সার দেশে বাড়ছে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের চর্চা

সার দেশে বাড়ছে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের চর্চা

সাইদুল মোস্তফা শাহীন । বুধবার, ০১ জুন ২০২২ । আপডেট ১২:০৫

বাংলাদেশে গত এক যুগে সবজি উৎপাদনে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব। বিগত বছরে ১ কোটি ৭২ লাখ টন সবজি উৎপাদন করে বাংলাদেশ বিশ্বে সবজি উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে উন্নীত হয়েছে- এটা দেশের কৃষি ও কৃষকের জন্য এক বিশাল অর্জন ও গর্বের বিষয়। দেশে বর্তমানে ৬০ জাতের ২০০ ধরনের সবজি উৎপাদন হচ্ছে। সবজি উৎপাদন হচ্ছে বিস্তৃর্ণ মাঠে, বসতবাড়ির আশপাশে, গ্রামীণ রাস্তার ধারে, ছাদবাগানে, হাওর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নিচু এলাকায় ভাসমান বীজতলায়। এই সবজি উৎপাদনের সাথে দেশের ১ কোটি ৬২ লাখ কৃষি পরিবার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশ থেকে ৫০টিরও বেশি দেশে সবজি রপ্তানি হচ্ছে। সবজির ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হলে দেশের অঞ্চল ভিত্তিক কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠা ও রফতানি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। এদাবি পূরণ করতে হলে কৃষকদেরকেউ উত্তম কৃষি চর্চা অনুসরণ পূর্বক বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদন করতে হবে।এতে কৃষক যেমন লাভবান হবেন ,তেমনি দেশের মানুষ থাকবেন রোগমুক্ত, পরিবেশ থাকবে নিরাপদ এবং অর্জিত হবে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা।

পরিবেশ বান্ধক কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পের অর্থায়নে সারা দেশে এবছর ১১টি উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে আইপিএম মডেল ইউনিয়ন স্থাপন করে নিরাপদ সবজি উৎপাদনের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ময়মনসিংহ বিভাগের মধ্যে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলা ও শেরপুর জেলার নালতাবাড়ী উপজেলায় এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ৭ং রামপুর ইউনিয়নে এই প্রকল্পের আওতায় এবছর ২০টি দলের মাধ্যমে ৫০০ কৃষাণ/ কৃষাণির ১০০ একর জমিতে শীতকালীন নিরাপদ সবজি উৎপাদনের কাজ চলছে পুরোদমে। সবজির মধ্যে রয়েছে ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, ব্রোকলি, শসা, করলা, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি। কৃষক, কৃষাণিরা সবজি পরিচর্যা, উত্তোলন ও বিক্রির কাজে বর্তমানে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। প্রকল্প এলাকায় সবজি উৎপাদনে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে কেঁচো কম্পোস্ট সার। রাসায়নিক বালাইনাশকের পরিবর্তে পোকামাকড় দমনের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ, রঙিন আঠালো ফাঁদ,নেট হাউজ ও জৈব বালাই নাশক।

নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার না কারায় পণ্য উৎপাদনে কৃষকের খরচ কম হওয়ায় লাভও হবে বেশি।আমাদের কথা শুধু উৎপাদন নয়, নিরাপদ সবজি ন্যায্যমূল্যে বিক্রির ব্যবস্থাও করতে হবে প্রকল্পের মাধ্যমে। প্রকল্পের সাথে যুক্ত করতে হবে কৃষি পণ্যের অনলাইন প্লাটফর্ম ফুড ফর নেশনকে।নিরাপদ সবজি পরিবহণেও সরকার কে প্রণোদনা দিতে হবে। উৎপাদিত বিষমুক্ত নিরাপদ সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার জন্য একশপ, কৃষাণ, আই ফার্মার, ডিজিটাল আড়তদার, আগোরা, স্বপ্ন প্রভৃতি অনলাইন কৃষিপণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানে সাথে প্রকল্পভুক্ত কৃষকের সাথে নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া যেহেতু বিষমুক্ত নিরাপদ সবজির বিদেশে প্রচুর চাহিদা রয়েছে তাই উৎপাদিত সবজি রপ্তানির মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত কল্পে রফতানিকারক এবং উৎপাদনকারীদের মধ্যে সেতু বন্ধন তৈরি কাজটিও করতে হবে প্রকল্পের পক্ষ থেকে। এ ব্যাপারে হরটেক্স ফাউন্ডেশন, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বিশেষ করে প্রকল্পের সাথে যুক্ত প্রকল্প পরিচালকসহ অন্যান্যরা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন। কারণ কৃষক যদি উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে লাভবান না হন তাহলে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কখনো সফল হবে না।

জীববৈচিত্র্যে সব পোকাই ক্ষতিকারক নয়। ফলে সব পোকা মারার প্রয়োজনও নেই। আবার ক্ষতিকর বালাইনাশক ব্যবহারে মাটির ভেতরের ও উপরের জীবের পাশাপাশি জলজ জীবগুলোর কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে কার্যকর কোনো গবেষণা নেই। জমির বালাইগুলোকে ধ্বংস না করে বরং প্রতিরোধের মানসিকতা গড়ে তোলা গেলে অ্যাগ্রো ইকোলজি ঠিক রাখা সম্ভব। পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রাকৃতিক উপায়ই রয়েছে। বালাইনাশকের বিকল্প যেসব পথ ও উপায় রয়েছে, সেগুলো কৃষকের মধ্যে সম্প্রসারণ করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিরাপদ সবজি উৎপাদন বাড়াতে হলে অবশ্যই কীটনাশকের অবাধ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। এছাড়া বিকল্প জৈব সার ও বালাইনাশক উৎপাদন বাড়াতে হবে। তাহলেই সারা দেশে নিরাপদ সবজি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

লেখক- গবেষক।

ইউডি/সুস্মিত

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading