আর্কিমিডিস: রোমানদের নৃশংসতায় বিজ্ঞানের অপূরণীয় ক্ষতি
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ২৭ মে ২০২২ । আপডেট ১১:১৫
আর্কিমিডিস ছিলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, ক্লাসিক্যাল যুগটা তারই ছিল। আর্কিমিডিস ছিলেন তার সময়ের আইনস্টাইন, অথবা আইনস্টাইন হচ্ছেন নিজের সময়ের আর্কিমিডিস। কেবল একটি শব্দ ‘বিজ্ঞানী’ দিয়ে তাকে বর্ণনা করা যায় না। তিনি একাধারে বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, পদার্থবিদ, প্রকৌশলী, উদ্ভাবক এবং রূপকার। আপেক্ষিক তত্ত্বের জনক আর্কিমিডিসের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল অনিক।
পৃথিবীর সর্বকালের সকল দেশের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ হিসেবে আর্কিমিডিসের নাম মানবজাতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। তার ন্যায় পন্ডিত সেকালের ইউরোপে দ্বিতীয় কেউ ছিলেন না। এখনো পর্যন্ত তার সমকক্ষ গণিতবিদ পৃথিবীতে খুব অল্পই জন্মেছেন।
আর্কিমিডিস কে ছিলেন?
আর্কিমিডিস ছিলেন একজন গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিদ ও দার্শনিক। যদিও তার জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে, তবুও তাকে ক্ল্যাসিক্যাল যুগের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর্কিমিডিস ভুলক্রমেই হয়তবা এতো প্রাচীন সময়ে জন্মেছিলেন। কেননা তার সময়ের চেয়ে আর্কিমিডিস হাজার বছর এগিয়ে ছিলেন।
আর্কিমিডিসের জন্ম ও পরিচয়
ইতালীর অন্তর্গত সিসিলি দ্বীপের সিকিউরিজ শহরে খ্রীষ্টপূর্ব ২৮৭ সনে আর্কিমিডিসের জন্ম। তৎকালে সিকিউরিজ শহরে ছিলো গ্রীকদের বসতি। এই সিকিউরিজ শহরে বাস করতেন ফিডিয়াস নামের এক জ্যোতির্বিদ। শহরের্তার জ্যোতির্বিদ হিসাবে খুব নামডাক। তারই পুত্র আর্কিমিডিস। তখন কে জানতো যে এই আর্কিমিডিসই একদিন বিশ্বের বিজ্ঞান জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ভাস্বর হয়ে থাকবেন তার অকল্পনীয় মেধা আর বলবিদ্যা বিষয়ে অপূর্ব পারদর্শিতার জন্য।
আর্কিমিডিসের শিক্ষাজীবন
ছোটবেলা থেকেই আর্কিমিডিস ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক। বাড়িতে বাবার কাছেই লেখাপড়া শিখে অঙ্ক ও জ্যামিতিতে ক্রমশ পারঙ্গম হয়ে উঠলেন। প্রতিটি জিনিসই প্রমাণ সাপেক্ষে বিশ্বাস করতে শেখেন। সেকালে বিজ্ঞান ছিলো দেব দেবীর অলীক শক্তির নানা কল্পকাহিনীতে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেগুলো আর্কিমিডিসের কাছে। খাপছাড়াও অবিশ্বাস্য বলে মনে হতো। ভাবতেন প্রমাণ ছাড়া আবার কিসের বিজ্ঞান?
