মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে সঠিক পদক্ষেপ নিন

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে সঠিক পদক্ষেপ নিন

শোয়েব শাহরিয়ার । রবিবার, ২২ মে ২০২২ । আপডেট ১১:১৫

যতই দিন যাচ্ছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৮৩০ জন। আর ২০১৯ সালে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ৯৪৫ জন। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৬৩ জনে। আর ২০২১ সালে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান ২ হাজার ২১৪ জন। ২০২১ সালে আগের বছরের চেয়ে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ ও এই দুর্ঘটনাগুলোতে মৃত্যু ৫১ শতাংশ বেড়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ৪৫ বছর। ৪৮ শতাংশ মৃত্যুর কারণ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনায় আহতদের ৯০ শতাংশই তরুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বেশি মৃত্যুর কারণ, যানজটে গণপরিবহণের বিকল্প হিসেবে মোটর সাইকেলের ব্যবহার বাড়ছে। দুই চাকার এই বাহনগুলো দীর্ঘযাত্রার জন্য আদর্শ নয়, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (পঙ্গু হাসপাতাল) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম সাত দিনে বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় আহত ১ হাজার ৪৭৪ জন সেবা নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশই মোটর সাইকেল দুর্ঘটনার শিকার। মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় কেউ হাত বা পা ভাঙলে সুস্থ হতে ৩ থেকে ৯ মাস সময় লাগছে। মোটর সাইকেলের দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ বেশি হয় এবং পায়ের হাড় বেশি ভাঙে।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও গ্রামীণ সড়কে মোটর সাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে চালকরা নিয়ম মানছেন না। চালক ও আরোহীরা হেলমেট পরেন না। এক মোটর সাইকেলে দুজনের বেশি না ওঠার নিয়মটিও মানা হয় না। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনিবন্ধিত মোটর সাইকেলও অহরহ চলে। অনেকেরই মোটর সাইকেল চালানোর কোনো প্রশিক্ষণ থাকে না। দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে মোটর সাইকেলের সহজলভ্যতাকে অন্যতম কারণ বলে মনে করেন সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো। নিবন্ধিত মোটর সাইকেল ছাড়াও জেলা শহর ও গ্রামীণ এলাকায় অনিবন্ধিত অন্তত ১৫ লাখ মোটর সাইকেল চলে। কোনো দেশে এভাবে মোটর সাইকেল চলে না। মোটর সাইকেল রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটা বেড়েছে। উদ্ধত, বেপরোয়া ও উচ্ছৃংখল টিনএজারদের মোটর সাইকেল নিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া তাই এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উপরন্তু কয়েক বছর হলো মোটর সাইকেলের অ্যাপভিত্তিক সার্ভিস চালু হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো নিয়মকানুন ও নিয়ন্ত্রণ নেই।

দেশে মোট কত মোটর সাইকেল চলাচল করে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটর সাইকেল কেনা যাবে না, এমন বিধি থাকলেও এখন তা কার্যকর নেই। ফলে যে কেউ লাইসেন্স থাক বা না থাক মোটর সাইকেল কিনতে পারছে। এতে উলেস্নখযোগ্য সংখ্যক মোটর সাইকেল ড্রাইভিং জানে না, এরূপ লোকদের হাতে গিয়ে পড়ছে। ঢাকার মতো জনবহুল শহরে মোটর সাইকেল চালানোর জন্য যেরূপ দক্ষতা প্রয়োজন তা তাদের নেই। ফলে যে কোনো সময় তাদের দুর্ঘটনায় পড়তে হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, লাইসেন্স করা ৯ লাখ ১৪ হাজার ৮১৭টি মোটর সাইকেল ঢাকা শহরে চলাচল করছে। লাইসেন্স ছাড়া কত মোটর সাইকেল চলাচল করছে, সেটা কেউ বলতে পারে না। মাত্রাতিক্ত মোটরসাইকেল অনেক সময় যানজটেরও কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আমরা মনে করি, মহাসড়কে যাত্রী নিয়ে মোটর সাইকেল চালানো সম্পূর্ণভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোটরসাইকেল চালকরা যাতে মানসম্মত হেলমট ব্যবহার করেন এবং ট্রাফিক আইন মানেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। অনেক সময় দেখা যায়, ফাঁক পেলেই চালকরা মোটরসাইকেল ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। গন্তব্যে যাওয়ার জন্য তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছে, বাড়ছে হতাহতের পরিমাণ। সরকারের পরিকল্পিত উদ্যোগই কেবল পারে এই দুর্ঘটনা হ্রাস করতে।

লেখক- সমাজ গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading