রোমা রোলা: গণমানুষের মুক্তির পক্ষে কলম ছিল তার হাতিয়ার

রোমা রোলা: গণমানুষের মুক্তির পক্ষে কলম ছিল তার হাতিয়ার
Romain Rolland

উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ৩০ মে ২০২২ । আপডেট ১২:১৫

উনবিংশ শতাব্দীর প্রখ্যাত চিন্তাবিদ এবং প্রগতিবাদী মনীষীদের মধ্যে রোমা রোলা ছিলেন প্রথম সারির অন্যতম। বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিল্প ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মবিদ রোমা রোলা। বলা হয়ে থাকে রোলার সাহিত্যের শিল্পী জীবন ছাড়াও আরেকটা জীবন ছিল, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক জীবনে তিনি ছিলেন মূর্ত্তিমান বিবেক। মহামনীষী চিন্তাবিদ রোমা রোলার সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন সাইফুল ইসলাম।

১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রচনা করেন মহাত্মা গান্ধীর জীবনী। মনীষী রোমা রোলা ১৯১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। শিল্পকলা ও সংগীত গবেষক রোলা ১৯০৩ সালে সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন। মহান এই মানবিক চিন্তক, সাহিত্যিকের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

রোমা রোলা কে ছিলেন?
রোমা রোলা ছিলেন একজন ফরাসি নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, শিল্প ঐতিহাসিক ও অধ্যাত্মবিদ। ১৯১৫ সালে রোমা রোলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। শিল্পকলা ও সংগীত গবেষক রোলা ১৯০৩ সালে সর্বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন। রোমা রোলার প্রথম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বেটোভেন প্রকাশিত হয় ১৯০৩ সালে। এরপর ১৯০৬ সালে মিকেলাঞ্জেলোর জীবনী ও ১৯১১ সালে তলস্তয়ের জীবনী রচনা করেছিলেন তিনি। জাঁ-ক্রিস্তফ তার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য রচনা। ১৯১০ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে দশ খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির জন্যই রোমা রোলা নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রোমা রোলা যুদ্ধের বিরোধিতা করেন।

রোমা রোলার জন্ম
রোমা রোলা ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দের ২৯শে জানুয়ারি ফ্রান্সের ফ্লামেসি নামক ছোট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। রোমা রোলার পিতা দলিল প্রমাণকারী সরকারী চাকুরে ছিলেন। তাদের বংশের সবাই স্বাধীনচেতা ও দেশপ্রেমিক ছিলেন। রোমা রোলার মা ছিলেন সঙ্গীতরসিকা এবং ধর্মপরায়ণা নারী। আজীবন যুদ্ধবিরোধী ও মানবতাবাদী, ফ্রান্সের একজন মহামানব পরিচয়ে বিশ্বের বিদগ্ধ জনদের দৃষ্টি আকর্ষণকারী রোমা রোলার ছোটবেলা থেকে ফ্রান্সের গণমানুষের মুক্তিসাধনের ব্রত নিয়েই যেন বেড়ে উঠতে থাকেন।

রোমা রোলার শৈশবকাল
খুব স্বচ্ছলতার মধ্যে রোমা রোলা তার শৈশব অতিবাহিত করেন। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সে ফ্লামেসি কলেজে পড়াশুনা করেন। সঙ্গীতের উপর উচ্চতর গবেষণা কর্মের জন্য পরে প্যারিসের সারবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ঐখান থেকে তিনি ১৮৯৫ খ্রীষ্টাব্দে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। পরে সঙ্গীতের উপর শিক্ষকতাও করেন।