প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হবার পর বাবা তাকে পাঠালেন তখনকার জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার প্রাণকেন্দ্র আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেখানে তিন বছর পড়াশুনা ও জ্ঞানার্জনের পর আর্কিমিডিস নিজ শহরে ফিরে এলেন। মনোনিবেশ করলেন বিজ্ঞান চর্চায়। তার দেশের তৎকালীন রাজা হিরো বিজ্ঞান চর্চায় তার কৃতিত্বের জন্য তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। একটা ঘটনা তো কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছে তার। আপেক্ষিক গুরুত্ব নির্ণয়ের তত্ত্ব আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে।
আর্কিমিডিস এর আবিষ্কার
সাইরাকিউসের রাজা দ্বিতীয় হিরো আর্কিমিডিসকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং নিজের বন্ধু রূপে সম্মান দিতেন। হিয়েরোর অনুরোধেও উৎসাহে পরবর্তীকালে তিনি নানা ধরনের কার্যকরী যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন। চল্লিশটিরও বেশি যন্ত্র তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন। রাজা হিরোর সোনার মুকুট নিয়ে তার জগদ্বিখ্যাত আপেক্ষিক গুরুত্বের সূত্র আবিষ্কারের গল্পটি বহুল প্রচলিত। এই ঘটনার সূত্রে আর্কিমিডিসের উচ্চারিত ইউরেকা শব্দটি প্রবাদে পরিণত হয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজা হিয়েরো এক স্বর্ণকারকে দিয়ে একটি সোনার মুকুট তৈরি করিয়েছিলেন। মুকুটটিতে খাদ মেশানো আছে কিনা তা নির্ণয় করবার জন্য তিনি আর্কিমিডিসকে অনুরোধ করেন।
একদিন টবে স্নান করতে গিয়ে আর্কিমিডিস লক্ষ করেন খানিকটা জল টবের গা বেয়ে উপচে পড়ে গেল। এই ব্যাপারটা থেকেই আকস্মিকভাবে রাজার প্রশ্নের উপযুক্ত সমাধান তাঁর মাথায় এসে গেল। আনন্দে তিনি ইউরেকা বলে চিৎকার করে উঠলেন। পরে একটি পরীক্ষার দ্বারা তিনি রাজাকে বুঝিয়ে দেন যে মুকুটটিতে খাদ মেশানো আছে।
সামান্য এই ঘটনার সূত্র ধরেই আর্কিমিডিস আবিষ্কার করেন আপেক্ষিক গুরুত্বের ভৌতিক সূত্র যা বিজ্ঞানে আর্কিমিডিসের তত্ত্ব নামে পরিচিত। এই তত্ত্বে তার সিদ্ধান্ত হল: অদ্রাব্য কোন বস্তুকে কোন স্থির তরল বা বায়বীয় পদার্থে আংশিক বা সম্পূর্ণ রূপে নিমজ্জিত করলে, বস্তুটি সম – আয়তন জল বা বায়ু অপসারিত করে এবং নিজে অপসারিত জল বা বায়বীয় পদার্থের ওজনের সমান ওজন হারায়।
আর্কিমিডিস সোনার মুকুটে খাদের পরিমাণ নির্ণয় করেছিলেন এভাবে, মুকুটের সমান ওজনের একটু সোনা তিনি একটি জলপূর্ণ পাত্রের মধ্যে ফেলে দেন। এর ফলে খানিকটা জল উপচে পড়ে এবং এই জলটুকু তিনি ওজন করেন। পরের বারে সোনার মুকুটটিকে তিনি জলভর্তি পাত্রে ফেলে দেন। এবারেও উপচে পড়া জলটুকু ওজন করেন। দেখা যায় প্রথম ও দ্বিতীয়বারে উপচে পড়া জলের ওজন বিভিন্ন।
এই থেকে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন মুকুট খাঁটি সোনার তৈরি হলে দুই বারেই ঠিক একই পরিমাণ জল উপচে পড়তো। কিন্তু খাদ মেশানো থাকায় সমান ওজনের সোনা অপেক্ষা মুকুট আয়তনে কিছুটা বড় হয়েছে এবং তার ফলে জল খানিকটা বেশি ফেলে দিয়েছে। কী পরিমান খাদ মুকুটে মেশানো হয়েছিল দুবারের জলের ওজনের পার্থক্য থেকেই তা নির্ণয় করা হয়েছিল।
আর্কিমিডিস বিজ্ঞানের বড় বড় জটিল তত্ত্ব নিয়ে পরীক্ষা – নিরীক্ষায় ব্যস্ত থাকতেন। গণিত বিষয়ে আর্কিমিডিসের আবিষ্কারগুলিও স্মরণীয় হয়ে আছে। বৃত্তের রিধি ও ব্যাসের অনুপাত নির্ণয় সমতল ক্ষেত্রের সমত্ব সম্বন্ধে তত্ত্ব নির্ণয়, নধিবৃত্তীয় অংশগুলির ক্ষেত্রফল নির্ণয় সমান ভূমি ও উচ্চতা বিশিষ্ট ত্রিভুজ ও নধিবৃত্তের অংশের মধ্যকার সম্পর্ক নির্ণয় ইত্যাদি বিজ্ঞান জগতে তার বিশেষ অবদান রূপে স্বীকৃত।
আর্কিমিডিস এর মৃত্যু
২১২ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আর্কিমিডিসের বয়স যখন ৭৫ বছর, তখন তার দেশ রোমানদের দখলে চলে যায় এবং রোমান বীর মার্সেনাস এর সৈন্যরা তাকে হত্যা করে। সে সময় তিনি বৈজ্ঞানিক নানা গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।
ইউডি/অনিক

