চে গুয়েভারা: সশস্ত্র সংগ্রামে কিংবদন্তি মহানায়ক হলেন যেভাবে
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ২২ মে ২০২২ । আপডেট ১৩:১৫
সশস্ত্র সংগ্রামী অগ্নিপুরুষ চে গুয়েভারা বিশ্বের সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে চে গুয়েভারা এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। কিউবার বুকে চে গুয়েভারা আগুন ঝরিয়ে ছিলেন। আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন মাথা উঁচু করে। দীর্ঘদিন চে গুয়েভারাকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছিল। যৌবনের বিলাস অবহেলায় দমন করেছেন। হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তির মহানায়ক। সশস্ত্র সংগ্রামী অগ্নিপুরুষ চে গুয়েভারার সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম।
পৃথিবীর বুকে মাত্র চল্লিশ বছর বেঁচেছিলেন চে গুয়েভারা। তবে তিনি আজও বেঁচে আছেন বিশ্বের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের অন্তরে। যতদিন পৃথিবীর বুকে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত মানুষ বেঁচে থাকবে, ততদিন চে গুয়েভারা সেই সব অবহেলিত বঞ্চিত মানুষের মনের মণিকোঠায় চিরভাস্বর হয়ে বেঁচে থাকবেন। তার মৃত্যু নেই।
সংক্ষেপে চে গুয়েভারার পরিচিতি
চে গুয়েভারা ছিলেন একজন আর্জেন্টিনীয় মার্কসবাদী, বিপ্লবী, চিকিৎসক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, গেরিলা নেতা, কূটনীতিবিদ, সামরিক তত্ত্ববিদ এবং কিউবার বিপ্লবের প্রধান ব্যক্তিত্ব। চে গুয়েভারার প্রকৃত নাম ছিল এর্নেস্তো গেভারা দে লা সের্না। তবে তিনি সারা বিশ্ব লা চে বা কেবলমাত্র চে নামেই পরিচিত।
চে গুয়েভারার জন্ম ও পিতামাতা
১৯২৮ সালের ১৪ই জুন আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে আরনেসটো চে গুয়েভারার জন্ম হয়েছিল। চে গুয়েভারা হলেন ঝিনচ এবং সেলিয়া দ্য লাসারনার প্রথম সন্তান। চে কিন্তু তার জন্মদত্ত নাম নয়।
চে গুয়েভারার ছদ্মনাম
চে কিন্তু তার জন্মদত্ত নাম নয়। চে গুয়েভারা মাঝে মধ্যে কথায় কথায় এই শব্দটি ব্যবহার করতেন। এই শব্দটি গুয়ারানি অঞ্চলের আদিবাসীদের মুখের ভাষা। তারা আমার অর্থে এই শব্দের ব্যবহার করে। এই অব্যয়টি এত প্রিয় হবার জন্যই কিউবার বিপ্লবীরা ডন আরনেসটোর ছেলে আরনেসটো গুয়েভারার নাম দিয়েছিলেন চে। লড়াইয়ের সময় এই ডাকনামটি চে গুয়েভারা এর ছদ্মনাম হয়ে ওঠে, মূল নামের সঙ্গে জুড়ে যায়।
চে গুয়েভারার শিক্ষাজীবন
ছোটো থেকেই চে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ভালোভাবেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করলেন। তার সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল মেডিকেল স্কুলের ছাত্র হবেন। শেষপর্যন্ত এই স্বপ্নটাও সফল হল। ১৯৪৬ সালে বুয়েনস আয়ার্স এর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হলেন। দীর্ঘ সাত বছর ধরে মন দিয়ে পড়াশোনা করলেন। ১৯৫৩ সালে মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হয়ে বেরিয়ে এলেন।
চে গুয়েভারার গ্রানামা অভিযান
বিশ্বের আর এক মহান বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা হওয়া তার জীবনে এক স্মরণীয় ঘটনা। বিশ্বের এই দুই মহান বিপ্লবী একে অন্যকে দেখে চিনতে পারলেন। ফিদেলের বিপ্লবী ইউনিটে যোগ দিলেন। শুরু হল গ্রানমা অভিযানের প্রস্তুতি।
চে গুয়েভারার কারাবাস
অবশ্য এর জন্য পুলিশ চে-কে নানাভাবে ভৎসিত করে। শুধু তাই নয়, মেক্সিকো শহরে তাকে কারাবাস করতে হয়। এই ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৬ সালের জুন থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে। ইতিমধ্যে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ৮১ জন বিপ্লবী গ্রানমায় পৌঁছে গেছেন। চে তাদের সঙ্গী হলেন। ২রা ডিসেম্বর এলেন কিউবার উপকূলে।