রোমা রোলার প্রবন্ধ লেখা
১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়, তখন তিনি সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ করছিলেন এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস সমিতিতে চাকরি করতে থাকেন। ঘোরতর যুদ্ধবিরোধী হিসাবে রোমা রোলা জুনাল দ্য জেনেভ পত্রিকায় বেশ কয়েকটি শক্তিশালী প্রবন্ধ লেখেন। ১৯১৯ সালে বিশ্বযুদ্ধ অবসানের পর রোমা রোলা পুনরায় প্যারিসে ফিরে আসেন, কিন্তু মাত্র দু’বছর পরেই আবার সুইজারল্যান্ডে ফিরে লেম হ্রদের তীরবর্তী ভিল্যুয়েভে শহরে এক নাগাড়ে ষোলো বছর বসবাস করেন।

রোমা রোলার মনে সন্দেহ হয় যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং রোমা রোলা যুদ্ধা ফ্যাসিবাদ ও নাৎসীবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রচার কার্যত আরও করেন। ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দে পুনরায় ফ্রান্সে ফিরে আসেন। ফ্রান্সের তৎকালীন ভিসি সরকার তাকে স্বগৃহে অন্তরীণ করে রাখে এবং তার যুদ্ধবিরোধী মতবাদ প্রচারে বাধার সৃষ্টি করে।

রোমা রোলার উপন্যাস ও নাটক লেখা
রোমা রোলা নানা ধরনের অসংখ্য গ্রন্থের রচয়িতা। শার্লে পেশুইয়ের সহযোগিতায় তিনি ‘লে কাহিয়ের দ্য লা কিনাজিন’ পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন। এই পত্রিকায় ১৯০৪ থেকে ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘জ্য ক্রিপ্তফ’ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তিনি কয়েকটি নাটকও লিখেছিলেন, যেগুলো ফরাসী বিপ্লবের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রচিত নাটকগুলির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম।

রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ
১৯২১ সনে রোমা রোলা রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ লাভের পর তিনি তার সাথে খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মানবতাবাদী রবীন্দ্রনাথকে তিনি শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং অত্যন্ত আপনজন মনে করতেন। তবে ১৯৩০ সালে ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনীর আমন্ত্রণে রবীন্দ্রনাথ ইটালী এবং পরে হাঙ্গেরীর হাটির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সে দেশ সফর করলে রোমা রোলা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তাদের বন্ধুতে সাময়িক ফাটল ধরে।

মহত্মা গান্ধীর জীবনী লেখা
১৯২০ সন থেকে রোমা রোলার দৃষ্টি পড়ে প্রাচ্যের ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপর। ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রচনা করেন মহাত্মা গান্ধীর জীবনী। এছাড়া তিনি সুইটজার, আইনস্টাইন, বার্ট্রান্ড রাসেল এবং রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বহু পত্রালাপ করেছিলেন। চুয়াত্তর বছর বয়সে তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি পেগুর জীবনী লিখে প্রকাশ করেন।

তার নিজের আত্মজীবনী
রোমা রোলার আত্মজীবনী ‘মেমোয়ার’ মৃত্যুর ১২ বছর পর ১৯৫৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। তিনি প্রাচ্যের শান্তিবাদী দর্শন সমূহ, বিশেষ করে গৌতম বুদ্ধের প্রচারিত বৌদ্ধধর্মের ‘জীবহত্যা মহাপাপ’ এবং ‘অহিংসাই পরম ধর্ম’ এই সকল বাণীকে আন্তরিকতার সঙ্গে মনে প্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার অনুরাগীদের এশীয় দর্শন থেকে শিক্ষালাভের জন্য অনুরোধ জানাতেন।

নোবেল পুরস্কার জয়
১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে রোমা রোলা তার বিশ্ববিখ্যাত মহা উপন্যাস জা ক্রিস্তভ গ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। অবশ্য পুরস্কারটি ১৯১৬ সালে প্রদান করা হয়।

রোমা রোলার মৃত্যু
রোমা রোলা ১৯৪৪ খ্রীষ্টাব্দের ৩১ শে ডিসেম্বর ফ্রান্সের ভেজেলে শহরে ৭৮ বছর বয়সে প্রাণত্যাগ করেন। মহান এই মানবিক চিন্তক, সাহিত্যিকের স্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading