টেকসই সমাজ বিনির্মাণে বড় বাধা যৌতুক প্রথা
শামিউল পাটোয়ারি । বুধবার, ০১ জুন ২০২২ । আপডেট ১০:৫০
যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাক্সিক্ষত সফলতা আসছে না। সামাজিক এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। গ্রাম থেকে শহরে, উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সর্বত্রই এই সামাজিক ব্যাধির প্রকোপ। মানুষের প্রচণ্ড অর্থের লোভ লালসা থেকেই যৌতুক প্রথার সৃষ্টি। দারিদ্র্য ও স্বল্প সময়ে অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার বাসনাও যৌতুক প্রথা বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম কারণ। বেকারত্ব, বাল্যবিয়ে, বর্ণ বৈষম্য, সামাজিক হতাশা এবং সঠিক নৈতিক শিক্ষার সঙ্কটে যৌতুকের প্রসার এতটা ভয়াবহতায় পৌঁছাচ্ছে। এ ছাড়া কুসংস্কার ও উচ্চাভিলাষী মানসিকতাও এর কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাধারণ অর্থে যৌতুক বলতে বিয়ের সময় বরকে কনের অভিভাবক কর্তৃক প্রদেয় অর্থ বা মূল্যবান সামগ্রীকে বুঝায়। ১৯৮০ সালের যৌতুক নিরোধক আইন অনুসারে, ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যদি কোন পক্ষ অপর পক্ষকে বিয়ের আগে পরে চলাকালীন যে কোন সময় যে কোন সম্পদ বা মূল্যবান জামানত হস্তান্তর করে বা করতে সম্মত হয় সেটাই যৌতুক বলে বিবেচ্য হবে।’ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ অনুসাওে, বিয়ে স্থির থাকার শর্ত হিসাবে বা বিয়ের পণ হিসাবে প্রদত্ত অর্থ বা প্রদান করা হবে এই মর্মে কোন শর্ত যে কোন সম্পদকে যৌতুক হিসাবে বিবেচিত হবে। প্রচলিত আইনে যৌতুক দেয়া বা নেয়া উভয়ই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল বা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে। যৌতুক দাবী করার জন্যও একই সাজা হতে পারে। আইনে অনেক কিছু থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন খুবই কম। এ কারণে যৌতুকের থাবা কিছুতেই থামছে না।
বাংলাদেশে ১৯৮০ সাল থেকে আইন করে যৌতুক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এরপর দুই দফায় সংশোধন করে তা হালনাগাদ করে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ নামে নতুন আইন পাশ করা হয়। যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর সাথে নির্যাতন জড়িত থাকলে তখনই শুধুমাত্র এই মামলা গুরুত্ব পায় এবং তা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন দিয়ে বিচার করা হয়।
তবে যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, ১৯৮০ এদেশে যৌতুকের অভিশাপ রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে যৌতুক দাবির পরিণতিতে কনের উপর নির্যাতন নেমে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে কোনো মহিলা বা শিশুকে সামান্য বা গুরুতর জখম করা, হত্যার চেষ্টা করা বা হত্যা করার জন্য শাস্তির বিধান করে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯৫ জারী করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই আইনটিও এই অভিশাপ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রমাণিত না হওয়ায় আইনটি রহিত করে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (নির্যাতনমূলক শাস্তি) আইন ২০০০ বলবৎ করা হয়। আইনটি ২০০৩ সালে আরেকবার সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনের ১১ অনুচ্ছেদে যৌতুকের দাবি নিয়ে হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড, হত্যার চেষ্টা চালানোর জন্য যাবজ্জীবন কারাদন্ড, মারাত্মক জখম করার দায়ে ৫ থেকে ১২ বছরের কারাদন্ড এবং সাধারণ জখম করার দায়ে ১ থেকে ৩ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সরকার আইন করেছে যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে। এটা এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এ আইন পদে পদে লঙ্ঘিত হচ্ছে। যৌতুকের লেনদেনের কথা লিখিত থাকে না বিধায় প্রমাণ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ কুপ্র্রথার অভিশাপ মোকাবিলায় সরকার এতসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরও যৌতুক প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি। বরং তা বেড়েই চলছে। এবং এই অভিশাপের যারা শিকার তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে কুঁড়ে কুঁড়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাই যৌতুক প্রতিরোধে আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, ঠিক তেমনিভাবে সামাজিক আন্দোলনও অব্যাহত রাখতে হবে। যারা যৌতুক দিচ্ছে বা নিচ্ছে তারা সামাজিকভাবে অপরাধী। তাদের বয়কট করতে হবে। আর যৌতুক যে একটা সামাজিক ব্যাধি, সেটা তরুণ প্রজন্মকে উপলব্ধি করতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: সাংবাদিক।
ইউডি/সুস্মিত

