় উৎপাদন থেকে বাজারজাত পর্যন্ত তার প্রায় ১৪ শতাংশ নষ্ট হয়। যার পরিমাণ প্রায় ৪২ লাখ টনের মত। তাই একটি টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বাজার ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, আধুনিক এবং সময়োপযোগী করে তুলতে হবে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থা আমাদের খাদ্যের নিশ্চয়তার পাশাপাশি টেকসই পরিবেশেরও নিশ্চয়তা দেয়। পাশাপাশি কৃষকও লাভবান হন। তাই আগামীর কথা চিন্তা করে দেশে এখন থেকেই গড়ে তুলতে হবে টেকসই কৃষিব্যবস্থা।
লেখক- সিনিয়র সাংবাদিক।
ইউডি/অনিক