কিউবার বিপ্লবী যুদ্ধ
১৯৫৬-১৯৫৯ পর্যন্ত কিউবার বৈপ্লবিক যুদ্ধে চে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধে তিনি দু-দুবার মারাত্মকভাবে আহত হন। তা সত্ত্বেও রণক্ষেত্র থেকে নিষ্ক্রান্ত হননি। চে গুয়েভারার সাহসিকতার পরিচয় পেয়ে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছিল।
চে গুয়েভারার মেজর পদ
১৯৫৭ সালে শুরু হল উভেরোর যুদ্ধ চে গুয়েভারাকে মেজর পদে নিযুক্ত করা হল। তিনি চতুর্থ বিপ্লবী বাহিনীর নেতৃত্বভার গ্রহণ করলেন। বৈপ্লবিক চিন্তাধারার স্ফুরণ ঘটালেন। অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে গেরিলা পদ্ধতিতে আমেরিকান বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করতে শুরু করলেন।
চিরডেদন্ডের অষ্টম বাহিনীর প্রধান
১৯৫৮ সালের ২১ আগস্ট চিরডেদন্ডের অষ্টম বাহিনীর প্রধান হিসাবে তাকে দেখতে পাওয়া গেল। তিনি সাভিল্লা প্রদেশে আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করলেন। ১৬ই অক্টোবর বিজয় গর্বে চে এসক্যাস্ট্রে পর্বতমালার সন্নিহিত অঞ্চলে প্রবেশ করলেন। শুরু হল সাস্তাক্লারের ওপর আক্রমণ। চে প্রত্যেকটি আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
চে গুয়েভারার বিবাহ জীবন
অবশেষে সান্তাক্লারা ঈপ্সিত মুক্তিলাভ করল। চে এবার এগিয়ে চলেছেন হাভানার দিকে। হাভানায় প্রবেশ করে ক্যাবানা দুর্গ দখল করলেন। সেই সময় চে গুয়েভারা কিউবার নাগরিকত্ব পান। বিয়ে করেন অ্যালিইদামার্চকে।
চে গুয়েভারার বিশ্বভ্রমণ
১২ই জুন থেকে ৪ঠা সেপ্টেম্বরের মধ্যে চে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ করেছিলেন। চে গুয়েভারা এসেছিলেন মিশর, সুদান, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, ব্রহ্মদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সিংহল, জাপান, মরক্কো, যুগোশ্লেভিয়া ও স্পেনে। তখন চে গুয়েভারাকে কিউবার জাতীয় ব্যাঙ্কের অধিকর্তা করা হয়েছে।
চে গুয়েভারার বিখ্যাত গ্রন্থ
চে এবার এলেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। প্রযুক্তিবিদ্যা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতি সংক্রান্ত এক প্রদর্শনীতে অংশ নিলেন। প্রকাশিত হল তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গেরিলা যুদ্ধের কৌশল’। চে গুয়েভারাকে অর্থনীতি মিশনের প্রধান হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোশ্লেভাকিয়া, জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, চীন ও প্রজাতন্ত্র কোরিয়াতে আসতে হয়েছিল।
কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য
কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক মন্ডলীর অন্যতম সদস্য হলেন ও জাতীয় নেতৃত্ব ও সদস্য পদ গ্রহণ করলেন। চে গুয়েভারা অংশ নিয়েছেন অক্টোবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ৪৭ তম বার্ষিক উৎসবে। হাউস অফ ফ্রেন্ডশিপ-এ গিয়ে সোভিয়েত–কিউবা মৈত্রী সমিতির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, চে-র রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় কৃতিত্ব হল নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে কিউবার প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব করা।
চে গুয়েভারার মৃত্যু
৮ই অক্টোবর ইউরোপ যুদ্ধে আহত হয়ে চে বন্দি হন। ৯ই অক্টোবর ১৯৬৮ সাল হিগুয়েরা গ্রামে রেঞ্জারস বাহিনী তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ১৫ই অক্টোবর ফিদেল কাস্ত্রো বলিভিয়াতে চে-এর মৃত্যুর কথা সরকারীভাবে স্বীকার করেন। এইভাবেই শেষ হয়ে যায় এক সশস্ত্র বিপ্লবীর জীবন- ইতিহাস।
ইউডি/অনিক

